একদিন শরীর গোলমাল করায় অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এলুম। আমার বউ বললে, অসময়ে হঠাৎ বুঝি দেখতে এলে আমি কী করি? শুনে বড় ব্যথা পেলুম মনে। কে এক ফুলদা। আমি তার মতো হতে যাব কেন? আমার একটাই দুঃখ, আমার একটা মাত্র বউ তা-ও হাতছাড়া হয়ে যায় বুঝি। হঠাৎ একটা সুযোগ এসে গেল। আমার অফিস থেকে একজনকে আন্দামানে পাঠাতে চাইছে। কেউই যেতে রাজি নয়। কে যাবে দ্বীপান্তরে! আমি এগিয়ে গেলুম। আমাকে। পাঠান স্যার। আমার অবাঙালি বড়কর্তা মহাখুশি। তিনি গোটা অফিসকে শুনিয়ে বললেন, কে বলে বাঙালি ঘরকুনো? এখনও এমন বাঙালি আছে যে স্বেচ্ছায় দ্বীপান্তরে যেতে চায়। প্রথমে ভেবেছিলুন আমার বউ হয়তো বিদ্রোহ করবে। না, সে-ও খুব খুশি। শুনেই আনন্দে লাফিয়ে উঠল, আন্দামান, পোর্টব্লেয়ার। আজই চলো। ওখানে আমার নীলু আছে।
নীলুটা আবার কে?
আমাকে গান শেখাত, নীলুদা আমার। অবিকল ঋষি কাপুরের মতো। গলায় বসে আছে মহম্মদ রফি।
যাঃ, আর তো কোনও উপায় নেই। একেই বলে, তপ্ত কটাহ থেকে আগুনে।
সেই লোকটা
আমাকে কেউ দেখতে পারে না। আমার চেহারা সুন্দর। আমি লেখাপড়া নেহাত কম জানি না। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছি। ভালো চাকরি করতুম। বিয়েও করেছি। আমার সব আছে; কিন্তু আমাকে কেউ ভালোবাসে না। আমার একটা গর্ব ছিল—চেহারা যখন সুন্দর, রোজগার যখন। ভালো, তখন আমাকে আমার বউ ভালোবাসবে, অন্য মেয়েরা আমার প্রেমে পড়বে। কর্মস্থানে বছর বছর আমার প্রোমোশান হবে। জুনিয়ার থেকে সিনিয়ার। সিনিয়ার থেকে চিফ ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাব। আমার বাড়ি হবে, আমার গাড়ি হবে, আমার ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স বছর বছর বাড়বে। জীবনটা আমার সুখে ভরে যাবে। মানুষ ভাবে এক হয় আর এক।
আমার সঙ্গে আমার বউয়ের বয়সের পার্থক্য একটু বেশি। এমনটা হওয়া উচিত ছিল না, তবু হয়েছে। আমি ভালোবাসা করে বিয়ে করিনি। দেখাশোনার পর যেমন হয়েছে, সেইটাই আমি মেনে নিয়েছি। এই বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন আমার দিদি আর জামাইবাবু। বড় ঘরের মেয়ে। তাকে মিষ্টি দেখতে। শ্যামলা। হাসিটি ভারি সুন্দর। চিরকালই আমি একটু বড়সড় দেখতে। আমার বাবা জেলা আদালতে ওকালতি করতেন। জায়গাজমিও ছিল। প্রাচুর্যে মানুষ হবার ফলে দেহটা বেশি বেড়ে গেছে। বউয়ের সামনে আমার লজ্জা করত। আয়নায় পাশাপাশিদুজনের। প্রতিফলন দেখলে মনে হত, আমি স্বামী নই, বাবা। হিন্দুসমাজে এইরকমই নাকি হয়!
জোর দিয়ে বলতে পারব না, তবে আমার মনে হয়, এই বিয়েতে মেয়েটার বোধহয় মত ছিল না। হয়তো অন্য কোনও ছেলের সঙ্গে আলাপ ছিল। বিয়ের পর স্ত্রীর ওপর স্বামীর যে সব অধিকার খাটে, সেই সব অধিকার ফলাতে গিয়ে পদে পদে ধাক্কা খেয়েছি। জোর করে কাছে টানতে হয়। ছেড়ে দিলে এত দূরে সরে যায়, যেন বিপরীত মেরুতে বসবাস। এইরকম একটা সম্পর্কের জন্যে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। একেই বলে সুখে থাকতে ভূতে কিলানো। কেউ কোনওদিন শুনেছে অনুমতি নিয়ে বউয়ের গায়ে হাত দিতে হয়!
