অন্য সময় হলে অমল প্রতিবাদ করত। সে এমন কী বুড়ো। সবে কানের পাশের দু-চারটে চুলে পাক ধরেছে। আজ শুধু ফ্যালফ্যালে দুটো চোখ মেলে শুনে গেল।
নীপা অমলকে বললে, খালি পায়ে না চলে চলে পাদুটোকে এত নরম করে ফেলেছ। তা ছাড়া তুমি একটু ভীতুও আছো বাবা।
অমল এবারেও প্রতিবাদ করল না। শুনে গেল। কেমন করে বোঝাবে এদের নিজের মনের অবস্থা সাহারা মরুভূমির মতো হয়ে গেছে। যেদিকে তাকাও শুধু বালি আর বালিয়াড়ি।
নীপা খুব সাবধানে, ধরে ধরে অমলকে এক পা, এক পা করে জলে নামাল। ঠান্ডা জলের স্পর্শে গা যেন জ্বলে গেল। ভেতরটা পাঁকে একেবারে গ্যাদ গ্যাদ করছে। পায়ের হাঁটু পর্যন্ত ভড়-ভড় করে ঢুকে গেল। অন্য সময় হলে গা ঘিনঘিন করত। এখন আর সে বোধ নেই। ঘটনা তাকে ঠেলতে ঠেলতে সময় থেকে সময়ে, দিন থেকে দিনে নিয়ে চলেছে। জীবনের কী দাম! থাকলেই বাকী, গেলেই বা কী! থাকার চেয়ে যাওয়াটাই নিশ্চিন্ত। কবে কোথায় যেন পড়েছিল, তুমি জন্মেছ। মরার জন্যে।
বর্ধমান থেকে দিদি আসত তার ছেলেবেলায়, অমল জানত, এটা আসা নয়, যাওয়া। যাওয়ার জন্যেই দিদি এসেছে। হাসছে, কথা বলছে, গান গাইছে। কলকাতায় থিয়েটার দেখতে যাচ্ছে, অমল খুব একটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করত না। জানত ধরে রাখা যাবে না। যাওয়ার দিন দিদি অমলের হাতে একটি টাকা দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। তখন অমলও কাঁদত দিদিও কাঁদতেন হাউ হাউ করে। সে এক মজার ব্যাপার। দুজনেই জানত যেতে হবে, চিরবিদায় নয়, তবু বুকটা কেমন যেন খালি হয়ে যেত।
নীপা বললে, এবার দেখছি তোমাকে নিয়ে এক বিপদ হবে। তুমি যা করছ। ঝপ করে একটা ডুব মেরে নাও, তোমাকে আমি ওপরে তুলে দিয়ে আসি। আরে বাবা কোনও মানুষই কি চিরকাল বাঁচে! বয়েস হলেই যেতে হবে। মনটাকে শক্ত করো, শক্ত করো। তোমার এখনও কত কাজ বাকি, ছেলেমেয়ের এডুকেশান, বিয়ে।
অমল আর শীর্ণ স্বার্থের কথা শুনতে চায় না। শুনে শুনে কান পচে গেছে। তাছাড়া এইবার যেন কাঁপুনি আসছে। চড়া রোদ; কিন্তু দমকা বাতাসে মনে হচ্ছে কাশীর চিনির মতো লালচে নরম। সে ঝপ ঝপ করে গোটা দুই ডুব মেরে নিল। বরফের মতো শীতল জল। দুটো কান কটকট। করতে শুরু করেছে।
নীপা বললে, আর না, আর না, এবার উঠে চলো।
অমলের হঠাৎ মনে হল, এ ভালোবাসা না স্বার্থ! সে-ই তো এখন সংসারের মাথা হল, তাকে ঘিরেই গ্রহরা ঘুরপাক খাবে। আকর্ষণ-বিকর্ষণে হাসি ফুটবে। মুখ ভার হবে। তার শরীর-স্বাস্থ্য, মন-মেজাজের জন্যে তাই কি এত উদবেগ!
