‘তা হলে এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্যে? মনটাকে একটু ফ্রেশ করে নেওয়ার জন্যে!’
‘না না, ফ্রেশ-ট্রেশনয়। আমার কি এত সময় আছে? আটকে পড়েছি। আমার এখন দুটো সমস্যা। প্রথম সমস্যা, গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। সঙ্গে আমার স্কুলের একটি ছেলে ছিল। তাকে পাঠিয়েছি, কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে এএবিতে একটা ফোন করার জন্যে। দ্বিতীয় সমস্যা হল, বাড়ি ফেরার সমস্যা। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দুটো চাবি। একটা থাকত আমার কাছে আর একটা ওর কাছে। আমার চাবিটা আমি সকালে কোথায় হারিয়েছি। ওর চাবিটারও কোনও হদিশ পাচ্ছি না। ব্যাগে নেই, পকেটে নেই। ও তো কথা বলতে পারছে না। জিগ্যেস করে উত্তর পাব না। আমাকে একেবারে হেল্পলেস করে দিয়েছে। সারারাত কী যে হবে?’
‘একটা ডুপ্লিকেট চাবির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে তো মুশকিল।’
‘এই ব্যাপারে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন?’
‘চলুন দেখি কী করা যায়?’
একটু অপেক্ষা করুন গাড়িটা ঠিক হয়ে যাক, তা না হলে যাবেন কী করে? এমন মুশকিলে ফেলল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে।
‘আমি তো নার্সিংহোমেই যাচ্ছিলুম। ট্যাক্সি পেলুম না বলে যাওয়া হল না।’
‘ওখানে গিয়ে কোনও লাভ নেই। শুধু শুধু উত্যক্ত করা। এখন যা করার ডাক্তাররাই করবেন। ওর আত্মীয়স্বজনেরা এসে এখন লোক দেখানো উঁহুঁ, আহা করে পরিবেশটাকে এমন গ্রাম্য করে তুলেছেন, নিজের পরিচয় দিতে লজ্জা করে। আমি তাই চলে এলাম। ধৈর্যই হল সবচেয়ে বড় কথা।’
কথায় কথায় পশ্চিমের আলো দপ করে নিবে গেল। আকাশের নীচে ছায়া ছায়া অনেক মানুষ জলের কিনারা ঘেঁষে বসেছেন। সবুজ মাঠের এখানে-ওখানে ওই রকম সব ছায়া ছায়া জটলা। আমার সামনে এখন তিনটে সমস্যা। গাড়িটা ঠিক হবে। ঠিক হলে মিসেস চক্রবর্তীকে একটু হেল্প করতে হবে। তারপর সেই দুটো হারানো চাবির বিকল্প আর একটা চাবির ব্যবস্থা করতে হবে, তা না হলে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকা যাবে না। আর ঢুকতে না পারলে ভদ্রতার খাতিরে আমিও বাড়ি ফিরতে পারব না। এই সব ভাবার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হল। মনে হল কত যুগ যেন অপেক্ষা করে আছি। ইঁদুরের মতো কলে আটক হয়ে পড়েছি। কখন যে মুক্তি পাব কে জানে! পুরো ব্যাপারটার মধ্যে নিজের কোনও স্বার্থ যদি জড়িয়ে থাকত তা হলে হয়তো এতটা খারাপ লাগত না।
ঠিক এইসময় মিসেস চক্রবর্তী গাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় ডান পা রেখে নামতে চাইলেন। একটা সুডৌল পা বেরিয়ে পড়ল শাড়ির আড়াল থেকে। সিল্কের কাপড়ের আঁচল খসে পড়ল কোলে। একবার মাত্র তাকিয়ে দেখলুম। আর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, গাড়িতে পেছন ঠেকিয়ে অনির্দিষ্টকাল দাঁড়িয়ে থাকাটা বোধহয় তেমন কষ্টকর নয়।
