সঙ্গে সঙ্গে চিঙ্কার। চারপাশ থেকে সবাই ছুটে এল।’
‘না, চিৎকার করে না। সরে যায়। কেমন যেন একটা ঘৃণার ভাব। যেন পচা মাছের গন্ধ থেকে পালাতে চাইছে।’
‘হয়েছে কী! এরপর চিৎকার করবে। তারপর হাতের কাছে ধারালো কিছু পেলেই বসিয়ে দেবে গলায়। খুব সাবধান!’
‘কীভাবে সাবধান হব?’
‘কেন, শত হস্তেন। ত্রিসীমানায় যাবেন না।’
‘তা হলে বিয়ে করার মানেটা কী হল?’
‘ওরকম হয়। কারুর কারুর জীবনে এরকম হয়। কী করা যাবে?’
‘কী করা যাবে মানে? আমার স্ত্রীকে ধরে আচ্ছা করে দাওয়াই দিয়ে দিন।’
‘আমাকে ধমকালে কী হবে! ধমকান আপনার ভাগ্যকে। খুঁজে বের করুন সেই অপরাধীকে যে আপনার স্ত্রীকে রেপ করেছিল। ঠিক আপনার মতো চেহারার একটা লোক আছে।’
আমি মন খারাপ করে ফিরে এলুম আমার কর্মস্থলে। আমার মতো আর একটা লোক আছে, যে জোর করে আমার স্ত্রীকে ভোগ করেছিল। কে সেই রাসকেল? তাঁকে খুঁজে বের করতেই হবে। সে নিশ্চয় আমার শ্বশুরবাড়ির তরফের কেউ। সাহস করে আমার স্ত্রীকে জিগ্যেস করতেও পারছি না।
একদিন শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কায়দা করে, দেওয়ালের ছবি, অ্যালবামের ছবি সব দেখলুম। নাঃ, কোথাও আমার মতো চেহারার কেউ নেই।
সেই দিন, সেই দিনের কথা আমি কোনওদিনও ভুলব না। সেদিন আমি মরিয়া। হয় এসপার না হয় ওসপার। আমার স্ত্রী শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল। ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। ঠেলে ঢুকলুম। কবজায় তেল কমেছে। সামান্য শব্দ হতেই ফিরে তাকাল। বিরক্ত হয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী চাই?
‘তোমার কাছে আজ একটা সত্য জানতে চাই। বিয়ের আগে আমার মতো চেহারার কেউ একজন তোমাকে রেপ করেছিল। কে সে? আমি জানতে চাই কে সে?
ছোট্ট একটা উত্তর পেলুম ‘ছোটলোক। ইতর।’
পরের দিনই আমার স্ত্রী চলে গেল। চলে গেল বাপের বাড়ি। সে আর এখন আমার স্ত্রী নয়। কোনও সম্পর্ক নেই তার সঙ্গে। আমি কেবল খুঁজতে লাগলুম, কে সেই লোক! যে আমার আকৃতি নিয়ে আমারই সর্বনাশ করে গেল। মেয়েটাকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। বড় মিষ্টি ছিল সে।
আমি পাগলের মতো খুঁজতে লাগলুম। তাকে আমার চাই। সেই লোকটাই এখন আমার ধ্যানজ্ঞান। আমি কোথায় পাব তারে। সেদিন মাঝরাতে আমার নির্জন ঘরে তাকে পেয়ে গেলুম। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই তাকে পেয়ে গেলুম। সেই বিশ্রী, কামুক লোকটা ফুলো চোখে বিষম বিপন্ন মুখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চিৎকার করে বললুম, ‘রাসকেল।’
কোলনের শিশিটা ছুড়ে মারলুম তাকে। ঝনঝন শব্দ করে আয়নাটা ভেঙে পড়ল। লোকটা আর নেই! সারা ঘরে ভুরভুর করছে বিলিতি কোলনের গন্ধ। মারতে পেরেছি। যতক্ষণ না আর একটা আয়না আসছে ততক্ষণ সেই লোকটা মৃত। যে আমার স্ত্রীর ওপর অত্যাচার করেছিল।
সোনার পালক
আকাশ। হঠাৎ সেই আকাশ থেকে কী একটা পাক খেতে খেতে নীচের দিকে নেমে আসছে। ঠক করে বুকে এসে পড়ল। তুলে দেখল, এই এতবড় একটা সোনার পালক। ভীষণ সুন্দর! তার যে কত টাকা দাম হবে, কারও ধারণা নেই।
‘কীসের পালক? কার পালক?’
