কড়কড়ে টু হান্ড্রেড অ্যান্ড ফিফটি রুপিজ। সামান্য একটি সোনার বালা। নতুন বউয়ের গোল গোল শ্যামলা হাতে মানিয়েছে জবর। ওমা দেখি দেখি বড় জামাই কী দিয়েছে? বাঃ বেশ দিয়েছে। এই বাজারে বেশ দিয়েছে। মেয়েমহলের প্রশংসায় বঙ্কিমের বুক দশ হাত না হলেও বঙ্কিমের স্ত্রী প্রতিমার চলার ঠমক খুলেছে। কোমরে কাপড় জড়িয়ে সে কী দেমাক! জ্যাল-জেলে শাড়ি নয়, অপাঠ্য বই নয়, ডিফেকটিভ টেবিলে ল্যাম্প নয়, প্ল্যাস্টার অফ প্যারিসের বিদঘুটে কোনও মূর্তি নয়, আস্ত একটা সোনার বালা ঝেড়ে সব শালাকে কুপোকাত করে দিয়েছে। অবশ্য এই বালা নিয়ে তার আগে বঙ্কিমের সঙ্গে অনেক চুলাচুলি হয়ে গেছে। তিন রাত দুজনে এক ঘরে ঘুমোয়নি। দুদিন নির্জলা উপবাস। সাতদিন কথা বন্ধ। বঙ্কিম বলার মধ্যে বলেছিল, একটা দুটো শালা-শালি হলে লোকে দামি কিছু দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। মা ষষ্ঠীর কৃপায় সংখ্যা তো নেহাত কম নয়। আগের তিন শ্যালক আর এক শ্যালিকাকে সাড়ে তিন পয়সা সোনার কানের ঠিকরে দুল দিয়ে জামাইকৃত্য করেছে, তখন সোনার দাম কম ছিল, নিজের সংসার ছোট ছিল। এখন দুটোই বেড়েছে। অতএব বাড়াবাড়ি করাটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া আরও দুজন লাইন দিয়ে আছে। বছর না ঘুরতেই টোপোর পরার জন্যে মুখিয়ে আছে। এদিকে শালাজরা একটি করে আন্ডা পাড়ছেন আর অন্নপ্রাশনের স্টেনলেস স্টিলের থালাবাটি কিনতে কিনতে বঙ্কিম ক্রমশই বোম মেরে যাচ্ছে। কাকে সামলাবে! বড়র মেয়ে হল, তো মেজো একটি ছেলে দিলেন। অমনি বড় কোমর বেঁধে লাগলেন ছেলের জন্যে। মেজো টেক্কা দিয়ে যাবে সহ্য হবে কেন? রেজাল্ট আবার মেয়ে। এদিকে সেজো সকলকে টেক্কা দিয়ে একসঙ্গে দুটি ছাড়লেন। প্রবল প্রতিযোগিতা। ঘরদোর বাড়ি উঠোন নবজাতকে ছয়লাপ। অনবরত চ্যাঁ ভ্যাঁ।
বঙ্কিম বলতে চেয়েছিল, সোনার এখন প্রচণ্ড দাম, একটা ভালো শাড়ি দিয়ে ছেড়ে দাও। তা কী করে হয়? এই ভাই আমার সবচে আদরের ভাই। ট্যাঁকে করে মানুষ করেছি। একটা ভারী কিছু না দিলে প্রেসটিজ থাকে না। আরে ম্যান তুমি এত রোজগার করছ? বিয়ে তো একবারই করে লোকে! এর পরের কাজ তো অনেক পরে। বঙ্কিম খুঁতখুঁত করে বলেছিল, তাহলে সেই পেটেন্ট দুল। তিন পয়সার সোনা। না না দুল নয়, দুল নয়। প্রতিমার ঘোরতর আপত্তি। দুল একঘেয়ে হয়ে গেছে। প্রতি কাজেই দুল গেছে। এবার অন্য কিছু।
অন্য কিছুটা কী? হিরের আংটি! বঙ্কিম খিচিয়ে উঠেছিল।
হিরের আংটি দেওয়ার মুরোদ আছে তোমার? প্রতিমা একটু মোচড় মেরে ছিল।
কেন নেই! তুমি চাইলেই আছে। বাড়িটা বেচে দিয়ে তোমার পেয়ারের ভাইয়ের বউয়ের আঙুলে হিরের আংটি তুলে দিই। বঙ্কিম ইস্যুটাকে আর একটু ঘোরালো করে তুলল; আমার বিয়েতে তোমার বাপের বাড়ি থেকে যা দিয়েছিল সবই তো প্রায় উশুল করে নিয়েছ আর গোটা বত্রিশ টাকা হয়তো পাওনা আছে।
