মহামায়া ধীরে ধীরে স্বামীকে খাটে শুইয়ে দিলেন। কাঁদো-কাঁদো স্বরে বললেন, ইস ডান গালটার কী অবস্থা করেছে!
প্রকাশবাবু বললেন, আমি একটু জল খাব।
শর্মিলা দরজার কাছে। মহামায়া বললেন, বউমা এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও। ফুল স্পিডে। পাখা ঘুরছে। সত্যেনবাবু একপাশে বসে স্বামী-স্ত্রী-র অপূর্ব লীলা দেখছেন। শর্মিলা ফ্রিজ খুলে জলের বোতল বের করে ভাবতে লাগল, শুধু জলে তো অনশন ভঙ্গ হয় না। ফলের রস দিতে হয়। এক বোতল আঙুরের রস আছে। গোটা চারেক মুসুম্বি আছে। প্রশান্ত একটা ক্রাশার কাম মিক্সার কিনে এনেছে কাল। আজই তার উদ্বোধন হোক। মিক্সার চলছে ঘির ঘির করে। মুসুম্বির নরম শরীর ঘেঁতো হচ্ছে। দলা পাকাচ্ছে। রস বেরোচ্ছে। শর্মিলার হঠাৎ মনে হল—এরই নাম সংসার। যত চটকাবে তত রস বেরোবে। সব যেন ঘানির সরষে। পেষাই না হলে তেল বেরোয় না।
সুখ-অসুখ
মনোরঞ্জন নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরেশই আমাকে খবরটা দিল। কী একটা কাজে সে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিল। ফাইল সই করাতে, নাকি বিল পাস করাতে। গিয়ে দেখে এসেছে চক্রবর্তী সাহেব চেয়ারে এলিয়ে পড়ে আছেন। গলার টাই আলগা করে দেওয়া হয়েছে। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। তা-ও গলগল করে ঘামছেন। সকলেই বলাবলি করছে, হার্ট।
মনোরঞ্জন আমার বন্ধু। একসঙ্গেই অফিসের গাড়িতে একটু আগে অফিসে এসেছি দুজনে। আসার সময়ে তাকে খারাপ দেখিনি। রোজকার মতোই হাসছিল, গল্প করছিল। হঠাৎ কী হল, কে জানে? আমার ডিপার্টমেন্ট তিনতলায়, মনোরঞ্জনের চারতলায়। মনোরঞ্জন আমাদের কোম্পানির চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বিলেত থেকে সি এ করে এসেছে। স্বাস্থ্যও বেশ ভালো।
তাড়াতাড়ি গেলুম চারতলায় তার ঘরে। ঘষা কাচের দরজার বাইরে ছোটখাটো একটা জটলা তৈরি হয়েছে। ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য সবাই খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন। সাহেব অসুস্থ। একটা কিছু করা দরকার। দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লুম। ঘরও খালি নেই। দু-চারজন সিনিয়র অফিসার খবর শুনেই ছুটে এসেছেন। একজন দেখলুম প্রাণপণে টেলিফোন করার চেষ্টা করছেন। কোথায় করতে চাইছেন বোঝা গেল না।
মনোরঞ্জন বিন বিন করে ঘামছে। ওর ঘরে কুলার লাগানো ছিল। কে যেন বলেছিল কুলার শরীরের পক্ষে খারাপ। মনোরঞ্জন সেই কথা শুনে পরের দিনই কুলারটা খুলিয়ে পাখার ব্যবস্থা করেছিল। মনোরঞ্জনের চোখ আধখোলা। মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল, বেশ কষ্ট হচ্ছে। হয় শ্বাস নিতে, না হয় শ্বাস ছাড়তে। সারা মুখটা কেমন কালচে হয়ে উঠেছে। কোম্পানির ডাক্তার এসে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখে বললেন, ‘অবিলম্বে নার্সিংহোমে ট্রান্সফার করুন। আমার খুব ভালো মনে হচ্ছে না।’
আমি মনোরঞ্জনের মুখের কাছাকাছি এসে জিগ্যেস করলুম, ‘শরীরটা খুব খারাপ লাগছে নাকি তোমার?’
