মেজোমামার এক পাটি চটি কুকুরে চিবিয়ে শেষ করে দিয়েছে। দেখছেন আর বলছেন, বিঅন্ড রিপেয়ার। তিনি ছানা কিনতে যাবেন। কী পরে যাবেন? পায়ের মাপ নয়। এ বাড়িতে ননম্বর মাপের পা নেই। খালি পায়ে তো আর যাওয়া যায় না। এ বাড়ির পোষা কুকুর নয়, হিন্দি সিনেমার গেস্ট আর্টিস্টের মতো গেস্ট কুকুর। কে কবে দয়া করে খেতে দিয়েছিল, সেই থেকে আর নড়ে না। জুতোর রসে নেশা হয়ে গেছে। পড়ে আছে একপাশে। কে একজন বেধড়ক পিটিয়ে দিলে। কুকুরটা কেঁদে মরছে।
ইলেকট্রিক মিস্ত্রি অনবরত প্রশ্ন করে চলেছে, কটা পয়েন্ট হবে বলে দিন, আমি কাজটা ফিনিস করে ফেলি।
ওদিকে তুমুল গবেষণা, জেনারেটারের ব্যবস্থা করা হবে কি হবে না। গত এক মাস পাওয়ার পজিশান ভেরি গুড। অমল ভেবেছিল, নির্জনে শূন্য ঘরে চুপচাপ বসে থাকবে কিছুক্ষণ। বসে। বসে ভাববে অতীতের কথা। পছন্দমতো এক-একটি ঘটনা তুলে এনে জীবন্ত করে সাজাবে! উপায় নেই। কাছাকাছি গোটা দুই নিমন্ত্রণ এখনও বাকি। নীপা চিৎকার করছে, কে গ্যাস জ্বেলে নেভাবার পর গ্যাসের মুণ্ডি বন্ধ করেনি। সোমা চিৎকার করছে, বিছানার চাদরে চিনি ফেলেছে কে। লাইন দিয়ে লাল পিপড়ে এসেছে।
দেখতে দেখতে সন্ধে হয়ে গেল। শীতের ধোঁয়ায় চারপাশ ঝাপসা। আলো জ্বলছে সব পিত্তি রঙের। পৃথিবীর যেন ন্যাবা হয়েছে। একে একে হালুইকরের লোক আসছে। বড় বড় কড়া উঠছে ছাদে। শেষ মুহূর্তে ধরা পড়েছে নকুলদানা আনা হয়নি। নীপা হেড হালুইকরকে বলছে, তিনি পান্তুয়া ভীষণ ভালোবাসতেন। ইয়া বড় বড় সাইজের করবেন, বেশ কড়া করে ভাজা, লাল লাল।
কোনও কিছুতেই তাঁর তেমন আসক্তি ছিল না। আসলে পান্তুয়া ভালোবাসে নীপা। আর যা নিজস্ব ভালোবাসার বস্তু, সবই এখন তাঁর নামে চালানোর চেষ্টা হচ্ছে। মেনু ক্রমশই লম্বা হচ্ছে। ছেলের ভালোবাসা কড়াইশুটির কচুরি, মেয়ের আঁচড়ের কোফতা, নিজের ঘুগনি আর আলু বোখরার চাটনি।
অধ্যাপক প্রকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় এলেন। ভীষণ গম্ভীর মুখ। অমলকে একপাশে নিয়ে গিয়ে মৃদু গলায় বললেন, পাঁজি দেখলাম। রাত নটা পনেরো মিনিট গতে যে কোনও মৃত্যুই সাংঘাতিক দোষযুক্ত।
অমল বললে, জানি, ত্রিপাদ দোষ।
অধ্যাপক শিউরে উঠলেন।
অমল জিগ্যেস করলে, ত্রিপাদ দোষে কী হয়?
কী না হয়? একটা জনপদ সম্পূর্ণ বৃক্ষশূন্য হয়ে যেতে পারে। শোনো, খুব সাবধান। যত। তাড়াতাড়ি পারো দোষ খণ্ডন করিয়ে নাও। তোমাকে ভালোবাসি তাই ছুটে এসেছি। তোমাদের পুরোহিত কে?
