প্যান্ডেলের ঘেরাটোপের একপাশে গনগনে আগুনে ভিয়েন হচ্ছে। বিশাল কড়ায় চিনির রস। মিঠে গন্ধ বেরোচ্ছে। শৈশবের সুখের দিনের গন্ধ। বেঁচে থাকার গন্ধ। টুকটুকে লাল, অভাবনীয় অজস্র পান্তুয়া হাবুডুবু খাচ্ছে। হেড হালুইকর বিচিত্র বললে, একটা টেস্ট করে দেখুন না বাবু!
অমল বললে, আমি কোনও কিছুই খেতে পারব না ভাই, যতদিন না নিয়মভঙ্গ হচ্ছে।
ও হ্যাঁ, তাই তো। আমি ভুলেই গিয়েছিলুম, শেষ আপনার ছেলের পইতেতে কাজ করে গিয়েছিলুম। বড়বাবু ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দেখো বিচিত্র, তোমার আর আমার প্রেসটিজ যেন থাকে। কী মানুষ ছিলেন।
অমল বললে, আমার কাজের সময় হয়তো এইখানে এসে দাঁড়াবে আমার ছেলে!
আপনার কী কাজ বাবু?
শ্রাদ্ধ।
আপনার শ্রাদ্ধ! তার আগে আমার শ্রাদ্ধ হয়ে যাবে। ষাট পেরিয়ে গেছি। আপনার বিয়েতে বেঁধে গেছি। সে খুব বড় কাজ হয়েছিল। দশ-বারোরকম আইটেম হয়েছিল। ঠিক এই শীতকাল।
আর কথা বলার সময় নেই। বিচিত্র দরবেশ ভাজতে বসল। দূরে কুকুর ডাকছে। একটা বোমা ফাটার শব্দ হল। কেউ হারল, কেউ জিতল।
নীপা এসে হাত ধরে অমলকে নীচে নিয়ে গেল। কেউ তাকে একলা থাকতে দিচ্ছে না। ভয় পাচ্ছে। এত যার শোক সে হয়তো কিছু একটা করেই ফেলবে বোকার মতো।
সিঁড়ির মুখে নির্জনে দাঁড়িয়ে নীপা বললে, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছেনা! তোমার কাজ, তুমি একটু ঘুরে-ফিরে দেখবে না! দেখবে চলো, দানের জিনিস কেমন সাজানো হয়েছে। ঘর কেমন সাজানো হয়েছে। বাইরের গেটটা কেমন হল!
অমল বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে গেট কেমন হয়েছে দেখছে, হঠাৎ পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল, আপাদমস্তক চাদর মুড়ি দিয়ে খুটখুট করে কে যেন আসছে। প্রবীণ মানুষ। চলনে অতি মাত্রায় সতর্ক। ভদ্রলোক অমলের পাশে এসে দাঁড়ালেন। অমল চিনতে পারল, শ্যামলবাবু।
কাকাবাবু এত রাতে এই ঠান্ডায়?
শ্যামলবাবু ধরা ধরা গলায় বললেন, সব ঠিক মতো হচ্ছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমি ওই হোমিওপ্যাথি ডাক্তারখানায় ওষুধ নেবার জন্যে বসেছিলুম। ফেরার পথে ভাবলুম, তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে যাই। একটা প্রশ্ন করব বাবা?
ভেতরে চলুন না।
না না, অনেক রাত হয়েছে বাবা। ছোট প্রশ্ন। তুমি তো ধাপে ধাপে একটা মৃত্যু দেখলে। শেষটা কি খুব কষ্টের?
কী করে বলি, আমি ঠিক বুঝতে পারলুম না কাকাবাবু।
শেষটা কীভাবে হল?
স্বর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বলে আগের দিন থেকে অক্সিজেন চলছিল।
সব চিনতে পারছিলেন?
হ্যাঁ হ্যাঁ, পরিপূর্ণ জ্ঞান ছিল। কাশির সঙ্গে রক্ত আসছিল বলে, সাকশান মেশিন দিয়ে সাফ করে নেওয়া হচ্ছিল থেকে থেকে। মাঝে মাঝে টিউবটা দাঁতে চেপে ধরছিলেন। মুখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি।
তাই নাকি?
মৃত্যুর সঙ্গে খেলাই বলা চলে। আধশোয়া হয়েছিলেন। হঠাৎ সাড়ে নটার সময় উঠে বসলেন। পরিষ্কার ঝরঝরে গলায় প্রশ্ন করলেন, কটা বাজল, কী বার, কী তিথি? আমরা ক্যালেন্ডার দেখে বললুম। এদিক-ওদিক তাকালেন। সকলকে দেখে নিলেন একবার ভালো করে। তারপর বললেন, নাঃ, আর ভালো লাগছে না, এইবার চলে যাই। ঠিক মিনিট পনেরো কুড়ি পরে একবার কাশলেন। প্রচুর রক্ত। ঠাকুরের ছবির দিকে দুহাত তুলে বললেন, মা নাও। সঙ্গে সঙ্গে কাশি। ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লেন। তিনবার হেঁচকি। সব শেষ।
বাঃ-বাঃ, এত সহজ। না আতঙ্ক, না কান্না, না চোখের জল। নৌকোর দড়ির তিনটি গেঁট খুলে গেল। বাঃ চমৎকার। শেষ কথা তাহলে কী?