ঘাটের মাথা থেকে চন্দ্রকান্ত সরস্বতী তাড়া লাগালেন, উঠে এসো, উঠে এসো। আর দেরি কোরো না। উত্তরীয়টা পরে কাপড়টা শুকিয়ে নাও। তারপর কাজে বসা যাবে।
ঘাট আর তেমন নির্জন নেই। আত্মীয়স্বজনেরা একে একে সব এসে গেছেন। এক-একজনের এক-একরকম সাজ-পোশাক। চোস্ত পাজামা, সার্জের পাঞ্জাবি, দামি শাল গায়ে দিয়েও কেউ কেউ এসেছেন। একজনের মুখে সিগারেট জ্বলছে। মেয়েরা কেউ কেউ বেশদামি শাড়ি পরেছে। বিলিতি গন্ধ ঢেলেছে গায়ে। জমিদারবাড়ির এই একান্ত, নির্জন ঘাটটির প্রশংসা করছে কেউ। কেউ বলছে পৃথিবীতে পয়সাই সব। পয়সা থাকলে মানুষ কত ভালোভাবে বাঁচতে পারে। গঙ্গার ধারে বিশাল বাগানবাড়ি। পোস্তা। ঘাট। মন্দির। মুক্ত বাতাসে ভোরে দু-চার পাক মারা মানেই। একশো বছরের পরমায়ুর গ্যারান্টি। এইসব নানা কথা অমলের কানে আসছে। খিল খিল হাসি। দু-চার কলি রবীন্দ্রসংগীত। একজনের দুঃখ আর-একজনকে স্পর্শ করে না। দুঃখ আর মেয়েদের অলঙ্কার যে এক বস্তু। সহজে অন্যের কাছে যায় না। নিভৃতে ভেলভেটের বাক্সে থাকে। গোপনে খুলে খুলে দেখতে হয়, পরতে হয়।
নীপা বললে, এ কী, গা-টা মুছলে না! নিউমোনিয়া হলে কে দেখবে! ওনার তবু তুমি ছিলে, তোমার কে আছে? কে দেখবে তোমাকে?
নীপার এই কথাটা অমলের ভীষণ ভালো লাগল। দুটো জায়গা স্পর্শ করেছে। এক, তার অহঙ্কার। সে যে খুব করেছে, বাঁচুন না বাঁচুন, সেবার ত্রুটি হয়নি, এরা বুঝেছে, জেনেছে সবাই। দ্বিতীয় তার শূন্যতা। একালের ছেলেমেয়েরা বাপকে দেখবে না, দেখে না; নীপা বুঝেছে। অমলকে তাহলে নীপাই দেখবে, যদি না সে আগে চলে যায়। বেঁচে থাকার পরিধি আজ এই মুহূর্তে সুচিহ্নিত হল। স্বামী আর স্ত্রী আর এদিকে-ওদিকে কিছু কর্তব্য, যা মানুষকে করে যেতেই হয়।
নীপা উঁচু গলায় বললে, এই চন্দ্রকান্তদা, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না!
পাটকাটির ফেঁসে পরিষ্কার করতে করতে তিনি বললেন, কেন মা?
এই ঠান্ডায় পুরো জলটা গায়ে বসে গেল।
যাক, বসে যাক। কিছু হবে না। এখন ও তাঁরই রক্ষণাবেক্ষণে আছে। তিনিই দেখবেন। তুমি কিছু ভেবো না।
নীপা আর সোমা দুজনে দুদিক থেকে ধরে অমলের ভিজে থান রোদ আর বাতাসে শুকোতে লাগল। বাতাস লেগে কাপড়টা মাঝে মাঝে ফুলে উঠছে নৌকোর পালের মতো। সোমার হাত থেকে একবার একটা খুট ফসকে বেরিয়ে যেতেই, মা আর মেয়ে দুজনে হেসে গড়িয়ে পড়ার দাখিল।
আত্মীয়দের মধ্যে উঠতি বয়সের চপলা নামে একটি মেয়ে বলছে, শীত থাকতে থাকতে এখানে একটা পিকনিক করলে বেশ হয়।
সকালে অমল একবার লক্ষ করেছে, এখনও করল, প্রতিবেশী একটি ছেলে মেয়েটির কাছাকাছি আসার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নানাভাবে তোয়াজ করে চলেছে মেয়েটিকে। পিকনিকের কথায় ছেলেটি মহা উৎসাহে বললে, তাহলে কালই হয়ে যাক। মেয়েটি স্মরণ করিয়ে দিলে, কাল যে শ্রাদ্ধ।
