শয়তানের দূত ছোট্ট একটা ফোঁটা লাগিয়ে দেবদূতের পাশে এসে বসল। দেবদূতকে প্রশ্ন করল, ‘এর মধ্যে তুমি শয়তানের কোনও কারসাজি দেখতে পাচ্ছ?’
দেবদূত বললে, ‘না। অনেকেই অমন করতে পারে। খদ্দেররাও অনেকে আঙুলে কিছু লাগলে বাঁশের গায়ে মুছে দেয়।’
শয়তানের দূত বললে, ‘তবে? সব দোষ আমার প্রভুর ঘাড়ে! আচ্ছা, আমি তবে আসি ভাই। তুমি খানিক বসে যাও।’
শয়তানের দূত চলে গেল। দেবদূত বসে রইল উদাস। দেবদূতদের মাঝে মাঝে অমন হয়, কিছু করতে ইচ্ছে করে না। ঘন ঘন হাই ওঠে। মানুষ হলে চা খেত। দেবদূতদের তো চা খাওয়া বারণ। চা হল শয়তানের আরক। দেবদূত দেখছে, গুড়ের ফোঁটাটা লক্ষ্য করে এক-সার পিপড়ে বাঁশ বেয়ে উঠছে। আর বেশ মোটাসোটা একটা টিকটিকি একেবারে টঙে নীচের দিকে মুখ ঝুলিয়ে স্থির। কোথাও কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার নেই। খদ্দেররা আসছে-যাচ্ছে। দাঁড়িপাল্লা, বাটখারার শব্দ। নানা কথা। কখনও বচসা। দেবদূত দেখছে, টিকটিকিটা পিঁপড়ে ধরার লোভে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তা এগোক। টিকটিকির কাজ টিকটিকি করুক। একটা বেড়াল আধবোজা চোখে থুপ্পি মেরে বসেছিল। বেড়ালটা টিকটিকি দেখে মারলে লাফ। একটা কালো মুশকো কুকুর ঝিমোচ্ছিল এক পাশে। চিরশত্রু বেড়াল। ঝাঁপিয়ে পড়ল বেড়ালটার ঘাড়ে। এইবার বেড়াল আর কুকুর ঝটাপটি করতে করতে দোকানদারের ঘাড়ে। দোকানদার এক লাফ। মাথার কাছে তাকে। তাকে যত কৌটো-ফৌটো ছিল সব পড়তে লাগল শিলাবৃষ্টির মতো। খরিদ্দার ভয়ে ছুটোছুটি। নিমেষে দোকান লন্ডভন্ড! দেবদূতও দৌড় মেরেছে। একটা গাছের তলায় শয়তানের দূত গুড়িতে হেলান দিয়ে বসে আছে। দেবদূত হাঁপাচ্ছে। শয়তানের দূত বললে, ‘এসো ভাই, বোসো, হাঁপাচ্ছ কেন?’ দেবদূত পাশে বসে বললে, ‘তোমার কেরামতি আছে ভাই।’ দেবদূত তাকিয়ে আছে। শয়তানের দূত বললে, ‘সবই আমার প্রভুর ইচ্ছা ভাই।’
বড়মামা গল্প শেষ করে বললে, ‘জানিস তো, আমার এই গুড়ের ফোঁটা। কুসীর দোষ নেই। সবই আমার বরাত। সেদিন খাটটাকে জানলার দিকে সরাব বলে যেইটানলুম, একটা পায়া মচকে। গেল। খাটটা এখন তোর ইনক্লাইনড প্লেন। এধারে শুলুম তো কিছুক্ষণের মধ্যে গড়িয়ে ওধারে। যেন খাদে পড়ে গেলুম গড়িয়ে। তারপরেই শুরু হল কসরত। গড়িয়ে ওপরে উঠতে হবে। সারারাত ধস্তাধস্তি। রাত ভোর। একে বলে একসারসাইজ অন ইনক্লাইনড প্লেন। এই ব্যায়ামের ফলে আমার ভুঁড়িটা কত উন্নত হয়েছে দ্যাখ।’
‘তাহলে মাসিমাকে কী বলব?’
‘বলবি, এক ভদ্রলোক অতি ভদ্রলোকের মতো ছাতে শুয়ে আছে।’
‘কেন শুয়ে আছ? শুয়ে কেন আছ?’
‘আমার মন খারাপ। আমার মায়ের কথা মনে পড়ছে। মা ছাড়া পৃথিবীতে মানুষের আর কে আছে! ভাই, বোন, ভাগনে থাকাও যা, না-থাকাও তা। আজ যদি মা বেঁচে থাকতেন, গোয়েন্দাগিরি করার জন্যে তোকে পাঠাতেন না, নিজেই চলে আসতেন। আমার মাথার কাছে বসে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনাতেন, কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি, বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি, গাড়ি চালায় বংশীবদন, সঙ্গে যে যায় ভাগনে মদন।’
‘তা তুমি আরও কতক্ষণ এইভাবে শুয়ে থাকবে?