ওই যে অঞ্জলি, মা নাও।
আহা, যার জীবন তাকেই উৎসর্গ। লহোলহ। আচ্ছা, আমি আসি বাবা।
শ্যামলবাবু টুকটুক করে চলে গেলেন। সেই দিনের মানুষ নন, রাতে একেবারে অন্যরকম। সামান্য সামনে ঝুঁকে চলেছেন। আপনমনে। দিন শেষের বলদের মতো।
মাঝ রাতে অমলের ঘুম ভেঙে গেল। পাশেই কে যেন ফোঁস ফোঁস করে কাঁদছে। নিস্তব্ধ বাড়ি। শূন্য ঘর। মেঝেতে কম্বলের বিছানা। শুয়েছিল সে আর নীপা। ঘরে নীল আলো। শোবার আগে ধূপ জ্বেলেছিল। গন্ধে ভরাট। পাশেই ফুলে সাজানো খাট। তার ওপর একটি পূর্ণ আকৃতির ছবি। বসে আছেন তিনি, যিনি আর নেই। মুখে অদ্ভুত হাসি। অদ্ভুত দুটি বৈরাগী চোখ। নীপা ছবির দিকে তাকিয়ে বসে আছে। কখন উঠে পড়েছে। আপন মনে কেঁদে চলেছে। গঙ্গাধারার চেয়ে পবিত্র। অমল হাত রাখল পিঠে। প্রশ্ন নেই।
কী বলেছিলেন তিনি?
বলেছিলেন, আর কয়েকটা বছর সময় পেলে, তোমাকে ইউনিভার্সিটির চৌকাঠ পার করে দিতুম। বলেছিলেন, সোমার বিয়েটা নিজে হাতে দেখে-শুনে দিতুম।
আর বলেছিলেন, তোমাদের মনের ভেলভেট খোপে মুক্তোর দানার মতো একটু সুখ রেখো। ভালোবাসার নামই সুখ। নীল আলোর সমুদ্রে ফুলে ঢাকা জীবননৌকো ভাসছে। পারে বসে দুই যাত্রী। একজন স্বামী, একজন স্ত্রী। পুত্র আর পুত্রবধূ।
যাই ওঘর থেকে মায়ের ছবিটা এনে পাশে বসিয়ে দিই। বড় একলা পড়ে গেছেন। তাই না! নীপা উঠে গেল পাশ থেকে। কম্বলের বিছানায় অমল একা। সামনে ছবির চোখে উদাস হাসি। স্পষ্ট শুনতে পেল, তিনি যেন বলছেন, জীবনের শেষ পরিণতি, ওঁ আকাশস্থ নিরালম্ব বায়ুভূত নিরাশ্রয়। জেগে থাকো, জেগে থাকো, একা জাগো। তোমাকে এই আমার শেষ কথা।
শেষ চুরি
আংটিটা খুব সুন্দর! বেশ ভারী। এক ভরির বেশি সোনা। টালি ডিজাইন। চার চৌকো জায়গাটায় আমার নামের আদ্যক্ষর মিনে করা। মা বললে, ‘জিনিসপত্রে তোর যা যত্ন, হারাতে বেশিদিন লাগবে না।’ আংটিটা বড়মামা দিয়েছেন। যথেষ্ট বড়লোক। গাড়ি আছে। ব্যাবসা আছে। অহংকার নেই। আমাকে পছন্দ করেন। মামার বাড়িতে কখনও গেলে ভালো-মন্দ খুব খাওয়ান। নিজে খুব ভালো রান্না করতে পারেন। একটাই গান জানেন—’জনগণমন’। মাঝে-মাঝে বেশ কিছুদিনের জন্যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে যান। কোনও পাহাড়ের গুহায়—ভগবানের সঙ্গে গল্প করতে যান। আমাকে বলেছেন—ভালো করে লেখাপড়া করলে, ঠিক সময়ে একটা হিরের আংটি দেবেন। দেখা যাক, আমার কপালে কী আছে। মা মাঝে-মাঝে রেগে গিয়ে বলে, ‘তুই বাঁদর নাচওয়ালা হবি। ওইটাই তোর ভবিষ্যৎ।’ আমি বলি, ‘নট ব্যাড। পয়সা জমিয়ে তোমাকে আমি কাশীতে নিয়ে যাব। নিজের চোখে দেখে আসবে, বাঁদর কত ভগবান।’