এ প্রশ্ন করার অবশ্য কোনও মানে হয় না। প্রশ্নের জন্যেই প্রশ্ন। চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি, লোকটা ক্রমশই এলিয়ে পড়ছে। ডাক্তার একটু মৃদু ধমক দিলেন, ‘কেন অনর্থক ভিড় করছেন আপনারা? এঁকে এখুনি নার্সিংহোমে রিমুভ করুন আপনারা।’
এতক্ষণ যে ভদ্রলোক টেলিফোনে কসরত করছিলেন, তিনি ফোন নামিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘না! ওঁর স্ত্রীকে পাওয়া গেল না। স্কুলে নেই। কোথায় যেন বেরিয়েছেন। আমি মেসেজ রেখে দিয়েছি। এলেই পেয়ে যাবেন।’ হঠাৎ আমার মনে হল, মনোরঞ্জন যদিও আমার বন্ধু, আমার কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তার জন্যে কিছুই করার নেই। প্রথমত, ঘরে ভিড় না করাই ভালো। দ্বিতীয়ত, কেউ না কেউ তাকে স্ট্রেচারে চাপিয়ে, অ্যাম্বুলেন্সে করে, কোম্পানির বিরাট নার্সিংহোমে নিয়ে যাবে। তারপর সেখানে যমে-মানুষে খেলা চলবে? এমনকি এই মুহূর্তে মনোরঞ্জনেরও কিছু করার নেই। ওই চেয়ারে শরীরটাকে এলিয়ে রাখা ছাড়া ওর পক্ষে আর। কিছুই করা সম্ভব নয়। এমনও হতে পারে, চেয়ারে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সোজা ওই নোংরা কার্পেটেই নেমে আসবে! দামি সুটফুটের মায়া ছেড়ে। অথচ আমি জানি ওর মতো শৌখিন খুঁতখুঁতে লোক পৃথিবীতে খুব কমই আছে।
বহুক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খাওয়া যায়। মনোরঞ্জন অসুস্থ বলে পৃথিবীর সব কাজ তো আর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। এই তো এত বড় অফিস, মনোরঞ্জনের পজিশনও তো কিছু কম নয়, চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট বলে কথা। অফিসের সকলেরই টিকি বাঁধা তার কাছে। কিন্তু ক-জন সহকর্মী এসেছেন এই ভীষণ মুহূর্তে? মনোরঞ্জনের দেহের ওপর এই যে জীবন-মৃত্যুর খেলা চলেছে, তাতে কার কী এসে যাচ্ছে? তার বউই বাকী করছে এই মুহূর্তে? কে বলতে পারে? বিলেতফেরত আধুনিক মেয়ে। ববছাঁট চুল। একটা। কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালায়। সাহেবপাড়ায়। কোথায় কোন রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে আছে পার্ক। স্ট্রিটে। সঙ্গে কে আছে তা-ই বা কে জানে! এদিকে স্বামী যায় যায়। অনিমেষ ফোন করছিল। ভদ্রমহিলাকে দুংসংবাদ দেওয়ার জন্যে। অনিমেষের চালচলন কি খুব একটা স্বাভাবিক ছিল? ছিল না। যেন একটু বেশিমাত্রায় গম্ভীর। একটু লোক দেখানোর ভাব ছিল। আসলে মনোরঞ্জন যদি মারা যায়, এই অফিসে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অনিমেষ। চট করে দু-বছরের মধ্যে চিফ অ্যাকাউন্ট্যান্ট হয়ে বসবে। মনোরঞ্জনের বয়েস এমন কিছু বেশিনয়। চাকরিও খুব বেশি দিনের নয়। একেবারেই টপে এসে বসেছে। সাধারণভাবে রিটায়ার করতে, কি ফিনানসিয়াল। কন্ট্রোলারের পোস্টে প্রোমোশন পেতে বেশ সময় লাগত। ততদিন অনিমেষকে হা-পিত্যেশ করে করে বসে থাকতে হত। স্কুটারের পেছনে ইয়া স্বাস্থ্য, সেই পাঞ্জাবি বউকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে যেত। এখন গাড়ি কিনবে। স্ট্যাটাস আরও বাড়বে। বউকে আরও সুখে রাখতে পারবে। চেহারার জলুস আরও খুলবে। ত্বক আরও টানটান হবে। নিঝঞ্চাটে বংশবৃদ্ধি করবে। অর্থাৎ একজনের মৃত্যু আর একজনের অসীম সুখের কারণ হবে।