সুন্দরী বউ
সুন্দরী বউ থাকার কী জ্বালা! আমি এখন হাড়ে হাড়ে বুঝেছি। আমার বউ প্রথমে এত সুন্দরী ছিল না। বিয়ের জল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কী যে তাঁর হল শরীরের চামড়া একেবারে টান টান! দম ফুলো বেলুনের মতো, গাল দুটো যেন লাল টম্যাটো। নাকটা যেন মার্বেল পাথর। চোখ দুটো ঝিনুক চেরা। মণিদুটো মরকত উজ্জ্বল। দাঁত যেন মালায় গাঁথা হাতির দাঁতের মানানসই টুকরো। আমার বউ আমারই চোখের সামনে দিনকে দিন কালিদাসের নায়িকা হয়ে উঠল। প্রথমটায় আমার গর্বে বুক দশ হাত হয়ে উঠল। এত গর্ব যে লোকজন, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। বিয়ের আগে আমার যত হাঁকডাক ছিল সব চলে গেল। বউয়ের পায়ে পায়ে ন্যাওটা হুলোর মতো ঘুরি। তার হাত দেখি, পা দেখি, ঘাড় দেখি, শরীরের খোলা অংশ দেখি। দেখে দেখে আমার আর সাধ মেটে না। কানে আসতে লাগল নানা উড়ো-ঝাপটা মন্তব্য—ব্যাটা বউয়ের ভেড়া হয়ে গেছে। পরে বুঝবে ঠ্যালা। অনেক রকম নেশার মধ্যে বউও তো একরকম নেশা। লোকে যেমন-তেমন বউয়ের জন্য উন্মাদ হয়ে যায়। বাপ-মাকে বিসর্জন দিয়ে বউ বগলে আলাদা বাড়িতে গিয়ে বাসা বাঁধে। শৈশবে বই বগলে পাঠশালে, যৌবনে বউ বগলে মধুচন্দ্রিমায় —এই তো নিয়ম বাবা। শত সমালোচনাতেও এই ধারা কি পালটেছে না পালটাবে! যাঁরা বলছেন তাঁরাও তো বয়সকালে এই একই ছক করে ফেঁসেছেন। আমি বাবা যুক্তিবাদী মানুষ। পৃথিবীতে একমাত্র সত্য ভালোবাসা। মেয়েদের ভালোবাসা। শাস্ত্র আরও বলেছে, পরস্ত্রীকে ভালোবেসো না। ওটা পাপ। বিয়ে করো, করে ভালোবাসো। উলটে-পালটে ভালোবাসো। সমস্যা হল, বউ জিনিসটাই এমন যার বউ সে ছাড়া আর কেউ ভালোবাসে না। ছেলের মা তো ছেলের বউকে দেখে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। ছেলের বাপের তো চুলচেরা হিসেব কত গেল, কত এল। সদাই প্রশ্ন, ছেলের বিয়ে দিয়ে ঠকে মরলুম না তো! আর একটু নিংড়োলে, বেয়াইমশাই নামক আখটি আরও একটু রস ছাড়তেন। এই দুশ্চিন্তায় তাঁর রাতের ঘুম চলে যায়। মেজাজ চড়ে যায় সপ্তমে। চড়া মেজাজে কি পরের মেয়েকে কাছে টানা যায়! তাছাড়া অন্যের উসকানি তো আছেই। যাক, ওসব ঘৃণার কথা থাক। প্রেমের জগতে পুরো ব্যাপারটাই হল নরম সরম। রসসিক্ত প্রেমে অহংকার একটা মস্ত বাধা। প্রেম চায় সমৰ্পণ। সে প্রেম ঈশ্বরেই হোক আর নারীতেই হোক। আমি আমার মতো ঠিকই রইলাম। কারওর কথায় কান দিলুম না। নিজেকে সংশোধন করারও চেষ্টা করলুম না। আমি আধুনিক। আমার স্ত্রী আধুনিকা। যুগ আধুনিক। আমি একটা লাল টুকটুকে মোটর বাইক কিনে ফেললুম। মাকে