কলকাতায় গিয়ে এক সাইকোলজিস্টের সঙ্গে দেখা করলুম। বিরাট ব্যক্তি। বড়-ফি। ভদ্রলোক ভেবেছিলেন আমি বোধহয় রোগী। অনেকক্ষণ আমাকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে দেখলেন। একটা টেবিল, এপাশে আমি, ওপাশে সাইকোলজিস্ট। তিনি বসে আছেন আরামদায়ক একটা চেয়ারে। যে চেয়ার গোল হয়ে ঘোরে। সামনে-পেছনে দোলে।
হঠাৎ আদেশ করলেন, ‘ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে উঁচু করে ধরে রাখুন, যেভাবে অয়েল। পেন্টাররা ছবি আঁকে।’ আমি আমার ডান হাতটা সামনে উঁচু করলুম। সেইভাবে ধরে রাখলুম কিছুক্ষণ। মাথার ওপর আলো ঝুলছে। হাতের ছায়া পড়েছে টেবিলের ওপর। ভদ্রলোক সেই ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। মিনিট দুয়েক ওইভাবে রাখার পর বললেন, ‘নামান।’
হাত নামালুম। তিনি চেয়ারের পেছনে এলিয়ে পড়লেন। সেই আয়েশি অবস্থায় প্রশ্ন করলেন, ‘রাতে ভালো ঘুম হয়?’
‘কার কথা বলছেন?’
‘আপনার। আপনার ভালো ঘুম হয়?’
সাইকোলজিস্টরা সাধারণত মিষ্টি গলায় কথা বলেন। কারণ মনোরোগের তো কোনও ওষুধ নেই। শুধু কথা। কথা দিয়ে, কথা দিয়ে রোগীর ভেতরে যা জমে আছে সব বের করে আনেন। আমি বললুম, আমার ঘুম হওয়া, না হওয়ার ওপর, আমার স্ত্রীর ভালোমন্দ নির্ভর করে কি?’
‘কেন করবে না। বিছানায় সারারাত ছটফট করলে পাশে যে শুয়ে থাকে তার অসুবিধে হবে না! ভীষণ অসুবিধে হয় ভাই! আমি প্রথমে আপনাকে ঘুম পাড়াতে চাই।’
প্রেসক্রিপশান লেখার জন্যে ডাক্তারবাবু প্যাড টেনে নিলেন। আমি বললুম, ‘আমার বেশ ভালোই ঘুম হয়। গভীর নিদ্রা। বিছানায় পড়ামাত্রই আমার নাক ডাকতে শুরু করে।’
প্যাড থেকে কলম তুলে ডাক্তারবাবু বললেন, ‘নিজের নাক ডাকা শুনতে পান? তার মানে ঘুমে লিক আছে।’
‘ঘুমে লিক মানে? ঘুম কি চৌবাচ্চা?’
‘ঘুম হল চাদর। মানুষ মারা গেলে চাদর চাপা দেয় জানেন তো? সেই চাদরকে বলে ‘শ্রাউড’। ঘুম হল সেই চাদর। সেই চাদরে ফাঁকফোকর থাকলেই মানুষ স্বপ্ন দেখবে, নাক ডাকার শব্দ শুনবে।’
‘আমার নাক ডাকে না। আমি বললুম কথার কথা।’
‘স্বপ্ন দেখেন?’
‘দেখি।’
‘কী জাতীয় স্বপ্ন?’
মনে থাকে না।’
‘তার মানে স্মৃতি কাজ করছে না। স্মৃতিটাকে মেরামত করতে হবে। তাহলে ওইদিক থেকে শুরু করা যাক। একটা ওষুধ থাকছে, সাত দিন খাবেন।’
আমি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বললুম, ‘আমার স্মৃতি চাই না। জীবনের সব পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে। আমি ভুলতে চাই।’
‘বুঝেছি, বুঝেছি, এই সব অসুখের পেছনে সবসময় একটা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা থাকে। রোগী আপ্রাণ চেষ্টা করে ভোলার। ভুলতে পারে না। ছটফট করে, তখন সে ভেতর থেকে ভেঙে দু-খণ্ড হয়ে যায়। একে আমাদের ভাষায় বলে প্লিট পারসোন্যালিটি। এর পর তো আপনি মশাই ক্রিমিন্যাল হয়ে যাবেন। কোনদিন মার্ডার করে ফেলবেন।’
‘আপনি ধরেছেন ঠিক, সত্যিই আমি একদিন খুন করে ফেলব। একদিন ধরব আর গলায় চালিয়ে দোব।’
‘অ্যায়, এই সন্দেহটাই করেছিলুম। প্রথম প্রথম এই রকম ইচ্ছেই হবে। পরের স্টেজে ইচ্ছে করবে আত্মহত্যা করতে।’
‘আপনি কার কথা বলছেন?’
