কমলবাবু বললেন, আহা বেচারা একেবারে ভেঙে পড়েছে। এ তো যে সে ছেলে নয়, একেবারে বাবা অন্ত প্রাণ। হবেই তো। ভেতরটা একেবারে হু-হু করবে। যত দিন যাবে জ্বলে-পুড়ে খাক। হবে। আমার পিতৃবিয়োগের পর কী হয়েছিল জানো? একটা বছর একেবারে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলুম। স্ত্রী, পুত্র, পরিবার সব যেন বিষ। পানসে, পয়জন।
আমার সেই বাল্যে হয়েছিল, বেঁচে গেছি, কিছুই তেমন মনে নেই। এখন নিজেই পিতা।
তোমার বড় ছেলেটি এখন কোথায়?
হারামজাদাকে দূর করে দিয়েছি। আমি বড় স্ট্রিক্ট প্রিনসিপলের ফাদার। তুমি বড় চাকরি করতে পারো, কিন্তু বাপের অমতে বিয়ে করলে ক্ষমা নেই। নো প্লেস ইন দি ফ্যামিলি। শুনেছি সল্টলেকে নাকি দেখার মতো বাড়ি ফেঁদেছে।
শ্বশুর নাকি বিশাল বড়লোক।
শুনেছি, শুনেছি। খানচারেক গাড়ি আছে। তা থাক, কালচারে ভেরি পুওর। একেবারে পোর। শেক্সপীয়ারের নাম শোনেনি। কেবল ঠনঠনিয়া ঢনঢনিয়া।
কীসের কারবার?
লোহার। আয়রন মার্চেন্ট। ওড়িশার দিকে একটা মিনি স্টিলপ্ল্যান্ট করেছে।
ছেলেকে তুমি তাড়ালে, না তোমাকে লাথি মেরে সরে গেল?
আরে বাবা, ওই একই হল। নিজে না সরলে, আমিই তাড়াতুম। বুঝলে না, বড়লোকের সুন্দরী মেয়ে, একেবারে ভেড়া বানিয়ে ছেড়ে দিলে। গেট আপ। উঠে দাঁড়াল। সিট ডাইন। বসে পড়ল। লাই ডাউন। শুয়ে পড়ল।
কী করা যায় বলো তো?
কীসের কী করা যায়?
মেয়েরা যদি এইভাবে ছেলেদের ভাঙিয়ে নিয়ে যায়, আমাদের ভবিষ্যৎটা কী হবে?
সময় থাকতে সাবধান হবে আমার মতো। সঞ্চয় বাড়াবে। সেভিংস। আমার সলিড এক লাখ ফিক্সড করা আছে। ইন্টারেস্টেই মাস চলে যাবে, ডিপোজিটে হাত পড়বে না।
তোমার যে ভাই মেয়ে নেই। বেঁচে গেছ। জোর বাঁচা বেঁচ্ছে। কান্তিটাকে দেখলে আমার ভয় হয়।
কে কান্তি?
আরে আমাদের কান্তি ঘোষ।
অ কান্তি। পি এম জি অফিসে ছিল তো? ও একটা রামছাগল। ওকে প্রথমে মেরে গেছে ওর বউ। চির রুগ্ন। শেষ সাতটা বছর পড়ে রইল বিছানায়। তারপর শেষ মার মারলে ওর ছেলে। ওস্তাদের মার। বাপের পয়সায় ব্যবসা করতে গেল। আরে বাবা বাঙালির রক্তে ব্যবসা আছে নাকি! বাঙালির রক্তে তিনটি মাত্র জিনিস আছে, রাজনীতি, দলাদলি আর বোমাবাজি। কান্তির মতো গাধারা শেষ জীবনে মরবেই। ফ্যা-ফ্যা করে মরবে। দুবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। জানোই তো, একে চন্দর, দুয়ে পক্ষ। মানে কী? একবার স্ট্রোকে চাঁদি উড়বে। টাকার শ্রাদ্ধ হবে। দ্বিতীয় বারে তুমি পাখা মেলবে। এই উড়ি, কখন উড়ি ভাব। আর তিনে নেত্র। চোখটি উলটে গেল। চিচিং ফাঁক।
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী চারখানা ইট ঘিরে বেশ একটা উনুন মতো বানিয়ে ফেলেছেন। পাশে উবু হয়ে বসে আছে অমল। নিজের মনেই বললে, এই ছাতারে পাখির কিচিরমিচির বন্ধ হবে কখন? ধরা করা করে ঘাটটা জোগাড় করলুম, শান্তিতে নির্জনে কাজ করব বলে, হয়ে গেল। সে গুড়ে বালি।
পুরোহিত বললেন, ছিঃ ছিঃ। ওঁরা তোমার গুরুজন। পিতার বন্ধু।
আমার পিতার কোনও বন্ধু ছিল না।
তোমার পিতার পরিচিত। একটা বছর তোমাকে খুব সাবধানে থাকতে হবে বাবু। মহাগুরু নিপাত যোগ। কারওর সঙ্গে বিবাদ বিসম্বাদ নয়, সাবধানে চলাফেরা। ট্রামে বাসে ওঠা নামা। বয়স্ক মানুষদের বকবক করাই স্বভাব। নাও, মালসা চাপাও। চাল আমি ধুয়ে রেখেছি।
শ্যামলবাবু হেঁকে উঠলেন, অমল তোমার শীত করছে না?
