ছেলেটি চুপসে গেল। আর সেই মুহূর্তে পুরোহিত চন্দ্রকান্ত ছেলেটিকে বললেন, বাবু, এই বালতিটা করে এক বালতি গঙ্গাজল নিয়ে এসো তো।
পরনে দামি প্যান্ট। গায়ে কলার দেওয়া সুন্দর সোয়েটার। হাতে জাপানি ঘড়ি। ছেলেটির মুখটা ভারি করুণ দেখাল। এসেছিল প্রেম করতে। বড় আশায় আশায়। এখন আনতে হবে ভড়ভড়ে পাঁকে পা ডুবিয়ে গঙ্গার ঘোলা জল! আর বালতিটাও নেহাত ছোট নয়।
ছেলেটি প্যান্টের পা গুটোতে লাগল। মেয়েটি চলে গেল ভাঙা শিবমন্দিরের দিকে। বালতিটা হাতে নিয়ে ছেলেটি এপাশে-ওপাশে তাকাচ্ছে অসহায়ের মতো। বিশ-পঁচিশটা বড় বড় ধাপ ভেঙে তাকে নামতে হবে জলে।
অমল বসেছিল, উঠে দাঁড়াল, বালতিটা আমাকে দাও, আমি নিয়ে আসছি জল।
চন্দ্রকান্ত সরস্বতী হাঁ হাঁ করে উঠলেন, না না, তুমি না, তুমি চুপচাপ বোসো। ও ছোকরা আছে, ও-ই নিয়ে আসবে।
অমলের বড় অদ্ভুত লাগছে, হঠাৎ তার খাতির কেমন বেড়ে গেছে। সকলেরই নজর এখন তার দিকে। সংসারের এত নজর তো তার ওপর ছিল না। তাকে বসতে দেখলেই তো একটা না।
একটা কাজ চাপিয়ে দেওয়া হত ঘাড়ে। ভারি কাজের তো অভাব ছিল না। বালতি বালতি জলও টেনে তুলতে হয়েছে একতলা থেকে দোতলায়।
চন্দ্রকান্ত বললে, কী কাপড় শুকোলো?
নীপা বললে, প্রায় শুকিয়ে এসেছে।
একটু দোলাও, একটু দোলাও। বারোটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই।
নীপা আর সোমা কাপড়টাকে দোলাতে লাগল মজা করে, এপাশ থেকে ওপাশ, সাদা থান ফুলে ফুলে উঠছে। সোমা বলছে, দেখো মা, আবার না ফসকে যায়।
অমল অবাক হচ্ছে। দশ দিনেই এরা একটা মানুষকে ভুলে গেল। কী আশ্চর্য! এই তাহলে সংসারের পাওনা! সারাজীবন খেটে, তিল তিল সঞ্চয় করে, হয়তো একটা বাড়ি, আশি-নব্বই হাজার খরচ করে মেয়েকে বিয়ে, নিজেকে মেরে ছেলেকে ডাক্তার কি ইঞ্জিনিয়ার করা, তারপর যেন স্লেটের লেখা। দু-ফোঁটা চোখের জল, সব মুছে গেল। জগৎ হাসতে লাগল হ্যা হ্যা করে। কে যেন ভেতর থেকে বললে, অমল ভাবছ কী! তুমিও এই ভাবে চলে যাবে স্মৃতি থেকে। সংসার। সংসার করে আর অত বেশি উতলা হয়ো না। তোমাকে যারা ঘিরে আছে, সবাই কাবুলিওয়ালা। হয় আসল দাও, না হয় দাও সুদ। একটা ছাদ, একটা বিছানা, একটা বউ আর বাবা ডাকের। জন্যে বড় চড়া সুদ দিতে হয়। গোটাও, গোটাও, নিজেকে গুটিয়ে নাও।
নীপা এগিয়ে এসে বলল, এই নাও তোমার কাপড়। আমি এবার নখ কেটে চান সেরে নিই।
অমল হঠাৎ জিগ্যেস করলে, তোমাদের মন খারাপ হচ্ছে না?