‘কেন আপনার কথা!’
‘ধুর মশাই, আমি রোগী হতে যাব কেন? রোগী আমার বউ।
সাইকোলজিস্ট তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘আপনার বউ যদি রোগী হয়, আপনি এসে মরেছেন কেন? যান তাঁকে নিয়ে আসুন।’
‘সে যদি আনতে পারতুম, তাহলে আপনার কাছে আসব কেন?’
‘পাগলামির চিকিৎসা বকলমে হয় না। রোগীকে যদি আনতে পারেন হবে, না হলে হবে না।’
বয়স্ক মানুষ। রেগে গেছেন। এই এতটা সময় আমার সঙ্গে বৃথাবকবক করলেন। এই বকবক করাকে এঁদের ভাষায় বলে সিটিং। আমি অসহায়ের মতো বসে আছি। তিনি আমার দিকে নয়, তাকিয়ে আছেন সিলিং-এর দিকে। হঠাৎ মনে হয় দয়া হল, জিগ্যেস করলেন, ‘কেসটা কী?’
আমি যেন হালে পানি পেলুম। সেই কোথা থেকে কোথায় এসেছি কত আশা নিয়ে। বেশ গুছিয়ে বললুম, আমার কেসটা কী! বেশ মন দিয়ে শুনলেন। শুনে বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর এইরকম ব্যবহারের কারণ অতীতের তিক্ত স্মৃতি।’
‘অতীতে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। এই তো সবে বছর তিনেক বিয়ে হয়েছে আমাদের।’
‘খোঁজ নিয়ে দেখুন আপনার মতো দেখতে আর একজন কেউ আছে!’
‘তা কী করে হয়! আমার কোনও যমজ নেই। এই এক পিস আমিই পৃথিবীতে ঘুরছি।’
‘পথিবী সম্পর্কে আপনার ধারণা এত কম! ভালো করে মন দিয়ে শুনুন, অনেকটা আপনার মতো। দেখতে আর একজন লোক অতীতে কোনও একসময় আপনার স্ত্রীকে রেপ করেছিল।’ আমি চমকে উঠলুম, ‘অ্যাঁ, সে কী! বলেন কী? কোথায় সে, আমি তাকে খুন করব।’
‘উত্তেজিত হবেন না! খুন করলে মানুষকে জেলে যেতে হয়। বিচারে ফাঁসি হয়। এতে আপনার লাভ কিছু হবে না, নিজের জীবনটাইনষ্ট হবে।’
‘তাহলে! তাহলে কী হবে?’
‘কী আবার হবে! কিছুই হবে না। এইভাবেই সারা জীবন চালাতে হবে। চেহারা তো আর পালটাতে পারবেন না। ভগবানের ওয়ার্কশপ থেকে যা বেরিয়ে এসেছে তার ওপর আর কারিকুরি চলবে না।’
‘তার মানে অন্যের পাপের বোঝা সারাজীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে?
‘হবে! কী আর করবেন! আপনার স্ত্রীর দিকে আপনি যেই এগোচ্ছেন তাঁর চোখের সামনে নেমে আসছে কুয়াশার পর্দা। তাঁর অতীত। তিনি দেখছেন, এগিয়ে আসছেন আপনি নয়, সেই রেপিস্ট। দুটো হাত যেন দুটো থাবা। মুখটা হায়নার মতো, ভল্লুকের মতো, গোরিলার মতো। তিনি ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছেন। আপনি এগোচ্ছেন ধীরে ধীরে। আপনার প্রেম নিয়ে, ভালোবাসা। নিয়ে, অবেগ নিয়ে। আপনি কিছুই জানেন না। জানার উপায়ও নেই। মনোজগতের ব্যাপার। সাব-কনসাস। আপনি আরও কাছে গিয়ে স্ত্রীর কাঁধে হাত রাখার জন্যে একটা হাত বাড়ালেন।
