স্ট্রেচার এসে গেল।
সাদা ধবধবে। তার মানে অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে অফিসের সামনে। ঘষা কাচের দরজাটা একজন দু-হাতে ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইল। স্ট্রেচার ঢুকবে, বেরোবে। মনোরঞ্জন শুয়ে আছে স্ট্রেচারে। ঘাড়টা একদিকে কাত হয়ে আছে। হাত দুটো দেহের দু-পাশে ছড়ানো। অনেক আগে আমি যখন যোগাসন করতুম তখন এইভাবে শবাসনে শব হতুম। স্ট্রেচারের পেছনে পেছনে। অনিমেষ ও আরও কয়েকজন এগিয়ে চলল। বোধহয় নার্সিংহোম পর্যন্ত যাবে। ওদের মধ্যে একজনকে আমি জানি যার কাছে মনোরঞ্জন অনেক টাকা পাবে। মেয়ের বিয়ের সময় ধার করেছিল দু-তিন বছর আগে।
সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
একেবারে শেষ করে, টুকরোটা টুসকি মেরে চারতলা থেকে নীচের রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে নীচে নামব। মনোরঞ্জনের ব্যাপারে আপাতত আমার আর কোনও ভূমিকা নেই। অনেক উপকারী জুটে গেছে। ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং সময় নষ্ট না করে হাতের কাজ সেরে ফেলাই ভালো। মনোরঞ্জন অর নো মনোরঞ্জন ডেসপ্যাঁচ ডকুমেন্টগুলো আজই সব তৈরি করে ফেলতে হবে নয়তো কাল আর মাল শিপিং হবে না। কোম্পানির ক্ষতি হবে। বড়কর্তা কৈফিয়ত চাইবেন। ইনএফিসিয়েন্সির কোনও ক্ষমা নেই। বছরের শেষে ইনক্রিমেন্ট কমে গেলে কার ক্ষতি হবে! কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পা চলতে শুরু করল।
প্রায় দেড়টা বাজতে চলল।
তার মানে লাঞ্চব্রেক। লাঞ্চের আগে আর কাজে হাত দিয়ে লাভ নেই। মনোরঞ্জনের অসহায়। চেহারাটা চোখের সামনে ভাসছে। ঘাড়টা একদিকে কাত হয়ে নড়নড় নড়ছে, ঠোঁট দুটো ফাঁক। সারা মুখে কে যেন আলকাতরা মাখিয়ে দিয়েছে। হার্ট সম্বন্ধে বেশশিয়ার হবে। বলা যায় না, কখন কী হয়? বেশিদুশ্চিন্তা করা চলবে না। খাওয়াদাওয়ায় ফ্যাটের অংশ কমাতে হবে। আরও বেশি কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। কোনওটাই খুব শক্ত নয়। তবু মানছে কে?
অমল এসে সামনে দাঁড়াল।
‘কী দাদা চলুন? লাঞ্চে যাই। কী ভাবছেন অত?’
