কুকুরের আত্মা নেই? বেড়ালের আত্মা নেই? এভরি হোয়্যার দেয়ার ইজ আত্মা। কোথাও অল্প ডোজে, কোথাও বিগ ডোজে। সব আত্মা। আত্মারই জগৎ।
চেয়ারের আত্মা আছে?
একেবারে ছেলেমানুষের মতো প্রশ্ন। আরে গাছের আত্মা আছে তো? স্যার জে সি বোস প্রমাণ করে গেছেন।
সে তো প্রাণ!
আরে প্রাণ মানেই তো আত্মা। আত্মার লক্ষণই তো প্রাণ।
প্রাণ তো মরে যায়। মরে ভূত হয়। তাহলে আত্ম মানে কি ভূত!
জানি না।
গাছ মরে চেয়ার। চেয়ার কি তাহলে গাছের ভূত?
তুমি এই সাবজেক্টটা বেঁচে থাকতে থাকতে আর বোঝার চেষ্টা কোরো না। মরলেই জানতে পারবে।
তোমাকে তো আর জানাতে পারব না।
আমিও মরে জেনে নেব।
ওপার থেকে যদি চিঠি লেখা যেত বেশ হত! ভগবানের কেন পোস্টাপিস নেই বলতে পারো?
না, পারি না। ভগবান বলে কিছু আছে? নেই। আছে ব্ৰহ্মৈব। ব্রহ্মেব তেন গন্তব্যং ব্ৰহ্মকর্মসমাধিনা। বুঝলে কিছু? ব্রহ্মের কাজ শেষ করে ব্রহ্মেই ফিরে যেতে হবে। বেশি বোঝার চেষ্টা কোরো না, তোমার মাথায় এইসব ঢুকবে না।
পুরোহিত অমলকে বললেন, নাও, ভাত হয়ে এসেছে। এই মোটা কাঠিটা দিয়ে ঘুটে নামিয়ে নাও।
অমল বললে, এখন যে একটু চাল চাল রয়েছে। এতটা শক্ত কি উনি খেতে পারবেন?
পুরোহিত অমলের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, সত্যি কি উনি খাবেন, মৃত্যুর পর মানুষের কিছু থাকে না। ধর্ম একটা প্রথা, একটা মনস্তত্ব, মনে রাখার জন্যেই এত সব। তা না হলে তো বিস্মৃতিতে সব হারিয়ে যাবে। নাও নামিয়ে দাও। দই, মধু, তিল আর কলা দিয়ে চটকালেই দেখবে নরম হয়ে গেছে!
অমল গরমেই হাত দিতে যাচ্ছিল, পুরোহিত বললেন, হাতটা পোড়াবে না কী? আগে ঠান্ডা জলে হাত ডুবিয়ে নাও। তুমি কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গেছ। আরে মৃত্যু তো মানুষের জীবনের একটা স্বাভাবিক ঘটনা। মানুষ আসবে, মানুষ চলে যাবে। আমি যাব, তুমি যাবে। ওই দেখো ওরা কেমন স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে। হাসছে, গাইছে, হইহই করছে।
অমল পুরোহিত মশাইয়ের দিকে চোখ তুলে তাকাল। চোখদুটো জলে ভরে আসছে। কেমন করে বোঝাবে সে হঠাৎ কত নিঃসঙ্গ হয়ে গেল। আপনার বলতে কেউ কি আর রইল। একই আধারে, পিতা-মাতা-বন্ধু-গুরু। যারা ওপাশে হইহই করছে, নাতি আছে, নাতনি আছে, পুত্রবধূ আছে, আত্মীয়স্বজন আছে; তারা তো সব ভিন্ন জগতের। একজন নতুন শাড়ি পরে কুঁচি ঠিক করছে। একজন অভিযোগ করছে, এইবার চুলে তেল দিতে না পারলে পাগল হয়ে যাব। একজন খোঁজ নিচ্ছে টিভিতে এই শনিবার কী বাংলা বই দিয়েছে। একজনও বলছে না, মানুষটা ছিল চলে গেছে। জীবনের শেষ তিনটে মাস কিছুই খেতে পারেননি। নাকে পরানো নল দিয়ে শুধু তরল আহার ঢালা হয়েছে খেয়ালখুশি মতো।
চোখের জল দেখে পুরোহিত বললেন, ভেঙে পোড়ো না। দীর্ঘ পথ তোমাকে একাই টানতে হবে বাবু। জগতের এই নিয়ম। নিজের জোয়াল আমরা নিজেরাই টানব। জেনে রাখো, সময়। সময়ই সব ক্ষত সারায়। নাও মালসার ভাত কলাপাতায় ঢালো।
নীপা এগিয়ে এল। হাতে দু-খানা ধুতি। অমলের সামনে মেলে ধরে বললে, কোন পাড়টা তোমার পছন্দ? একটা তোমার একটা তোমার ছেলের।
অমল শুধু একবার তাকাল। দু-চোখে ঝাপসা দেখছে। বললে, যেটা হোক।
নীপা বললে, তুমি এখনও মেয়েছেলেদের মতো কাঁদছ। আশ্চর্য!
