অমল বুঝতে পারল না, কী ধরবে, কাকে ধরবে। পেছনে ভাঙা ঘাট, সামনে খরস্রোতা নদী। ডানপাশে সরকারি বাঁধন ছেড়ে বেরিয়ে আসা তারের খাঁচা। বাঁ-পাশে জমিদার বাড়ির ভেঙে পড়া পোস্তার শতটুকরো থাম। অমল এখন পুরোপুরি সচেতন। মানুষ সহজে কি মরতে চায়! একটু আগে সে অসীম শূন্যতায় কাটা ঘুড়ির মতো ভাসছিল, এখন আবার সুতো এসে গেছে হাতে। গোটাতে শুরু করেছে। জলের এই গভীরতায় উলটে পড়া মানে ভেসে চলে যাওয়া। অতি কষ্টে হেলেদুলে শরীরের ভারসাম্য কোনওক্রমে ফিরিয়ে এনে ভাবতে লাগল, কী করবে। কীভাবে নামবে জলে!
মাঝ নদী দিয়ে একটা লঞ্চ চলেছে উত্তর দিকে। হিন্দি সিনেমার গানের সুর খান খান হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে, ভাঙা খোলামের কুচির মতো। লঞ্চের ছাদে একদল উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে হই হই করছে। অমল অবাক হয়ে গেল, পৃথিবী তাহলে ফুরিয়ে যায়নি। এখনও গান আছে, জীবন আছে, আনন্দ আছে। আছে নিউ ইয়ারসের পিকনিক।
জমিদার বাড়ির দারোয়ান ঘাটে এসেছিল। অমলের টালমাটাল সঙ্গিন অবস্থা দেখে উঁচু গলায় বললে, আরও ডান দিকে সরে গিয়ে নামার চেষ্টা করুন। ওখান দিয়ে পারবেন না।
অমল এখন মরিয়া। এই কসরত আর ভালো লাগছে না। বহুক্ষণ হয়ে গেল। কত জল বয়ে গেল। সাগরের দিকে। অমল ডান দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঘাটের ওই দিকটা নাকি সহজ। জীবনের কোন দিকটা সহজ? পা না দিলে কি বোঝা যায়! জীবনের এতগুলো বছর পেঁজা তুলোর মতো উড়ে গেল ফুরফুর করে, কই বোঝা তো গেল না সহজ কোনটা!
অমল পা বাড়াচ্ছে, পেছন থেকে অমলের মেয়ে বললে, বাবা দাঁড়াও, আমি এসে গেছি। একা নামতে যেও না। আমি তোমার হাত ধরছি।
তির তির করে হরিণীর মতো নেমে আসছে শাড়ি পরা টুকটুকে ফরসা একটি মেয়ে। বাতাসে উড়ছে রুক্ষ ফুরফুরে চুল। অমলকে ধরার জন্যে ছুটে আসছে স্নেহের বন্ধনে। একটু আগে তার মনে হচ্ছিল, বছরের এই এমন একটা দিনে নিজের জীবনে ইতি টেনে দিলে ক্ষতি কী! সারাটা বছরের উথালপাথালে তাহলে পাড়ি দিতে হয় না। মুক্তি! মৃত্যুর চেয়ে সহজ মুক্তি আর কীসে। আসে? এই তো মাত্র দশ দিন আগে সেই সত্যের সন্ধান সে পেয়েছে। পেলে কী হবে! বন্ধন যে মুক্তির চেয়ে প্রবল। সব নৌকোই কি আর নোঙর তুলে তটের মায়া কাটিয়ে সহসা চলে যেতে পারে! তীরে তীরে বয়ে যায়। ঘাট থেকে ঘাটে। হাট থেকে হাটে। যতক্ষণ না ঝঞ্চা এসে। একেবারে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
অমলের মেয়ে সোমা বললে, বাবা, আমি আগে নামি, তারপর তুমি আমাকে ধরে নামো।
বাবা ডাক শুনে অমল নিমেষে পেছিয়ে গেল তিরিশটা বছর। হরিদ্বারের মনসা পাহাড়ের খাড়া একটা অংশে সে উঠে গিয়ে নীচের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেছিল, বাবা, আপনি আমার হাত ধরে উঠে আসুন। বেশ সাহসের সঙ্গে নিজের ওপর আস্থা রেখেই বলেছিল।
তিনি হেসেছিলেন। হেসে বলেছিলেন, তুই পারবি না রে আমার ভার রাখতে। দেখনা আমি নিজেই উঠছি। তুই বরং নেমে এসে আমায় ঠেলে তুলতে পারিস। টেনে তোলার চেয়ে ঠেলে তোলা সহজ।
তখন অমল ছিল ছেলে, আজ সে বাবা। অমল মনে মনে বললে, সেদিন সন্দেহ করেছিলেন, ভার রাখতে পারব না, কিন্তু এগারো দিন আগে আপনাকে কাঁধে করে নিয়ে গেছি। আপনি কি বুঝতে পেরেছিলেন!