এর পর প্রতিমা আর কথা বাড়ায়নি। মুখ তোলো াঁড়ি করে সংসারের কাজে লেগেছিল। বঙ্কিমও বিশেষ আমল দিতে চায়নি। তোমরা সব বিয়ে করে খাট, বালিশ, বিছানা, ফার্নিচারে বাড়ি ঠেসে ফেললে। মোটা মোটা বউ। মোটা মোটা নগদ। ভালো ভালো তত্ব। টেরিলিন, টেরিকটন, ঝকঝকে জুতো, চকচকে চেহারা। এদিকে বঙ্কিম বেচারার হাঁড়ির হাল। তার বেলায় এক কাঁদুনি, কে করবে? শ্বশুরমশাই গত হয়েছেন। তিনি থাকলে সবই হত। ছেলেরা যে যার সে তার। না। করলে জোর তো করা যায় না। প্রতিমার যুক্তি, তুমি ভিখিরি না কি? তুমি আমার রাজা। পরের ধনে পোদ্দারি করবে কেন? নিজের রোজগারে লড়ে যাও ম্যান।
খুব হিসেব হয়েছে। ব্লেডের যে-কোনও এক দিক ক্ষুরে চাপাও। গালে পড়লেই ধার বোঝা যাবে। বঙ্কিম আর হিসেবের ঝামেলায় যেতে চাইল না। কোন হিসেবটা সে শেষ পর্যন্ত রাখতে পেরেছে! মধ্য মাসেই মাইনের টাকা ফৌত। বাকি ক-টা দিন, এটা ধরে টান, ওটা ধরে টান। তখন সে। খেচর, ভূচর, জলচর। দাড়িতে একটা টান মেরেই বঙ্কিমের মালুম হল ব্লেডের হিসেব মেলেনি। হেঁ হেঁ বাবা, অতই সোজা এক চান্সে মিলে যাবে। জীবনে মেলেনি। আজ মিলবে! ছাত্রজীবনে একদিনের জন্যেও হাজার চেষ্টা করে সরল করর উত্তর শূন্য কিংবা এক হয়নি। সবসময় একটা বিদঘুটে ভগ্নাংশ পূর্ণ-চূর্ণ নিয়ে তলায় এসে থিতোত। দেখলেই চক্ষুস্থির। বঙ্কিমের শিক্ষকরা বলতেন, ছোকরার এলেম আছে। কোথা দিয়ে যে কী করে বসল। উত্তর দেখেছ। এক পূর্ণ দুশো তেত্রিশের নয় হাজার তিন; বলিহারি বাবা। শেষে বঙ্কিমের এক বন্ধু পথ বাতলে দিলে। ট্রাই। ইওর লাক। হয় শূন্য, না হয় এক। এক কাজ করবি। ধর, দুশো বত্রিশের পাঁচশো তেরো হয়েছে। ঘাবড়াও মাত। পাঁচশো তেরোর দুশো বত্রিশ দিয়ে গুণ করে দে। ইজিকোয়ালটু ওয়ান। উত্তর। যদি শূন্য না হয় ফুলমার্ক। আর যদি শূন্য করতে চাওয়া হয়েছে সেই সংখ্যাটাই মাইনাস করে দাও। শূন্য কি এক? এক কি শূন্য? এইটা ঠিক করার মধ্যেই একটু ফাটকাবাজি রয়ে গেল। ওটুকু রিস্ক তোমাকে নিতেই হবে। নো রিস্ক নো গেন।
ব্লেডটাকে আবার উলটে লাগাতে লাগাতে বঙ্কিম ভাবলে রিস্কটাই নিলুম সারা জীবন গেনটা ছাই হল কী! শূন্য আর একের ঘোরপ্যাঁচে পড়ে ফুলমার্ক আর ভাগ্যে জুটল না। গালের সাবান শুকিয়ে খুসকির মতো উড়তে শুরু করেছে। অন্যদিন আটটার মধ্যেই দ্বিতীয় পক্ষের চা এসে যায়। আজ প্রায় সাড়ে নটা বাজতে চলেছে। সম্বন্ধীর বিয়েতে বঙ্কিমের বাড়ির অবস্থা দেখলে মনে হবে মড়ক লেগেছে। সব কিছুই এলোমেলো। দেরিতে সব ঘুম থেকে উঠেছে। ঘরে ঘরে দোমড়ানো চটকানো বিছানা। প্রতিমার নীলাম্বরী আলনায় জড়ভট্টি। ব্লাউজ মাটিতে লুটোচ্ছে। উঁচু গোড়ালির জুতো যথাস্থানে নেই। সকালের শুড়িখানার মতো লন্ডভন্ড অবস্থা। শরীর যখন নিচ্ছে না বিয়েবাড়িতে নাচতে-কুঁদতে যাওয়া কেন? সকালে একবারই প্রতিমাকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। বাসী নায়িকার মতো চেহারা। চোখে অস্পষ্ট কাজল। মুখের এখানে-ওখানে প্রাচীন দেয়ালের মতো চটা ওঠা মেকআপ! পরিপাটি খোঁপা যেন থ্যাঁতলানো গোলাপের কুঁড়ি। উৎসবে ভোরের বউকে যে এত অশ্লীল দেখায়, বঙ্কিমের ধারণা ছিল না। ঠোঁটে আবার ফাটা ফাটা পানের রসের ছোপ। লাখ টাকা দিলেও ও ঠোঁট চুম্বনের অযোগ্য।
