দমকা বাতাসে হঁটের ঘেরাটোপ থেকে প্যাঁকাটির ছাই ঘুরতে ঘুরতে ওপর দিকে উঠে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। মাঝ গঙ্গা দিয়ে আবার একটা পিকনিক লঞ্চ চলেছে, হিন্দি গান ছড়াতে ছড়াতে। মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কী এক রসিকতায় খিলখিল হাসছে।
পুরোহিত বললেন, নাও এবার বাম জানু মাটিতে রেখে ডান জানু তুলে বোসো। বেদির ওপর এই কুশ পাঁচটা পাঁচটা করে সাজাও।
অমলের চোখ বেয়ে তখনও জল ঝরছে। দুটো হাতই জোড়া। মুছে নেবে সে উপায় নেই।
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী বললেন, নাও, হাতে একটি কুশ, তুলসীপাতাসহ প্রথম পিণ্ডটি তোলো। মন্ত্র পড়ো, কাস্যপগোত্র প্রেত….
পিণ্ডটি মন্ত্রপাঠ শেষে হাতের ডান দিক দিয়ে গড়িয়ে বেদির ওপর পেতে রাখা কুশাসনে ফেলে দিল অমল। বড় বিচিত্র কায়দা। ঠিকমতো ফেলা হল না। গড়িয়ে গেল একপাশে।
পুরোহিত বললেন, পরেরটি ঠিকমতো ফেলার চেষ্টা করো। আর একটু এগিয়ে এসোনা সামনে।
কমলবাবু বললেন, এসবের জন্যে ট্রেনিং দরকার। পাকা হাত চাই। সহজ ব্যাপার। অত বড় একটা তাল তাগ করে ফেলা। তার ওপর দু-কনুই দিয়ে জল নিপেক্ষ। চেষ্টা করো চেষ্টা করো।
চেষ্টায় কী না হয়! আগুনের রিং-এর ভেতর দিয়ে বাঘ গলে যায়।
প্রতিবেশীর একটি শিশু এসে বারে বারে একই প্রশ্ন করে চলেছে পিসেমশাই তুমি নেড়া হবে না?
চন্দ্রকান্ত বললেন, হবে বাবা, হবে। ঠিক সময়ে হবে।
আমি দেখব।
হ্যাঁ হ্যাঁ দেখবে দেখবে। এখন তুমি ওদিকে মায়ের কাছে যাও।
ছেলেটি চলে গেল। সূর্য মধ্যগগন ছেড়ে ক্রমশই পশ্চিমে হেলেছে। সোজা রোদ এসে পড়ছে অমলের মুখে। আবার শুরু হল মন্ত্রপাঠ …দেবশর্মন্ননেনিক্ষব। যতবার প্রেতপুরুষের নাম। আসছে ততবারই অমল চমকে উঠছে। পঁচাশি বছরের একটি জীবনসংগ্রাম আজ পারিবারিক ইতিহাস মাত্র। খরা, বন্যা, আশ্বিনের ঝড়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দাঙ্গা, অভাব, অভিযোগ, অবাধ্যতা, কলহ, রোগ, শোক, ব্যাধি; অবশেষে শ্রীঅমুকচন্দ্র এখন প্রেত দেবশর্মন্ন।
পিণ্ডদান শেষ হল। এবার মস্তক মুণ্ডন।
নতুন একটা ক্ষুর কিনে আনিয়েছিলেন অমল। তেমন ধার নেই। সেলুনের ছেলেটি বললে, সিলিপ করে যাচ্ছে স্যার। এ দিয়ে কামাতে গেলে ঘণ্টা তিনেক লেগে যাবে। তার মানে সন্ধে।
শ্যামলবাবু বললেন, আরে বোকা দিশি ক্ষুরে বার দশেক শান না পড়লে ধার ওঠে না। তোমার ক্ষুর নেই?
আছে স্যার
আছে স্যার তো লাগাও। চড়চড় করে টেনে সাফ করে দাও। বারে বারে ওইভাবে চুল ভেজালে সাইনোসাইটিস হয়ে যাবে যে।
ছেলেটি অমলকে জিগ্যেস করল, কি স্যার লাগাবো?