‘চলো যাই। না, তেমন কিছু ভাবছি না। হার্টের অসুখ খুব হচ্ছে। ছেলে-বুড়ো কাউকেই বাদ দিচ্ছে না।’
চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালুম। ক্যান্টিন ফার্স্ট ফ্লোরে।
‘চক্রবর্তী সাহেব আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। সেই কারণেই আপনাকে বোধহয় এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে।’
লিফটে নামতে নামতে অমল এই একটা কথাই বলতে পারল। মনোরঞ্জন আমার বন্ধু ছিল ঠিকই, তবে সে অনেক আগে ছাত্রজীবনে। বড়লোকের ছেলে। ছাত্রদের তো কোনও জাত থাকে। না, তাই তখন মেলামেশায় কোনও বাধা ছিল না। চাকরি জীবনে সে আরও দু-তিন ধাপ উঁচুতে, প্রায় ডিরেকটরদের কাছাকাছি। অফিসে আমরা একটু দূরত্ব বজায় রেখেই চলতুম; কারণ সেইটাই ছিল শোভনীয়।
ক্যান্টিনে লাঞ্চের সময় সকলকেই প্রায় পাওয়া যায়। রথী-মহারথী থেকে চুনোপুঁটি সবাই। কাঁটা চামচ, ছুরি প্লেটে নাচতে থাকে। টেবিলের কানায় রংবেরঙের টাই দুলছে। হাতে হাতে পাট করা রুমাল মাঝে মাঝে আলতো আলগোছে ঠোঁট থেকে লালা কিংবা সসের উদ্ধৃত অংশ মুছে নিচ্ছে। ইংরেজি আর বাংলার ফুটফাট খই ফুটছে।
ওই কোণে জানলার ধারে, জোড়া টেবিলে মনোরঞ্জনের স্টেনো হেসে হেসে সান্যালের সঙ্গে খুব গল্প করছেন। ভদ্রমহিলা আজকাল সান্যালের সঙ্গে খুবই যেন মাখো মাখো হয়ে উঠেছেন। অফিসে এই একটা গুরুতর ঘটনা ঘটে গেল, আজকের দিনটা অন্তত হাসাহাসি না করলেই ভালো হত। যতই হোক মনোরঞ্জন ছিল ‘ইমিডিয়েট বস’। জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে একটা মানুষের টানাপোড়েন চলছে আর ওরা সামনে মুরগির ঠ্যাং রেখে রঙ্গ-রসিকতা করছে! মানুষ সত্যি। অত্যাশ্চর্য জীব! সমাজে বাস করতে হলে অনেক সময় একটু-আধটু মুখোশ পরে চলতে হয়।
হাসাহাসি করতে করতে এক সময় আমার দিকে চোখ পড়তেই একটু যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন। হঠাৎ দেখি চেয়ার ছেড়ে আমার দিকেই এগিয়ে আসছেন। কী হল আবার? দেবী কি আমায় ভর করবেন! মনে হচ্ছে সেই রকমই। আগে আগে ভেসে আসছে বেশ দামি সেন্টের গন্ধ। সামনের চেয়ারে বসে মিস ঘোষ বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা জানাতে এলুম।’
‘বলুন কী কথা?’
সকাল থেকে দেখলাম অনেককেই খবর দেওয়ার চেষ্টা হল; কিন্তু ওঁর বাবাকে একবার খবর দিলে হত না? বৃদ্ধ মানুষ, আর ওই একমাত্র ছেলে!’
কিন্তু, আমি যতদূর জানি, দুজনেরই দীর্ঘ দিনের ছাড়াছাড়ি। কী একটা ব্যাপারে পিতাপুত্রে বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। সে ক্ষেত্রে…’ ‘তাতে কী হয়েছে? ছেলের অসুস্থতার খবর বাবাকে জানাতে হবে না?
‘এ সব বিলিতি প্রতিষ্ঠান। বউ ছাড়া আমাদের আর কেউ থাকতে পারেন, তা এঁরা মনে করেন
না।’
‘প্রতিষ্ঠান যা-ই মনে করুক, আপনারা কী মনে করেন?’
‘এখানে আমার একলার মত খাটানো উচিত হবে কি?
‘দেখুন আমার যা মনে হল আপনাকে জানালাম। বন্ধু হিসেবে আপনার যদি কিছু করার থাকে। করবেন।’
মিস ঘোষ যেন একটু রেগেই চলে গেলেন। ভদ্রমহিলার চেহারায় বেশ একটা বাঁধুনি আছে। স্পিরিটেড, তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। হাসলেও ব্যাপারটা নিয়ে মনে মনে ভাবনা চলেছে।
বিয়ের পরই মনোরঞ্জন বাড়িছাড়া। পদ্মপুকুরের অত বড় বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে কোম্পানির। দেওয়া কোয়ার্টারেই থাকে। ব্যাপারটা ভাবতেও কেমন লাগে; কিন্তু এইটা তো জীবনের সত্য, যেমন সত্য মনোরঞ্জনের হঠাৎ অসুস্থ হওয়া। থাক গে। কে এখন মনোরঞ্জনের বাবাকে খবর। দেবে!
