জুলপির কাছে ব্লেডের কোপ বসিয়ে বঙ্কিম নিজেকেই বললে, চায়ের সেকেন্ড এডিশানের আশা ছাড়ো মানিক। সকাল থেকেই তো দফায় দফায় ইন্টারভিউ। প্রতিবেশীদের, ভায়ের বউভাতের ফিরিস্তি দেবে না, চা তৈরির মতো একটা তুচ্ছ কাজে সময় নষ্ট করবে। ওঃ, খুব করেছে ভাই এই বাজারে! মাছ? এই চাকা চাকা দাগা। যত পারো খাও। এক হাজার কমলাভোগ এখনও ভাঁড়ারে গড়াগড়ি যাচ্ছে। সাত হাঁড়ি দই, হাত পড়েনি। হিসেব নেই তো! সব ভাইয়ের দিলই তো। হাওদাখানা!
তোমার মুখেই শুনলুম হাওদাখানা। বঙ্কুবাবুর বেলাতেই যত কৃপণতা। জামাইষষ্ঠীতে একবারই তোমার কোনও এক দিলদার ভাই একটা দিশী কাপড় কিনেছিল। কেনার সময় মনেই ছিল না বড়জামাই প্রমাণ সাইজের একটা লোক। কিনে নিয়ে এল একটা খোকা কাপড়। বহর বোধহয় আটত্রিশ ইঞ্চি লম্বা আটহাত, বড় জোর ন-হাত। বেহিসেবী ঠিকই। তবে জামাইদের ব্যাপারে অলওয়েজ অন দি মাইনাস সাইড। তবু প্রতিমা ভাইয়েদের ডিফেন্ড করে গেল। খাটো ঝুলই তো ভালো গো। কত কনসিডারেট। পাছে বোন বিধবা হয় সেই ভয়ে ছোট কাপড় দিয়েছে। বাসে-ট্রামে ওঠার সময় অসাবধানে পায়ে জড়িয়ে যাওয়ার নো চান্স! একেই বলে সেফটি ধুতি। বঙ্কিম বলেছিল, রোড সেফটি উইকে পরে বি-বা-দী বাগে সাদা দাগের ওপর দিয়ে হেলেদুলে রাস্তাপার হব, কী বলে?
দাড়িতে ব্লেডেতে যখন কিছুতেই বনিবনা হচ্ছেনা, প্রতিমা তখন দুধের সর ভাসা এক কাপ চা নিয়ে প্রবেশ করল। মেঝেতে থেবড়ে বসে বঙ্কিম দাড়িমুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছিল।
ধরো ধরো।
রাখো না।
নীচু হওয়ার কষ্টটাও মহিলা স্বীকার করতে চায় না। পারলে বঙ্কিমের চাঁদিতেই কাপটা বসিয়ে দিয়ে যায়! এমন কিছু ভুড়ি নেই। বয়সও তত নয় যে কোমরে আথ্রাইটিস হয়েছে বলে বিশ্বাস করতে হবে। হাপরের মতো একটা শব্দ করে প্রতিমা জলভরতি প্লাস্টিকের মগের পাশে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটু চা চলকে ডিশে পড়ল। বঙ্কিম একবার আড়চোখে তাকাল। চায়ের কাপ, জলের মগ, দাড়ি কামাবার বুরুশ। সেভিং ক্রিমের টিউব, চাকা, কৌটো, সেফটি রেজারের খাপ, ছোট তোয়ালে, ব্লেডের কাগজ, আর ফুটখানেক দূরে প্রতিমার ফুলো ফুলো পা। সায়ার ফ্রিল। পায়ের পাতায় জলের ছিটে। প্রতিমা অবাক হয়ে জিগ্যেস করলে, তুমি বেরোবে নাকি?
হুম।
না-ই বা বেরোলে আজ!
অফিসটা আমার মামার বাড়ি নয়। গলার নীচে থেকে ওপরের দিকে ব্লেড চালাতে চালাতে সংক্ষিপ্ত উত্তরে বঙ্কিম তার মনের ভাব জানিয়ে দিলে।
মামার বাড়ি নয় সে আমিও জানি। এমনি হাজার দিন কামাই করছ। আজকে যেতে হবে না। এই বলছিলে হজম হয়নি, রাতে ঘুম হয়নি। চানটান করে একটু শুয়ে পড়ো।
হজম হয়নি বলে চাকরিটা তো আর হজম করতে পারি না। চাকরি ইজ চাকরি। এর পর একবারেই শুইয়ে দেবে। তখন সংসার সামলাবে কে? তুমি না তোমার ভাইয়েরা?