অমল মনে মনে ভাবলে, মেয়েরা আজকাল কাঁদে! কই তুমি তো কাঁদছ না!
নীপা চলে গেল। অমল ভাত মাখছে। ভাবছে, এই হল প্রেতের আহার। কোথায় কাঁসার ঝকঝকে থালা, গেলাস, পরিপাটি আসন, লাল মেঝে, জল তরতরা!
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী বললেন, নাও গোল গোল করে দশটা পিণ্ড করো সমান মাপের। হাতে নিয়ে নাচাও, দেখবে সুন্দর গোল হয়েছে।
কমলবাবু বন্ধু শ্যামলকে ছেড়ে দু-ধাপ ওপরে উঠে এসে অমলের কাছাকাছি উবু হয়ে বসলেন। চন্দ্রকান্ত সরস্বতী তাকাতেই মুচকি হেসে বললেন, বড় আদর্শবান, ধার্মিক মানুষ ছিলেন। কখনও কারওর কাছে মাথা হেট করেননি। আরে এই তো মাসখানেক আগেও দেখি বাজার থেকে ফিরছেন। ধোপদুরস্ত ধবধবে সাদা জামা আর কাপড় পরতেন। পায়ে পালিশ করা চকচকে ডার্বি। মেরুদণ্ড একবারে সোজা। আহা অমন মানুষ আর হবে না। আমরা দেখলেই বলতুম, আপনার ছেলের চেয়েও আপনি এখনও যুবক আছেন।
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী বললেন, এক মাস আগে নয়, তিন মাস আগে।
আমার স্পষ্ট মনে আছে এক মাস আগে।
কমলবাবু শ্যামলকে জিগ্যেস করলেন, শ্যাম এক মাস আগে না?
শ্যামলবাবু বললেন, তোমার আজকাল সময়ের হিসেব থাকছে না। দু-মাস তো তুমি এলাহাবাদে মেয়ের বাড়িতে ছিলে।
কমলবাবু হতাশ হলেন। তবে বেশিক্ষণ নয়।
প্রশ্ন করলেন, পণ্ডিতমশাই, এই পিণ্ডি সাহস করে মানুষ খেতে পারবে?
খারাপ কী? ফাইন আলোচাল, দই, কলা, তিল সবই—অতি উপাদেয়।
না মশাই, আমার মনে হয় পেট ছেড়ে দেবে। এ একমাত্র ওই ভূতেদের চলে। ভূতের তো আর পেট নেই।
শ্যামলবাবু উঠে এলেন। কমলের পাশে বসে গম্ভীর মুখে বললেন, পাঁজিটা দেখেছিলেন?
চন্দ্রকান্ত বললেন, কেন বলুন তো?
মৃত্যুর সময়ে কোনও দোষটোষ পাননি তো?
হ্যাঁ পেয়েছেন, ত্রিপাদ দোষ।
সর্বনাশ! একপাদ, দ্বিপাদ নয় একেবারে ত্রিপাদ। সমূহ বিপদ। দোষ খণ্ডনের কিছু করেছেন?
কিছু মাত্র না।
সে কী? বংশ যে নির্বংশ হয়ে যাবে।
দেখাই যাক না কী হয়।
পুরোহিত কুশের আংটিটি অমলের হাতে দিতে দিতে বললেন, নাও পরে নাও অনামিকায়। দক্ষিণাস্য হয়ে বোসো। পইতেটা বাঁ কাঁধ থেকে ডান কাঁধে ঘুরিয়ে নাও। একে বলে প্রাচীন। রীতি। তার আগে গায়ত্রী পড়ো দশবার।
