তাই তো বলতে চেয়েছি, তোমার নিজের প্যাঁচালো, প্রভাবিত মনের রিফ্লেকশানে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি। পুরাণ, বর্তমান সব এক করে ফেলেছ। তাই তো সাধক গেয়েছে, তারা কতদিনে কাটবে বল এ দুরন্ত কালের ফাঁসি।
বঙ্কিম তাড়াতাড়ি আয়নাটা উপুড় করে রাখল। দার্শনিক বঙ্কিমকে উলটে চাপা না দিলে আসল বঙ্কিমের অফিস যাওয়া মাথায় উঠবে। প্রায় দশটা বাজল। বারোটা অবধি লেট অ্যাটেনডেন্স চলে। তারপর অফিস যাওয়ার আর কোনও মানেই হয় না। এদিকে পেটের যেরকম গুমোট অবস্থা। দ্বিতীয় কাপ চা-টা পেটে পড়লে হয়তো একটু কাজ হত। প্রতিমাকে খেপিয়ে দিয়েছে, এখন কিছুদিন বঙ্কিম এক ঘরে; ধোপা নাপিত সব বন্ধ। তোমার তালে তাল দিয়ে চলতে হবে, তাইনা। তুমি আমার মানি প্ল্যান্ট দেখেছ, তাই না। নাড়া দিলেই টাকা পড়বে! ওঃ, সোনার বালা! বঙ্কিম মাথাটা এমনভাবে ঝাঁকাল, যেন তার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেছে। তার নিজের বিয়ের আংটির সোনাটা তো গেছেই, প্লাস আরও কয়েক পয়সার সোনা, প্লাস মজুরি। বিষ্ণুর দোকানে। আড়াইশো টাকা ধার। যতদিন না দিতে পারছে আসা-যাওয়ার পথে জুলজুল করে তাকিয়ে থাকবে।
ঘরের বাইরে প্রতিমার এলাকায় পা দিয়েই বঙ্কিমের ক্ষোভটা আবার উথলে উঠল। বিয়ে করে। ঘোড়ার ডিম তার লাভটা কী হয়েছে? এর চে ব্যাচেলার থাকলে আরামে থাকত। তাড়াহুড়ো না করলে আর একটু বাজিয়ে, দেখেশুনে বউ আনা যেত। আর একটু চোখা নাক, টানা চোখ, ধারালো মুখ, আর একটু ভালো ফিগার, মৃদুভাষী, নম্র, সমর্পিতা, ছোট নিট পরিবার। এ এক ডাকা হাঁকা ধ্যাদ্ধেড়ে জিনিস। যত পুরোনো হচ্ছে তত আওয়াজ বাড়ছে।
বঙ্কিম যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী, ক্ষতবিক্ষত মানুষ। বাথরুমের দিকে যেতে যেতে বঙ্কিম বেশ জোরে জোরেই বলল, যতসব থার্ড ক্লাস ব্যাপার। প্রেজেনটেশানের লোভে ঝেটিয়ে নিমন্ত্রণ করছে আর যতসব পচা জিনিস গিলিয়ে মানুষ মারার তাল করেছে। দেশের শত্রু মার্ডারার।
মুখ সামলে। প্রতিমা রান্নাঘর থেকে ফোঁস করে উঠল। বঙ্কিম এইটাই চাইছিল। চেঁচামেচি করে অন্তত মনটা খোলসা হোক, মুখ সামলে কী। ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট। এত জায়গায় নেমন্তন্ন খেয়েছি এ রকম পেটের অবস্থা কখনও হয়নি। নেভার।
মাত্রা না রেখে খেলে ওইরকম হবে। আমরাও তো খেয়েছি। আমাদের কিছু হল না; ওনারই সব হয়ে গেল।
তোমার যে বাপের বাড়ি। বাপের বাড়ির সব কিছু অমৃত সমান।
কোনটা পচা ছিল—
প্রথম তেল। ওটা তেল না, ডিজেল। মাছগুলো মর্গ থেকে এনেছে। ওই বোগড়া চালে কোনও শিক্ষিত লোক ফ্রায়েড রাইস করে না। মাংস ধাপা থেকে তোলা। মিষ্টি কাগজের মণ্ড থেকে তৈরি। পেটে ওই মালের ধাক্কা সামলাতেও আরও দুশো যাবে। হাজার টাকার বালাদুশো টাকার ঠেলা! শ্বশুরবাড়ির নিকুচি করেছে। বুরুশ ঝাড়তে ঝাড়তে বেশ জুতসই করে বঙ্কিম আক্রমণ শানিয়ে নিলে।
ও, বালার দামটা মিনিটে মিনিটে বাড়ছে। আড়াইশো থেকে আধ ঘণ্টার মধ্যে হাজারে উঠল।
আজ্ঞে না, ঘর থেকে যে সোনাটা গেল তার দামটা তখন ধরা হয়নি।
সেটার আবার দাম কী? ও সোনা তো ও বাড়িরই। মাছের তেলে মাছ ভাজা।
বাঃ, ভালো যুক্তি! তার মানে তুমি বলতে চাইছ, বিয়ের সময় যা ছিটেফোঁটা দিয়েছিল সব এইভাবেই উশুল করে নেবে?