ভাইয়েরা কোন দুঃখে সামলাবে! তাদের সংসার নেই? তোমার সংসার তুমি সামলাবে।
তবে আমার ব্যাপারে নাক গলাতে এসোনা দয়া করে।
সকাল থেকেই বাবুর মেজাজ একেবারে সপ্তমে। বাপ বললে শালা বলতে আসছে।
হ্যাঁ আসছে। যার ছত্রিশটা শালা তার গলা দিয়ে অষ্টপ্রহর হরিনামের মতো শালা শালাই। বেরোবে। বঙ্কিম উত্তেজনায় সাবান-মাখা বুরুশটা জলের মগের বদলে চায়ের কাপেই ডুবিয়ে দিলে। যাঃ শালা। চা-টাই গেল। সেই ফুলপড়ার মতো টাঙিয়ে থেকে থেকে যদিও এক কাপ ছ্যাকরা চা জুটল, কানের কাছে তোমার বকবকানির চোটে তা-ও গেল।
আমি আর করে দিতে পারব না। খেতে হয় ওই চা-ই খাবে না হয় ফেলে দেবে।:
সে আমি জানি। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই পাজি। যতদিন বালাটা আদায়ের প্রয়োজন ছিল, ততদিন না চাইতেই চা, না চাইতে জল। কাল সন্ধে থেকেই তোমার অন্যমূর্তি। সব শালাকেই আমার চেনা আছে শালা। চায়ের ভয় দেখিয়ো না। দোকান আছে, পয়সা ফেলব কাপ কাপ চা খাব, মিনিটে মিনিটে খাব। তোমার পরোয়া করি!
কে কার পরোয়া করে। আজকাল কেউ কারুর পরোয়া করে না বুঝলে দোস্ত। দোকানে শুধু চা-ই জুটবে অন্য কিছু জুটবে না?
সব জুটবে, সব জুটবে। পয়সা ফেললে সব জুটবে। মাসে একটা করে সোনার বালা ছাড়লে আরও অনেক কিছু জুটবে, বুঝেছ? মোনোপলির যুগ শেষ হয়ে গেছে।
তাই জোটাও। জুটিয়ে যে রাখোনি তা-ই বা কে জানছে। তোমার প্রাইভেট লাইফের খবর কতটুকু জানি? অফিস অফিস করে কেন এত পাগল? বুঝি না ভাববা? কাজ তো যা করো জানাই আছে! তুমি একদিন না গেলে অফিস একবারে উলটে যাবে না। ওই কাঁধকাটা, পেটকাটা, পিঠ কাটা মেয়েছেলের ধান্দা! সারাদিন বিনা পয়সার ফষ্টিনষ্টি!
হ্যাঁ, অফিসটা তো কুঞ্জবন, সেখানে সব রাধিকারী সেজেগুঁজে এই বুড়ো কেষ্টর জন্যে কমদতলায় বসে আছে। মোস্ট লাইবেলাস রিমার্ক। কোর্টে মানহানির মামলা ঠুকে দেওয়া যায়।
বুড়ো কেষ্টদেরই তো সবচে বেশি ভয়। খাচ্ছ মাল। ডুবে ডুবে জল খাও শিবের বাবাও টের পায় না।
বঙ্কিম সেফটি রেজার থেকে গম্ভীর মুখে ব্লেড খুলতে খুলতে বললে, প্লিজ, প্লিজ, মেছুনীদের মতো তর্ক কোরো না। বলা হয়ে গেছে, এখন আর আমার সঙ্গে নো রিলেশান। আবার অন্নপ্রাশন আসছে। ভয় নেই, তখন সংসারের ডালে বসে আবার তোমার কোকিল কণ্ঠ শোনা যাবে। তোমাকে আমার স্টাডি করা হয়ে গেছে। স্বার্থপরতা ইনকারনেট।