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী।
পণ্ডিত মানুষ। তুমি কালই কথা বোলো তাঁর সঙ্গে।
অধ্যাপক বসলেন না। ভীষণ ব্যস্ত মানুষ। তেজস্বী ব্রাহ্মণ। উঠে চলে গেলেন।
নানা বর্ণের, নানা গন্ধের এক ঝাঁক ফুল আর মালা নিয়ে ঢুকলেন যুগলবাবু। আজ রাতেই ফুলের কাজ মোটামুটি শেষ করে যাবেন। প্রথমে সাজাবেন ঘর আর খাট। যে খাটে পরলোকগত মানুষটি জীবনের শেষ তিনটি মাস আসন করে বসেছিলেন মহাযোগীর মতো। মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলেছিলেন বসে বসে। মৃত্যুর চাল আটকে রেখেছিলেন তিন মাস। গ্র্যান্ড মাস্টারের খেলা।
কিস্তিমাতের চালটি পড়ল সোমবার রাত নটা আটান্ন মিনিটে। দীর্ঘ দাবার লড়াই এক চালে শেষ হয়ে গেল। দর্শকরা নীরব, হতবাক। অপরাজেয় খেতাব নিয়ে উঠে গেল মৃত্যু। পড়ে রইল শূন্য ছক। এ ছক বন্ধ হবে না। জীবনের সাদা-কালো খুঁটি সাজানোই রইল। যে কোনও দিন আবার শুরু হবে খেলা। চলবে দিনের পর দিন। নির্ভর করছে প্রতিদ্বন্দ্বীর খেলার ওপর। ওপাশের ঘরে কে টিভি খুলে বসে আছে। নাচের অনুষ্ঠান চলছে। বোল আর ঘুঙুরের শব্দ ভেসে আসছে।
যার যৌবন আছে, সে তো নাচবেই। যার তৃষ্ণা আছে, সে তো দেখবেই। নীপা ঘরে এসে ঢুকল। মুখে কী একটা পুরে এসেছে। ভুর ভুর গন্ধ বেরোচ্ছে।
ভারি মুখে বললে, বুঝলে পাক্কা দশদিন পরে পান-জর্দা খেলুম।
তুমি ওঁর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলে পান-জর্দা খাবে না। পারলে না রাখতে!
দাঁড়াও দাঁড়াও, নেশা তো একবারে ছাড়া যায় না। ধীরে ধীরে একটু একটু করে হবে।
অমল উঠে পড়ল। বসতে, শুতে, পড়তে, ঘুমোতে, কথা বলতে কোনওকিছুই ভালো লাগছে না। হয়তো বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, হয়তো সবই আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে, আবার সিনেমা। দেখবে, তারিয়ে তারিয়ে রসের বই পড়বে, রসের কথা বলবে। জীবনের পেছনে ছুটবে প্রেতের মতো ফ্যা ফ্যা করে। তবু যে সত্য লাভ হয়েছে, সেইটাকে যতদিন ধরে রাখা যায়। সব ফেলে। চলে যাওয়াটাই সত্য, সব ধরে বাঁচাটা বড় সাময়িক। কাঁদতে কাঁদতে আসা, খুঁতখুঁত করতে করতে বাঁচা আর অতৃপ্তি নিয়ে মরা। মাত্র তিনটে খাবি খাওয়া, সব শেষ। শ্মশান চিতায় বরফ শীতল দেহ। এক টুকরো কাপড় নিম্নাঙ্গে। মাথার তলায় কাঠের বালিশ। সেই বরফ শীতল শরীরে ভেজাল গব্যঘৃত মাখাবে। দূষিত গঙ্গাজল ঢালবে খাঁটি সংস্কৃত মন্ত্র পড়তে পড়তে। তারপর এক পাঁজা প্যাঁকাঠিতে আগুন ধরিয়ে গোল হয়ে প্রদক্ষিণ করবে। শেষে মাথায় ঠেকিয়েই গুঁজে দেবে হাঁটুর তলায়। বিশুদ্ধ সংস্কৃতে বলবে, জানা অজানা অনেক দুষ্কর কর্মের নায়ক তুমি। তোমার সর্বাঙ্গে আগুন দিলাম; পুড়ে ছাই হও। আর পারো তো চলে যাও দিব্যলোকে। ব্যস, মিটে গেল ঝামেলা। তারপর, বাস চলছে, পরচর্চা-পরনিন্দা হচ্ছে, মাংস কষা হচ্ছে, চিনের। দোকানে ফ্রায়েড রাইস উড়ছে। কোথায় কী! এ তো আর গয়না রাখার ভেলভেট বাক্স নয়, যে লকেটটি তুলে নিলেও খোপটি থেকে যাবে চিরকাল। জীবনের বাক্সে ফুটকড়াই গড়াচ্ছে। কে গেল আর কে রইল। গড়াগড়ির শেষ নেই।