অমলের সংক্ষিপ্ত উত্তর, না।
কমল বললেন, ওর আর এখন শীত-গ্রীষ্ম বোধ নেই।
গীতা একেই বলেছেন মনসা কর্মনা বাচা। শ্যামল যোগ করলেন।
কী পাগলের মতো বলছ! গীতায় আবার অমন শ্লোক পেলে কোথায়?
আরে ওই হল। ভাগবত ভেঙেই তো গীতা হয়েছে।
চুপ করো, তুমি চুপ করো। তোমার জ্ঞানের ভাণ্ডার আর খুলো না। সামনেই পণ্ডিত বসে আছেন। শুনতে পেলে হাসবেন তিনি।
হাসার কী আছে। সব ধর্মই এক। সর্বধর্ম সমন্বয়। গীতাও যা, ভাগবতও তাই। রামায়ণও যা, মহাভারতও তাই। যেই রাম, সেই কৃষ্ণ—দুয়ে মিলে রামকৃষ্ণ।
পুরোহিত বললেন, নাও, এক গোছা প্যাঁকাঠি নিয়ে আগুনে ধরাও। উত্তরীয় সামলে। একটু সরে বোসো, আগুনের ফুলকি উড়ছে বাতাসে।
ওপাশে মেয়েরা হইহই করছে। নখ কাটা চলেছে। অমলের ছেলে এসে গেছে। সে আর কাজের দিকে ভেড়েনি। মাথায় আধুনিক কায়দায় লম্বা ফুরফুরে চুল। পরনে জিনসের বহু পকেটওয়ালা কায়দার প্যান্ট, টি শার্টের মতো সোয়েটার। সিনেমার কচি নায়কের মতো হাত-পা নেড়ে কত কথাই যে বলছে। অমলের কানে আসছে আবার আসছে না।
হঠাৎ অমলের কানে এল শ্যামলবাবু বলছেন, মনই তো আত্মা, সেই আত্মাকে জয় করতে পারলেই মার দিয়া কেল্লা। তখন শীতও নেই, গ্রীষ্ম নেই, বাতও নেই, অম্বলও নেই।
কমলবাবুর তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ, কে বলেছে মনই আত্মা? মন আত্মা নয়।
তাহলে মনটা কী?
মন ইজ মন। আত্ম ইজ আত্মা। আত্মাকে জয় করা যায় না। আত্মায় গিয়ে ঢুকে পড়তে হয়, যেমন শীতকালে তোক হি-হি করে ঢুকে পড়ে লেপের তলায়। যেমন ছানা আর রসগোল্লা। রসগোল্লা খেয়ে কেউ বলবে না ছানা খেয়েছি। অথচ ছানাই খেয়েছে। সন্দেশ খেয়ে কেউ বলবে না, ছানা খেয়েছি, কিন্তু ছানাই খেয়েছে। আত্ম হল ছানা। সেই ছানা থেকে ছেনে মানুষ, বেড়াল, কুকুর, গাধা।
কুকুর, বেড়াল, গাধার আত্মা নেই। যা প্রাণ চায় তাই বলে যাচ্ছ।
