তিনটে নাগাদ অনিমেষ নার্সিংহোম থেকে ফিরে এল। ফিরে এসেই সোজা ডিরেক্টরের ঘরে ঢুকে গেল। কানাঘুষোয় শুনলুম, মনোরঞ্জনের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। সেরিব্রাল অ্যাটাক। ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন, বাঁচলেও একটা দিক হয়তো পঙ্গু হয়ে যাবে।
বিকেলের চা খেতে খেতে বিস্তারিত সব শুনলুম। কিন্তু ব্যাপারটা মনোরঞ্জনের এতই ব্যক্তিগত যে মনে সামান্য রেখাপাত করেই সরে গেল। আমি হঠাৎ নিউ মার্কেটের কথা ভাবতে শুরু করলুম। ছুটির পর কিছু কেনাকাটার জন্যে সুলেখাকে আসতে বলেছি। প্যারালিলিস বড় বিশ্রী ব্যাপার। ভয়ানক পরনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। চা খেলে হার্টের কিছু হয় না তো! বড়বাবু ফাইল সই করাতে এসেছিলেন, জিগ্যেস করলুম। বললেন, ‘না না, চায়ে স্যার ক্যাফিন আছে। হার্টের পক্ষে বরং ভালোই।’
কথাটা শুনে খুশি হয়ে সই করে দিলুম। অন্য সময় হলে ভদ্রলোককে একটু ন্যাজে খেলাতুম। নিজের পার্টিকে এত টাকার একটা কাজ দিয়েছেন! মেয়ের বিয়ে দেবেন সামনের মাসে। টাকার দরকার। মেয়েটি দেখতে-শুনতে বেশ ভালোই। একবার কী একটা ফাংশানে পরিচয় হয়েছিল। ভালো লেগেছিল। ফাইলটা সই করাবার সময় মেয়েটি তার সেই সিল্কের শাড়ি জড়ানো সুস্পষ্ট চেহারা নিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
চারটে নাগাদ পরেশ একটা অর্ডারের কপি নিয়ে ঘরে ঢুকল। অনিমেষ চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কাজ চালাবে—অর্ডারটা পড়ে মনোরঞ্জনের ওপর ভীষণ রাগ হল। কে বলেছিল তাকে। হঠাৎ অসুস্থ হতে! অফিস সেটআপের মধ্যে হঠাৎ হঠাই এই ধরনের পরিবর্তন এলে মনের। ব্যালেন্স ভেঙে পড়ে। এক ধরনের হিংসেতে মন পুড়ে যেতে থাকে। সে দিনের ছেলে অনিমেষ, একটা হামব্যাগ চরিত্রহীনই বলা চলে, কেরিয়ারের তেজি ঘোড়ায় চেপে কেমন টগবগ দৌড়াচ্ছে!
হঠাৎ মনে হল মনোরঞ্জনও একটা ঘোড়া। ওকে চাঙ্গা করে তোলাটাই যেন আমার একটা বাজি জেতা। তা না হলে রেসে একটা ঘোড়াই বাজিমাত করে বেরিয়ে যাবে। অনিমেষের সঙ্গে দৌড়োবার ক্ষমতা একমাত্র মনোরঞ্জনেরই ছিল। মনোরঞ্জনকে দেখতে যাওয়ার ভীষণ একটা তাগিদ ভেতর থেকে ঠেলতে লাগল। যে তাগিদ এই অর্ডারটা হাতে পাওয়ার আগে আমার ছিল না। নিজের চোখে দেখতে হবে, সে সারবে কি না! যেমন করেই হোক তাকে সারাতে হবে।