অনেক চেষ্টা করলুম, যদি সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়, হল না। একদিন জোর করে একটু ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলাম, খেঁকিয়ে উঠল। বলল, দামড়া। মনটা একেবারে বিগড়ে গেল। যেমন আমার বরাত! কাকে ঠোকরানো ফল। বিয়ে না হলে ছিল একরকম। এখন আর কোথায় নৈবেদ্য সাজাব! কে আর আমাকে নেবে? মনকে শক্ত করার চেষ্টা করলাম, এ আর কী এমন সমস্যা! চাকরি বাকরি করছি। রোজগারপাতি ভালো, একটা মেয়ে দামড়া বললে কী এসে-যায়!
এইরকম একটা সময়ে, হঠাৎ আমাকে বাইরে বদলি করে দিলে। পদোন্নতি হল। ভালো কোয়ার্টার পেলাম। ফলের বাগান। চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনা করার একজন লোক, আবার একটা গাড়ি। ব্যাপারটা বেশ জমে গেল। জায়গাটাও বেশ সুন্দর। সুন্দর পরিবেশ। সহকর্মীরাও বেশ ভালো। শুধু ওই, একবালতি দুধে একটা মাছি। জীবন একঘেয়ে সুরে বাঁধা পড়ে গেল। ভোরবেলা বেরোই। দুপুরে খেতে আসি। আবার বেরোই। আবার আসি। বইপত্তর ওলটাই। রেডিয়ো শুনি। স্পেয়ার চালাই। ঘুমিয়ে পড়ি। জীবনের এই রুটিন। কোনও নড়চড় নেই।
রক্তমাংসের মানুষ এভাবে ক’দিন চালাতে পারে! আমি তো রামকৃষ্ণ নই। আমার একটা গাড়ি আছে। দূরে একটা পাহাড় আছে। পাহাড়ের পাশে একটা জঙ্গল আছে। তার পাশে একটা নদী আছে। সব কিছুর পাশেই একটা না একটা কিছু আছে। আমার পাশে আছে শীতল একটা স্ত্রী। ছুটির দিন যদি বলি, চলো না কোথাও বেড়িয়ে আসি। উত্তরে প্রথমে মুখ বাঁকায়। যেন পরপুরুষ কোনও কু-প্রস্তাব দিয়েছে! বেশি জেদাজেদি করলে বলে, ‘তোমার সঙ্গে কোথাও যেতে আমার। ইচ্ছে করে না’।
‘তাহলে বিয়ে করলে কেন?’
‘আমি তো করিনি। তুমি করেছ।’
আমি গুন্ডা নই, বদমাইশ নই, মাতাল নই, লম্পট নই। আমার একটা আত্মসম্মান আছে। আমি কোনও জোর খাটাতে পারি না। আমি জানি, আমার গায়ের জোরের কাছে ওকে হার মানতেই। হবে। গায়ের জোরে তো সম্পর্ক তৈরি হয় না। সম্পর্ক মনের ব্যাপার। গায়ের জোরে দেহ পাওয়া যায়, মন পাওয়া যায় না। আমি মন পেতে চাই, দেহনয়। বিয়ে করে আমি একটা দেহ পেয়েছি। যার মন পড়ে আছে অন্য জায়গায়। সেই জায়গাটা কোথায়! আমার বউ তো আর মীরাবাঈ নয়! যে বলবে, ‘মেরে তো গিরিধর গোপাল দুসরোন কই। জাকে শির মোর মুকুট মেরে পতি সোই।।’ খাচ্ছে দাচ্ছে, চুল বাঁধছে, ভালো শাড়ি পরছে, গুনগুন গান গাইছে, ফুলের বাগানে প্রজাপতি হয়ে উড়ছে, অথচ আমার ব্যাপারেই অদ্ভুত একটা ঘৃণা। যার কোনও কারণ নেই।