কী হল নেমে এসো। এই ঠান্ডায় তুমি দেখছি একটা শক্ত ব্যামো না ধরিয়ে ছাড়বে না।
মেয়ের কথায় অমল তিরিশ বছর পেছন থেকে আবার সামনে ফিরে এল। এক হাত দূরে গঙ্গার শীত-স্বচ্ছ জল তর তর করে বয়ে চলেছে। সোমা কায়দা করে কখন নেমে পড়েছে জলে। হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেছে। একটা হাত সামনে বাড়িয়ে ধরে বলছে, ঝপ করে নেমে এসো বাবা, আর দেরি কোরো না। ভীষণ ঠান্ডা জল।
নামার আগে অমল একবার পেছন ফিরে তাকাল। অমলের স্ত্রী নীপা এসে দাঁড়িয়েছে কখন। খেয়াল করেনি। পরনে সাদা লালপাড় শাড়ি। টকটকে গৌরবর্ণ শরীর অশৌচের কৃচ্ছসাধনে বেশ সাত্বিক দেখাচ্ছে। মুখে ক্লান্তির ছাপ। টানা তিন মাস দিবারাত্র রুগির পরিচয্যার পর শরীর এখনও বিশ্রাম পায়নি। দু-একবার বলেছে, কাজকর্ম চুকে যাক, তারপর একটানা তিনদিন পড়ে। ঘুমোবে। অমল জানে না সংসার তাকে সে-সুযোগ দেবে কি না! সংসার এমন এক জায়গা, যা সুখ, দুঃখ, কর্ম, অকর্ম সব গ্রাস করে নেয়। মৃত্যুর মতো অমন শান্তির মহানিদ্রা আর নেই। তিনটি মাত্র খাবির মামলা। এই তো দেখল। চোখের সামনে ভাসছে সে দৃশ্য। প্রথম খাবিতে কবজির। কাছ থেকে নাড়ি চলে গেল। দ্বিতীয় খাবিতে চলে গেল কনুইয়ের কাছ থেকে। তৃতীয় খাবিতে চোখ বিস্ফারিত স্থির। দেহ শান্ত। নিমেষে সব যন্ত্রণার অবসান। দীর্ঘ পঁচাশি বছরের কর্মকাণ্ড। তিন টুসকিতে কোথায় চলে গেল! কত কষ্টে একটা জীবন ছড়ায় আর কত সহজেই না গুটিয়ে যায়। ছাদের আলসেতে মেয়েরা যখন ভিজে কাপড় ঝোলায়, তখন কত ধীরে ধীরে, ঝেড়ে ঝেড়ে, টেনে টেনে ঝোলায়। আর শুকনো কাপড় তোলার সময় সড়াক করে একটানে তুলে নেয়। মৃত্যু হল শুকনো কাপড় তোলা।
নীপা হাত তুলে ইশারা করে জানাল, দাঁড়াও। নেমে এল ধীরে ধীরে। সোমা হাত পেছিয়ে নিল। বাবার জীবনসঙ্গিনী এসে গেছে। আর ভয় নেই। সহধর্মিণী।
নীপা বললে, তোকেই কে ধরে ঠিক নেই, তুই ধরবি এই বুড়ো মানুষটাকে?