উশুল করে নেবে কেন? তোমার কেনার ক্ষমতা থাকলে কিনে দাও। নেই বলেই ওই অবস্থা। অন্য কোনও বউ হলে এইভাবে ঘরের সোনা দিত বার করে? নেহাত আমার মতো বউ পেয়েছিলে তাই বর্তে গেলে।
আহা কী উদারতা? আমার কোনও রিলেটিভের বিয়ে হলে দিতে?
রাম, তোমার রিলেটিভরা আমাকে কী দিয়েছে, যে আমি দেব। যারা দেয় তাদেরই গায়ে গায়ে শোধ দিতে হয়। একেই বলে শোধবোধ। কিছু নিলেই কিছু দিতে হয়।
সমান সমান হতে আর কত বাকি?
ওঃ, এখনও অনেক বাকি! সমান সমান হতে সব ভাই ফুরিয়ে যাবে। আর তো মাত্র দুই বাকি।
এখনও এই চার চার আটগাছা চুরি আছে। গলার হার আছে। আমার আংটিটা আছে। আইবুড়োবেলার দুল দুটো আছে। নাকছাবি আছে।
আরও আছে। একটা পালিশ ওঠা খাট আছে, ছেঁড়া তোশক আছে, দাগ লাগা লেপ আছে, আমার বিয়ের পোকায়-ফুটো সিল্কের পাঞ্জাবিটা আছে, জোড়ের কাপড় আছে, একটা জলচৌকি আছে, স্টিলের ট্রাংক আছে, কয়েকটা কাঁসার বাসন আছে, আর আছে তোমার হাতঘড়িটা। ছেলেমেয়ের আধাআধি ভাগ। হাফ আমার, হাফ তোমার। তোমার হাফটা শ্বশুরবাড়িরই প্রাপ্য।
ওদের অতটা ছোটলোক ভেবোনা। তোমার মতো অত চুলচেরা হিসেবে ওরা চলে না।
খুব চলে। তা না হলে তোমার এইরকম স্বভাব হয়! এ বাড়ির আদ্দেক মালই তো ও বাড়িতে পাচার। ওদের হল সেই থিয়োরি—ভূমি যার ফসল তার। আমি হলুম ভাগচাষী, তোমার সয়েলে বারো বছর চাষ করছি। ফসল সব ওই গোলায়। আমার ভাগে বুড়ো আঙুল। একটা হিসেব। কেবল তোমাদের হিসেব থেকে বাদ পড়ে গেছে। আর সেই হিসেবের বেলায় জেনেশুনে অন্ধ। হয়ে থাকাই ভালো।
প্রতিমা ঘেঁস ঘেঁস করে লাউ কাটতে কাটতে বললে, সেটা কী? আমার হিসেবে ওদের এখনও অনেক পাওনা।
বঙ্কিম মাথায় তেল মাখতে মাখতে বলল, এই যে বারোটি বছর তোমাকে ভাত-কাপড়ে পুষছি, তার কস্টটি তো বাছাধন করে দেখোনি। ডেলি এক সের চাল, এক চাকা মাছ, আলু পটল, কপি, মুলো, কচু ঘেচু, গাজর মাজর, চা চিনি ডাল দুধ, শাড়ি জুতো সিনেমা থ্যাটার। এসব দেবোত্তর প্রপার্টি থেকে হচ্ছে, না গৌরী সেনের ফাইনান্সে!