নার্সিংহোমে নিয়ে গিয়ে গলব্লাডার অপারেশন করার কথা ছিল। সেটা আপাতত বন্ধই রইল। আমি বাবা যুক্তিবাদী মানুষ। মায়ের বয়স সত্তর ধরি ধরি করছে, এই বয়সে কাঁচি-ছুরি আর কেন! এই পৃথিবীতে বেশিদিন বাঁচা মানে বেশি দুঃখ পাওয়া। সন্তানের কর্তব্য মায়ের দুঃখ বাড়ানো নয়, কমানো। অকারণে ডাক্তারদের বড়লোক না করে নিজের বড়লোক হওয়ার দিকে মন দিলুম। সুন্দরী বউ হলেই তো হবে না, তাকে তোয়াজে রাখতে হলে, সেইরকম ব্যবস্থা চাই। কেউ গোয়ালঘরে জামদানি শাড়ি পরে বসে থাকতে পারে না। তার জন্য উপযুক্ত ড্রইংরুম চাই। ভালো খানাপিনা চাই। দাস-দাসী চাই সেবার জন্য। ওই চাঁপার কলির মতো আঙুলে বাসন মাজলে, কাপড় কাচলে, ঘর মুছলে, আঙুলের কিছু থাকবে! এ তো আটপৌরে বউ নয় তোলা বউ। চেহারায় চটক কী! সুইমিং কস্টিউম পরিয়ে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিলেই বিশ্বসুন্দরীর মুকুট পরে বেরিয়ে আসবে। তবে আমি তা হতে দেব না। আমার বউ। আমারই সম্পত্তি। রাখব, ঢাকব, সাজাব, দেখব ইচ্ছেমতো। আর আমার নতুন বাইকের পেছনে চাপিয়ে সারা শহরে চক্কর খেয়ে আসব। যারা দেখবে তাদের বুকে একেবারে জ্বালা ধরে যাবে। বুকে বুকে গজাল পুঁতে যাব। দামি রেস্তোরাঁয় ঢুকব। আর বউ লাল ঠোঁটে আইসক্রিম চুষবে। আর কোণের টেবিলের ভদ্রলোকের ঠোঁট থেকে কাটলেটের টুকরো খুলে পড়ে যাবে। কী আনন্দে ভরপুর আমি! মেয়েটা সুন্দরী হলেও ভীতু। স্কুটারের পেছনে তুলতে বেশ বেগ পেতে হল। ভয়ে সিঁটকে সিঁটকে হনুমানের মতো আমার নেয়াপাতি উঁড়ি জাপটে ধরে রইল। ভোরের ময়দানে বিশবার চক্কর মারার পর একটু ধাতস্থ হল। এক গেলাস কফি মেরে দিলে তিন চুমুকে। তুমি শাড়ি না পরে জিনস আর কামিজ পরো না। ব্যাপারটা তাহলে পুরোপুরি জমে যাবে। খুব সুরেলা গলায় বললে, ধ্যাত। শাড়ির মতো সাজ হয়? শাড়িতেই বাঙালি মেয়ের রূপ খোলে। আমি বললুম, তাহলে এক আধটা সিগারেট খাওয়া অভ্যাস করো। চোখের অপূর্ব একটা ভঙ্গি করে বউ বললে, অসভ্য। কী ভালো যে লাগল! মনে হল হার্টফেল করব। ভোরের ময়দান। ঠ্যাং তুলে ট্রাম দৌড়োচ্ছে আলিপুরের দিকে। হোঁদল কুতকুতের মতো মোটাসোটা লোক মেদ কমাবার জন্য ছুটছে, মানে। আপ্রাণ চেষ্টা করছে ছোটার। বুক আর পেটের চর্বি ধেই ধেই নাচছে। বউয়ের অমন কথা বলার ভঙ্গি দেখে ভেতরে এমন প্রেম এল ভিক্টোরিয়াকে মনে হল তাজমহল। আমি এমন এক শাজাহান যার কোনও ঔরঙ্গজেব নেই। আমার মমতাজের গর্ভে অমন একটি হিরো এলেই হয়েছে আর কি! পিতার নাম ভুলিয়ে দেবে। থাকি ভাড়াবাড়িতে। তাজমহল তৈরি করতে না পারি বেশ সাজানো-গোছানো ফ্ল্যাট আমি একটা করবই। আমার মমতাজ সেখানে পিয়ানো বাজাবে। আমি কিমোনো পরে পাইপ খাব। বসে বসে দেখব বউয়ের হাত কাটা ব্লাউজ থেকে প্রকাশিত হাত, গলা, চিবুক, কানের ইয়ারিং চুলের ঢল।