অমল ধৈর্যের শেষ সীমায় এসে গেছে। বললে, লাগাও।
ওদিকে দুই বিশেষজ্ঞে ধুম তর্ক লেগেছে, কোথাকার ছানার ভালো পান্তুয়া হয়। দত্তপুকুর না। বর্ধমান। হাতাহাতি হয় আর কি! একটু পরেই সব ছানা কিনতে বেরোবে। ভিয়েন হবে রাতে।
দেখতে দেখতে অমলের মাথা সম্পূর্ণ সাফা হয়ে গেল। এত বছরের চুল। মনে হচ্ছে মাথায় কেউ যেন পিপারমেন্ট মাখিয়ে দিয়েছে।
কমলবাবু বললেন, কি বাবা খুব মন খারাপ হচ্ছে? মন খারাপের কী আছে? মানুষ মরে না রে ভাই।
নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্ৰানি, উঃ কী হাড়কাঁপানো বাতাস ছেড়েছে আজ, গঙ্গাসাগর আসছে বুঝি। নৈনং দহতি পাবকঃ কাল মাঝ রাত থেকে কষের একটা দাঁত যা ট্রাবল দিচ্ছে। নচৈনং ক্লেদয়্যাপোন শোষয়তি মারুতঃ। বুঝলে বাপি কোনও অস্ত্রের ক্ষমতা নেই আত্মাকে ছেদন করে। অগ্নির ক্ষমতা নেই যে দগ্ধ করে। জল এই আত্মাকে ডাইলিউট করতে পারে না, টোট্যালি হেল্পলেস, বায়ুর ক্ষমতা নেই শুষ্ক করে। নাঃ, ঘাটে আর বসা যায় না। যত বেলা বাড়ছে, তত শীত বাড়ছে। সার কথা হল, ন জায়তে মিয়তে বা কদাচিং নায়ং ভুত্বাভবিত ক ন ভূয়ঃ। জন্মাইনি, মরিনি, মরব না, জন্মাব না। এই হল গিয়ে তোমার শেষ কথা। নাঃ, আজ ডেন্টিস্টের কাছে যেতেই হবে। না হলে আজ রাতটাও ঠায় জেগে কাটাতে হবে।
অমল হঠাৎ প্রশ্ন করলে, আত্মার দাঁত আছে?
কেন বলো তো। হঠাৎ তোমার এই প্রশ্ন?
উত্তর দেওয়ার আগেই চন্দ্রকান্ত সরস্বতী তাড়া দিলেন, নাও, নাও স্নান সেরে নাও, আর বেলা বাড়িও না। বাড়ি গিয়ে একটা মালসা পোড়াতে হবে।
শ্যামলবাবু বললেন, আমিও চলি। সুন্দর কাজ হয়েছে বাবা। বড় সুন্দর কাজ। এ যেন মরেও সুখ। তোমাকে আমার কিছু একান্ত প্রশ্ন আছে, পরে হবে, কী বলল, এই যেমন শেষটা কী হল, কীভাবে গেলেন, শেষ কথা কী বললেন। সন্ধেবেলা তো দেখে গেলুম। হেসে হেসে কথা। বললেন!
কমলবাবু বললেন, সত্যিই তোমার ভীমরতি হয়েছে শ্যাম, তুমি সময় পেলে না? এখন ওই সব প্রশ্ন চলে!
পরনে নতুন ধুতি, গায়ে একটা খাদি চাদর, হাতে গঙ্গার জলের ঘটি, অমল বাড়ি ফিরে এল। পেছন পেছন আসছে মেয়ে সোমা। দেখা গেল বাপের প্রতি তারই দরদ বেশি; সেই থেকে এক মুহূর্তও সঙ্গ ছাড়েনি।
বাড়িতে তখন দক্ষযজ্ঞ শুরু হয়ে গেছে। ছাদে প্যান্ডেল বাঁধার কাজ শেষ। ডেকরেটারের লোক ফিনিশিং টাচ মারছে। বাঁশ ফেলার ধুমধাম শব্দ হচ্ছে। এখানে ওখানে সাদা চাদর ঝোলানো হচ্ছে। যে ভদ্রলোক ফুল সাপ্লাই করবেন, তিনি এসে বসে আছেন একপাশে। টাকা নিয়েই ছুটবেন হাওড়ার ফুলবাজারে। অমল এক নজরে দেখে দিল বাড়ির চিত্র। থইথই আত্মীয়স্বজন চারপাশে। সার দিয়ে বসে আছেন কর্মীরা। কেউ এখুনি বেরোবেন ছানা আনতে, কেউ ছুটবেন কাঁচা বাজারে। কেউ বসে আছেন ছোট্ট একটি প্রশ্নের জবাবের জন্যে। খাবার টেবিল কী সানমাইকা লাগানো নেবেন না প্লেন।