অনেকেই দেখলুম অনিমেষকে কনগ্রাচুলেশন জানাতে ছুটছে। কাপ কাপ কফি চলেছে। যেন একটা মহোৎসব কারওর সর্বনাশ কারওর পৌষ মাস। যতই হোক বড়কর্তা। খারাপ লাগলেও একবার যেতে হল। এর মধ্যেই বেশ চিফ চিফ ভাব এসে গেছে। একটু লাজুক লাজুক হাসি। এ তো সাময়িক পদোন্নতি ভাই। ঈশ্বর করুন, মনোরঞ্জন সুস্থ হয়ে এসে তার চেয়ার দখল করুক। কী যে বলেন? মনোরঞ্জন জন্মের মতো ফিনিশ। এ চেয়ার আপনারই পাকা হবে। অ্যান্ড ইউ। ডিজার্ভ ইট। এ চেয়ার সুটেবল ফর দি ম্যান। না না এ ম্যান সুটেবল ফর দি চেয়ার। কনগ্রাচুলেশন মিস্টার তরফদার। এক কাপ কফি মেরে নিজের ঘরে। ফোনে সুলেখাকে জানিয়ে দিলুম, একবার নার্সিংহোমে যাব। আজ তোমার মার্কেটিং থাক।
রাস্তায় নেমেই পশ্চিম আকাশে চোখ পড়ল। বেশ সমারোহ করে সূর্য ডুবতে বসেছে। বিদায়ের সময়েও কত তোমার ঘটা! একটা ট্যাক্সি ছাড়া নার্সিংহোমে যাওয়া যাবে না। অন্য কোনও যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। একটা-দুটো ট্যাক্সি যাচ্ছে। সব ভর্তি। একটা ফাঁকা ছিল। মিটার-ফ্ল্যাগ লাগানো। কিছুতেই থামল না। আধঘণ্টা নাচানাচি করে, মনোরঞ্জনকে দেখতে যাওয়ার উৎসাহে ভাটা পড়ল। মনোরঞ্জনের চেয়ারে অনিমেষকে তেমন বেমানান লাগল না। চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়েছে হোক। আমার কী? আমি তো আর হতুম না। চেষ্টা করলেও হত না। আমার সে যোগ্যতা নেই।
হাঁটতে হাঁটতে স্ট্র্যান্ড রোডে ধরে, গঙ্গাকে বাঁয়ে রেখে ফোর্টের দিকে যেতে যেতে ছেলেবেলার কথা মনে পড়ছে! জীবন তখন কত সবুজ ছিল! চোখ কত নীল ছিল! সেই জীবনটাকে যদি আবার ফিরে পেতুম! এখন যেন একটা বখাটে ছেলের হাত ধরে বেড়াতে বেরিয়েছি! অপবিত্র একটা কিছুকে যেন বাহারি মোড়কে মুড়েছি।
এদিকে আমার উদ্দেশ্যই ছিল একটা বেঞ্চিতে দু-দণ্ড বসে মনটাকে একটু জুড়িয়ে নেব। বড় জ্বলছে। আমার নিজের স্বপ্ন সব অন্যের জীবনে পূর্ণ হচ্ছে। মনোরঞ্জন বন্ধু ছিল। মাঝেমধ্যে। আবদার করলে একটু-আধটু সুযোগ-সুবিধে দিত। আমার খোঁটে নড়ে গেল। এখন অনিমেষের যারা পেটোয়া, তাদেরই বোলবোলা চলবে। এই হয়। কিং ইজ ডেড, লং লিভ দি কিং।
ওয়াটার গেটের কাছাকাছি এসে দেখলুম একটা ক্রিমরঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। ববচুল। পেছন থেকে দেখলেও চেনা চেনা মনে হল। গাড়িটার দিকে আর একটু এগোলুম। ফিগার এবার স্পষ্ট হল। একটু অবাকই হলুম। মনোরঞ্জনের স্ত্রীকে এখন এখানে দেখব, স্বপ্নেও ভাবিনি! দু-একবার পার্টিতে দেখেছি। চিনতে ভুল হয়নি। কাছে এগিয়ে গেলুম। মিসেস চক্রবর্তী আপনি?
ভদ্রমহিলা প্রথমে এমনভাবে তাকালেন, যেন দেখেও দেখছেন না। পরে চিনতে পারলেন। তখন আমি বললুম, ‘শুনেছেন তো, মনোরঞ্জন?’
‘হাঁ, দেখেও এলুম।’
‘এখানে একা একা মন খারাপ করে কী করবেন? মানুষের তো কোনও হাত নেই।’
‘না না, মন খারাপের কী আছে? অসুখ-বিসুখ তো মানুষকে তাড়া করবেই। পৃথিবীতে বাঁচা মানেই সব রকমের সম্ভাবনার জন্যে প্রস্তুত থাকা।’