‘সে তো বলতে পারছি না, মন ভালো হলেই উঠে পড়ব।’
মাসিমাকে গিয়ে রিপোর্ট করলুম। মাসিমা বললে, ‘মা থাকলে কী করত?
‘মাথার শিয়রে বসে চুলে হাত বোলাতেন আর কুমোরপাড়া শোনাতেন।
‘তাই নাকি! মা যা রাগি ছিলেন! এমন একটা দিন ছিল না, যে বড়দা পেটানি খায়নি। ব্যাপার অন্য, চল তো, আমার সঙ্গে চল।’
মাসিমা ছাতে গিয়েই বললে, ‘এই ওঠো তো। ওঠো, ওঠো।
বড়মামা বললে, ‘অসম্ভব। এখন আমার মায়ের সঙ্গে কমিউনিকেশান চলছে। নানারকম মেসেজ আসছে, ডোন্ট ডিসটার্ব।’
‘তুমি উঠবে, না গায়ে আরশোলা ছাড়ব!’
আরশোলার ভয়ে বড়মামা একবার ভুবনেশ্বরে পালিয়েছিল। সেখান থেকে আবার পালিয়ে। এসেছিল কাঁকড়াবিছের ভয়ে। আরশোলার নাম শুনে ধড়মড় করে উঠে বসল। মাসিমা বললে, ‘আমার এই কৌটোয় বেশ বড়সড়ো তেলচুকচুকে একটা আছে, পিঠের দিকেই ছাড়ি।’
বড়মামা এক লাফে ছাতের ট্যাংকের কাছে। মাসিমা আমাকে বললে, ‘মাদুরটা তোল।’ এই মাসখানেক আগে প্রচুর খরচ করে ছাতে পাথর বসানো হয়েছিল। একটা পাথর চৌচির। মাসিমা হুংকার করে উঠল।
সোনার বালা
এব্লেড হ্যাজ ফোর স্লাইডস। তিন দিন মোটে কামিয়েছে। তার মানে একটা দিক এখনও অব্যবহৃত। কিন্তু কোন দিকটা? রোজই মনে রাখার চেষ্টা করে। রোজই ভুলে যায়। সামান্য একটা হিসেব। এক, দুই, তিন, চার। তাও খেয়াল থাকে না! কী যে তোর মাথা বন্ধু। সকাল ন টার সাইরেন অনেকক্ষণ বেজে গেছে। সাত মাইল দূরে অফিস। অনেক বাধা ঠেলে সাড়ে দশটার মধ্যে যেমন করেই হোক পৌঁছোতে হবে। এদিকে চারটে আসল কাজ বাকি। ক্ষৌরী খাজানা নাহানা খানা পরনা। প্রথম কাজটাই আটকে গেছে। ব্লেডের হিসেব গোলমাল করে ফেলেছে।
সকাল থেকেই আজ সব ট্রেন লেটে চলেছে। গতকাল বঙ্কিমের এক সম্বন্ধীর বিয়ে ছিল। বিয়ে। হয়েই ছিল। গতকাল গেছে বউভাত। একপেট আবর্জনা নিয়ে শুতে শুতেই একটা বেজেছে। সারা রাত প্রায় ঘুম নেই। জঠরে বিভিন্ন সুখাদ্যের লাঠালাঠি। পরিপাক যন্ত্রের নির্দেশ কেউই মানতে চাইছে না। আটখণ্ড মাছ জোড়া লেগে বিশাল কালবোশ হয়ে এপাশ থেকে ওপাশ খেলে খেলে বেড়াতে চাইছে। কয়েক টুকরো মাংস বিগত জীবনের শোক ভুলতে পারছে না। মাঝে। মাঝে ব্যা ব্যা করে উঠছে। ফ্রায়েড রাইস সমস্ত স্নেহ বস্তু ত্যাগ করে কুইক পলিউশানের দায়ে এক কোণে আলো চাল মেরে বসে আছে; এই হট্টগোলে দাশ বেচারা পশু চর্বির ভার মুক্ত করে সমস্যা আরও সাংঘাতিক করে তুলেছে। গোটা কতক কমলাভোগ ক্রিকেট বলের মতো কেবলই বোল্ড আউট করার চেষ্টা করছে। পাকযন্ত্র হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। আমি হলুম গিয়ে ঝোলভাতের যন্ত্র, তুমি ঠুসেছ মোগলাই খানা। আই হ্যাভ নো রেসপনসিবিলিটি, তোমার মাল তুমি বুঝে নাও। মাঝরাতে বিনিদ্র বঙ্কিম জোয়ানের আরক খেতে খেতে সার বুঝেছে, অনুরোধে হয়তো পেঁকি গেলা যায় কিন্তু হজম করা যায় না। আর একটা জিনিস বুঝেছে, আড়াইশো টাকা। এখনও এই বাজারেও খেয়ে উশুল করা যায় না।
