আমার এই তোয়াজে, আমার এই রূপমুগ্ধতায় আমার বউয়ের অহংকার বেশ বেড়ে গেল। খই ফোঁটার মতো কথা ফুটল। আমাকে বেশ হুকুম-টুকুম করতে লাগল। মাঝে মাঝে দূরে সরিয়েও দিতে লাগল, ডোন্ট ডিস্টাব মি বলে। একদিন আমার হাতের পাশে তার হাতটা ফেলে বলে কী? আমার হাতটা কী সুন্দর। তোমার হাতটা যেন বনমানুষের মতো। আমার খুব খারাপ লাগল। আমার হাতে-পায়ে একটু লোম বেশি। সে-তো পুরুষের লক্ষণ। একদিন ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুল বাঁধছে, আমি সোহাগ করে পেছনে এসে কাঁধে দু-হাত রেখে ঘাড়ের পাশ থেকে মুখ বের করে উম উম শব্দ করছিলুম। সব স্বামীই এইরকম করে থাকে। আমার বউ আয়নায় চোখ রেখে বললে, তোমার মুখটা আমার মুখের পাশে বড় বেমানান।আমি ছিটকে সরে এলুম। আমার নাকটা থ্যাবড়া। চোখ দুটো বেলের মতো গোল গোল আর ঢোকা ঢোকা, কিন্তু আমার স্বাস্থ্য একেবারে ষণ্ডামার্কা। বুকের ছাতি? তেমনভাবে চেপে ধরলে সুন্দরীর খাঁচা খুলে যাবে। মনে মনে আমার প্রেম যত বাড়ছে, ওর ঘৃণাও যেন ততই বাড়ছে। সেদিন একটা সিনেমা দেখতে দেখতে আপনমনে বলে উঠল, উঃ ফ্যান্টা দেখি পর্দায় ঋষি কাপুর আর একটা মেয়ে। আমি। জিগ্যেস করলুম, কে ফ্যান্টা? বলে, ঋষি কাপুর। মেরা দিলকা পেয়ারে। দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গি করলে। আমার বিশ্রী লাগল। এই কথাটা আমি প্রথম শুনলুম। নিজেকে খুব ছোট মনে হল। বউ সুন্দরী, আমি তার প্রেমের গামলায় কমলাভোগের মতো হাবু-ডাবু অথচ তার মনে বাসা বেঁধে আছে চিত্রতারকা। রাতে তাকে স্বপ্নেও দেখে নিশ্চয়। প্রেমের কুচকাওয়াজে আমি ক্রমশই। পেছোতে লাগলুম। সেদিন আমার স্কুটারের পেছনে যেতে যেতে বেশ কবি কবি চেহারার একজন যুবকের সঙ্গে কথা হল। নির্জন একটা জায়গায় স্কুটার দাঁড় করিয়ে জিগ্যেস করলুম, মালটা। কে? স্কুল মিস্ট্রেসের মতো এক ধমক মেরে বললে, ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখো। মাল আবার কী? মাল? বিষ্ণুদাকে তুমি মাল বলছ? কত বড় নাট্য পরিচালক জানো? একাদেমিতে প্রতি বৃহস্পতিবার ওঁর নাটক হয়। লেখক, পরিচালক, অভিনেতা, সংগীত পরিচালক। একটা জিনিয়াস। বুঝলে জিনিয়াস। চেহারাটা দেখেছ? ভীষণ রোমান্টিক।
আলাপ হল কী করে?
হয়ে গেল। স্টেশনারি দোকানে জিনিস কিনতে গিয়ে। আমাকে সরাসরি বললেন, আপনার অমন নায়িকার মতো চেহারা, অভিনয় করুন না। অমন গলা।
তা তুমি কী বললে?
আমি বললুম সুযোগ দিন না। এর পরের নাটকে আমি হিরোইন হব। নাটক থেকে ফিলম। উঃ টেরিফিক। আমাদের পাশ দিয়ে একটা মারুতি যেতে যেতে হঠাৎ থেমে পড়ল। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে জিগ্যেস করলে, জগাদা এনি ট্রাবল? ছেলেটা আমার খুব চেনা। বহুবার দেখা হয়েছে কিন্তু আগে কখনও কথা বলেনি। ব্যবসাদার। ডাঁটেই মরত। আজ কী হল কে জানে!