‘হাঁসের পালক। এক ধরনের স্বর্গীয় হাঁস আছে, যারা আকাশের খুব উঁচুতে, মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যায়, তারা স্বর্গে থাকে। পৃথিবীর একটা জায়গায় তারা পূর্ণিমার রাতে নামে, সেই জায়গাটার নাম মানস সরোবর। পৃথিবীর মানুষের জন্যে তারা ডানা থেকে একটা করে পালক খসায়। সেই সোনার পালক কে পায় জানিস? যারা সৎ, সুন্দর, জীবনে একটাও মিথ্যে কথা বলে না, লেখাপড়ায় ভালো, ফাস্ট-সেকেন্ড হয়।’
‘তুমি যা বললে, সেই রকম হলে, আমারও বুকে সোনার পালক পড়বে?’
‘আলবাত পড়বে।’
সেই দিনই মনে মনে সংকল্প করলুম, একটাও মিথ্যে কথা বলব না। একটাও বাজে কাজ করব না। লেখাপড়া মন দিয়ে করব। সবাই বলতে লাগল, ‘পিন্টুটা হঠাৎ কীরকম বদলে গেছে। পরীক্ষাতেও ফাস্ট-সেকেন্ড হচ্ছে।’
বড়মামা বলেছিল, ‘দেখ, এসব কথা কারওকে বলবি না, সিক্রেট। সোনার পালকের কথা কারওকে বলবি না। আমি আবার জিগ্যেস করলুম, তোমার পালকটা কোথায়? বড়মামা বললে, সেই পালকটা দিয়ে আমি ভগবানের কাছ থেকে বুদ্ধি কিনেছি। বুদ্ধি তো দোকানে পাওয়া যায় না।’
তখন সবই বিশ্বাস করেছিলুম। বড়মামা, আমি যখন আর একটু বড় হলুম, তখন একদিন বললে, ‘সোনার পালকের রহস্যটা বুঝলি। সোনার পালক হল চরিত্র।’
আমি বললুম, ‘সে আমি অনেক আগেই বুঝেছি বড়মামা। সোনার পালক আমি পেয়েছি।’
বড়মামা বললে, ‘সেই কলমে নিজের জীবনী লিখে যা।’
বড়মামা ছাতের মাঝখানে একটা মাদুর পেতে চিত হয়ে শুয়ে আছে। চোখ দুটো ভোলাই রয়েছে। মাসিমার নির্দেশমতো চুপি চুপি এলেও বড়মামা ধরে ফেলে, ‘কীসের অনুসন্ধান ভাগনে?’
‘না, কোনও অনুসন্ধান নেই। বেড়াতে এসেছি।’
‘তা ভালো। তবে আমি জানি, কী কারণে এসেছিস!’
‘কী কারণে!’
‘কুসী পাঠিয়েছে। দেখে আয় তো কী করছে!’
‘মিথ্যে কথা বলব না, মাসিমা বললে দেখে আয় তো বড়টা অনেকক্ষণ ছাদে একলা রয়েছে, কী আবার অপকর্ম করছে।’
‘এ অপবাদ আমার ঘুচল না রে ভাগনে! এতখানি বয়েস হল আমার। তুই সেই গল্পটা জানিস?’
‘কোনটা?
‘গুড়ের ফোঁটা।’
‘না।’
‘তাহলে শোন। এক মুদিখানার দোকানের বাইরে দুই ভদ্রলোক বাঁশের মাচানে পাশাপাশি বসে আছে। ওদিকে দোকানি বসে আছে টাটে। খুব কেনাবেচা চলছে। সকালের ভিড়। ওই দুই ভদ্রলোকের একজন হল শয়তানের দূত আর একজন দেবদূত, দেবতাদের দূত। শয়তানের দূত খুব দুঃখ করে দেবদূতকে বলছে, ‘দ্যাখো ভাই, পৃথিবীর যেখানে যত গণ্ডগোল, লোকে বলে শয়তানের কারসাজি। আমার প্রভুর এমনই বরাত। আচ্ছা, এই যে গুড়ো টিনটা এইখানে রয়েছে, এর থেকে আঙুলে করে একটা ফোঁটা নিয়ে আমি এই বাঁশের খোঁটায় লাগালুম।’