না, আমাদের মন বলে কোনও বস্তু নেই। আমরা পাষাণ।
চলে গেল নীপা। মহামায়া সেলুনের ছেলেটা এসেছে। প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট চড়িয়ে। একপাশে দাঁড়িয়ে প্যান্ট পালটে লুঙ্গি পরছে। এদের নখ কাটবে, সব শেষে অমলকে ন্যাড়া করবে। নীপা ওইদিকেই গেল।
পুরোহিত চন্দ্রকান্ত বললেন, খান চারেক ইট চাই যে।
ইট?
সকলের মাথায় যেন ইট ভেঙে পড়ল। পরস্পর পরস্পরকে বলতে লাগল, ইট চাই? ইট। কেউ
কিন্তু নড়ল না। কে যেন বললেন, ইয়াং জেনারেশন সব গেল কোথায়? ইটফিট তো তারাই আনবে।
সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, ইয়াং একালের ইয়াং, তারা ন দেবায়, ন হবিষগায়।
অমল এতক্ষণ নিজের ভাবে ছিল, লক্ষ করেনি, দুই প্রবীণ প্রতিবেশী বেশ ধোপদুরস্ত হয়ে, শালটাল গায়ে দিয়ে এসেছেন। একজনের নাম কমলবাবু আর একজনের নাম শ্যামলবাবু। দুজনেই রিটায়ার্ড। একজন রেলে আর একজন ইনকাম ট্যাক্সে কাজ করতেন। একজন খুব ঘুরতেন, আর একজন মানুষকে খুব ঘোরাতেন। দুজনেই কৃতী, করিতকর্মা। বাড়ি করেছেন। ছেলেদের ভালো ভালো জায়গায় বসিয়েছেন। দেখেশুনে খেলিয়ে মেয়েদের সব পাত্রস্থ করেছেন।
কথা হচ্ছে কমলে আর শ্যামলে। শ্যামলবাবুর হাতে আবার সেদিনের ভাঁজ করা কাগজ।
শ্যামলবাবু বললেন, যা হবার তা এই অমলদের জেনারেশন পর্যন্ত হয়ে গেল, এরপর আর পিতৃপুরুষকে জল পেতে হচ্ছে না। ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে ফেলে দিয়ে আসবে ভাগাড়ে।
না, না, না ভুল হল, ভুল হল কমলবাবু সংশোধন করলেন, জল পাবে অন্য ফর্মে, চোলাইয়ের বোতলের তলানি দু-চার ফোঁটা ঢেলে দেবে ঠোঁটে। আমরা হয়তো এক চামচে গঙ্গোদক পাব, অমলদের বরাতে কী আছে কে জানে! তখন হয়তো শ্রাদ্ধেও রাজনীতি ঢুকবে।
তুমি বলছ রাজনৈতিক শ্রাদ্ধ। আরে সে তো সারা দেশ জুড়েই হচ্ছে।
অমল তোমার ছেলেটিকে দেখছিনা?
শ্যামলবাবুর প্রশ্নে অমলের খেয়াল হল। সত্যিই তো শেখর গেল কোথায়! তারও তো ঘাটে কাজ আছে। এই সময় থাকলে, জল কি ইট এনে দিতে পারত, অন্যের খোশামোদ করতে হত না।
কমলবাবু বললেন, আরে সে তো এই জেনারেশনেরই ছেলে। দ্যাখো হয়তো টিভিতে ক্রিকেট দেখছে। লাঞ্চের পর আসবে।
একালের ছেলেরা দেশ থেকে ধর্মটর্ম সব উঠিয়ে দেবে দেখছি।
না না, ধর্ম উঠবে কেন? দেখছ না, বারোয়ারির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে কীরকম। বেড়েই চলেছে। বেড়েই চলেছে।
বারোয়ারিকে তুমি যদি বলো পুজো, তাহলে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে বাপু।
শোনো শোনো, ধর্ম যায় যাক, মানবধর্ম যেন থাকে। সেটি হল শিশ্নোদরপরায়ণ হওয়া। তা সেদিকে আমরা বাপু হু-হু করে এগিয়ে চলেছি। বিয়ের ঘটা দেখছ? এক এক লগ্নে হাজারে হাজারে জোড় বাঁধছে। আর প্রেম? প্রেমের বন্যা বইছে। সবাই লাভার।
অমলের কাপড় পরা হয়ে গেছে। পুরোহিত বললেন, আর দাঁড়িয়ে থেকো না অমন উদাস মুখ করে। জানি মন ভীষণ খারাপ। তবু করণীয় কাজ তো করতেই হবে।