গাড়িটা বাঁদিকে রেখে নেমে এল। সামনে এসে আমার বউয়ের দিকে তাকিয়ে ন্যাকা ন্যাকা গলায় বললেন, কেমন আছেন বউদি? চললেন কোথায়? আমার বউ অমনি গলে গিয়ে বললে, নিউমার্কেট। আপনার নাম তো রতনদা? দীঘায় একটা বিশাল হোটেল করছেন।
একবার পায়ের ধুলো দিন না।
আমি সঙ্গে সঙ্গে স্কুটারে স্টার্ট দিলুম। আমার রক্ত ফুটছে। ছোকরা আমাকে টপকে আমার। বউয়ের সঙ্গে খুব ভাব জমাচ্ছে। শয়তান! আমাকে কোনও পাত্তাই দিচ্ছে না। আবার ডাকার। ছিরি দেখো। জগাদা। স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে শুনলুম রতন বলছে, এমন বউদির জন্য একটা গাড়ি কিনুন জগাদা। আমার বউ আবার ঘাড় ঘুরিয়ে বললে—বাই বাই।
ছেলেটা এত বড় শয়তান। পেছন দিক থেকে ওভারটেক করে যেতে যেতে বলে গেল, স্কুটার খুব রিস্কি বউদি। আমি একটু স্পিড বাড়াতেই আমার বউ বললে, কেন রিস্ক নিচ্ছ? মারুতির পিকআপ ভীষণ ভালো। লাল আলোতে মারুতি আটকে গেছে। আমার স্কুটার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ছোকরা বললে, বউদি আপনার ভয় করছে, আমার গাড়িতে চলে আসুন। আমিও নিউমার্কেট।
আমার বউ আমাকে জিগ্যেস করলে, হ্যাঁ গো যাব? আমি ঘাড় ঘুরিয়ে কটমট করে তাকালুম তার দিকে। একটুও ভয় না পেয়ে আমার বউ বললে, তোমার মনটা ভীষণ নীচ। ঠিক আমার ফুলদার মতো। সন্দেহবাতিক। বউদিকে তালা-চাবি দিয়ে রাখত। গত বছরে ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমি গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে সোজা বাড়ি চলে এলুম। আমার বউ সাজগোজ না ছেড়েই সোজা বিছানায়। চাদর মুড়ি। পা দুটো বেরিয়ে ছিল। সুন্দরীর সুন্দর পা। কতক্ষণ নিজেকে ঠিক রাখা যায়! ধীরে ধীরে আমি গলতে শুরু করলুম। শেষে চরম পরাজয়।
এর পরেই শুরু হল নানা অছিলায় আমার বাড়িতে লোকজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা। যারা জীবনে আমার খোঁজ রাখত না, তারাও আমার খবরাখবর নেওয়ার জন্য ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কী খবর? বলেই তারা চলে যেত আমার বউয়ের কাছে। ওদিকে হাসির ফোয়ারা, এদিকে আমি হয়তো গালে ভোঁতা ব্লেড ঘষছি। ওদিকে চা চলছে, চানাচুর চলছে। এদিকে আমি শুকনো খবরের কাগজে মুখ থুবড়ে বসে আছি। একেই বলে অন্যের জন্যে চিঁড়ে ভেজানো। আমার বউ আড্ডা মারে, আমি হুকুম তামিল করি। মিষ্টি আনি, চায়ের জল চাপাই। নিমন্ত্রণের সংখ্যাও সাংঘাতিক বেড়ে গেল। যে যেখানে আছে সবাই সব ব্যাপারে চিঠি পাঠায়। বিয়ে, ভাত, এমনকী শ্রাদ্ধও। ন্যাড়া মাথা। সবে পিতৃবিয়োগ হয়েছে। ভক্তদাস বাবাজী কীর্তন গাইছেন। সেই অবস্থায় সব ছেড়ে আমার বউকে ধরেছে। কী ভালো যে লাগছে বউদি আপনি এসেছেন। শোকার্ত মানুষকে কিছু বলাও যায় না। শোকে আধিক্যে বউদিকে মাঝে মাঝে জড়িয়ে ধরছে। পরিবেশনকারী সামনে দাঁড়িয়ে একটা রাধাবল্লভী দোলাচ্ছে, আর বলছে —আর একটা বউদি, প্লিজ আর একটা। দিলেই মিটে যায়, অন্যরাও পায়। দেবেও না সরবেও । আমি বোকার মতো বসে বসে ভাবি—এ কার বউ!
