বেকসুর সেই রাত। বকুলতলার ঘাটে জোয়ার ছলাত ছলাত নদীর ধারে, ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার আবহ শব্দে, কথাটা বলেই ফেললুম, ওই মাথাটা কাঁধে নয় বুকে চাই।
ভেবেছিলুম, ভুরু দুটো কোঁচকাবে। মুখ কঠোর হবে। ঠাস করে দরজাটা বন্ধ হয়ে যাবে। হল না। মোলায়েম একটা হাসি। খুব অর্থমাখানো দুটো চোখ। এক ঝলক চাঁদের আলো। সাদা পায়রার ফটফট ডানা। অবশেষে দুর্দান্ত ঝাল শিঙাড়া, জিভ-ছ্যাঁকা চা।
ফ্যামিলি কোর্ট বা পারিবারিক আদালতের বিচারক চোখ তুলে বললেন—এত সুন্দর শুরুটাকে। মাঝপথে এমন জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেললেন কী করে। কাঁধও রয়েছে, মাথাও রয়েছে, বাসও আছে। তাহলে বাঁধনটাকে হাতুড়ি মেরে দু-টুকরো করতে চাইছেন কেন? কাঁধটা মাথা থেকে সরাতে চাইছেন কেন?
আমি যে গাড়ি কিনেছি।
অ বড়লোক হয়েছেন?
নল দিয়ে ছোড়া আলপিনের মতো বড়লোক শব্দটা প্যাঁক করে আঁতে এসে ফুটল। বড়লোক না হলে এত ছোট হলুম কী করে। প্রেম হল মধ্যবিত্তের জুয়েল। আর ভোগ হল বড়লোকের। বিড়ম্বনা। নিজের শরীরটার দিকে তাকাতে ঘেন্না করে। জল ভরা ভিস্তির মতো অশ্লীল। কামুকের চোখ। নেকড়ের থাবা। প্রেতের মতো নিঃসঙ্গ।
বিচারে বসেছেন, নামজাদা এক সাহিত্যিক। একটা সমাধানের রাস্তা তিনি খুঁজে বের করতে চাইছেন। মামলাটা ঝুলে আছে বেশ কিছুকাল। এর মধ্যে আমি অনেকটা উঠেছি। একতলার এঁদো বাড়ি ছেড়ে সাত তলায় উঠেছি। আকাশের কাছাকাছি। উত্তর, দক্ষিণ, পুব, পশ্চিম সব খোলা। খিদিরপুরের জাহাজ, মাস্তুল খাড়া, দমদমের প্লেন নামা, গল্ফগ্রিনের টি টি মাস্তুল, সব দেখা যায়। অনেক আলো, অনেক বাতাস, ঝড় এলে সব দক্ষযজ্ঞ। আমি এখন ভালো খাই, ভালো পরি। তবে, সত্যিই উঠেছি, না পড়েছি, ঠিক বুঝতে পারি না। অন্ধকারের বাণিজ্য, অন্ধকারের টাকা। লালুদা, ভুলুদাদের রাজনৈতিক উপদ্রব। কষে বেল্ট বাঁধা, উর্দিপরা, ঘর্মাক্ত আইনের প্রভুদের নিত্য নৈবেদ্য, প্রেমহীন দেহসেবা। আমি লোকটা নষ্ট হয়ে গেছি একেবারে।
সাহিত্যিক বিচারক বলছেন, শুনতে পাচ্ছি, এই উথালপাতাল ভাবনার মধ্যেও বুঝলেন, প্রথম বিয়েটাই বিয়ে, পরের সব তাপ্পি। কাপের হাতলটা ভেঙে গেলে সেটা আর কাপ থাকে না, হয়ে। যায় গেলাস। বাইরে বড়লোক হলেও, ভেতরে একটু গরিব হওয়ার চেষ্টা করুন না। আপনার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে দেখেছেন?
তাকাতে পারিনি, কারণ, বিবেকটাকে কিছুতেই খুন করতে পারছি না। সে যে মনের কোন করে বসে আছে জানি না। যেই একা হই সঙ্গে বেরিয়ে আসে। বৃদ্ধ পিতার মতো, বৃদ্ধা মাতার মতো। ছানি পড়া, মৃত মাছের মতো চোখ। কেবল তাকিয়ে থাকে। বলে না কিছুই। আর তখনই আমি নিজেকে নিজেই বলতে থাকি, থাকবে না কিছুই। প্রোমোটারের তৈরি বাড়ির মতো হঠাৎ একদিন ভেঙে পড়বে।
মাধুরীর দিকে তাকালুম। রোগা হয়েছে। আগের সেই রং নেই। চুল কমে গেছে। মুখের আদল শক্ত হয়েছে। কষ্টে আছে, অভাবে আছে, আগুনে আছে। দশ বছর আগের সেই রাত ফিরে। আসছে। মন্দির, আরতির শঙ্খঘণ্টা, আলোছায়া, গঙ্গার জলের শব্দ, ব্রিজের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়া। গরম শিঙাড়ার দাঁতে ধরা অংশের ফিকে ধোঁয়া, পেছন থেকে দেখা খোঁপা, কাঁধ, পিঠ, ব্লাউজের ভি-কাট। একটু প্রেম, একটু কাম।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লুম। মাধুরীর হাতটা ধরে বললুম, ‘ওঠো!’
সাহিত্যিকের দিকে তাকিয়ে বললুম, ‘লাস্ট টার্মিনাস’ পর্যন্তই যাব।
—খুলে যাবে না তো!
–খোলার চান্স নেই, টিল ডেথ ডু আস পার্ট। কে কখন নেমে যাব, সেটা বলি কী করে। কার কাছে কত দূরের টিকিট, সে আমিও জানি না, ও-ও জানে না!
শেষ কথা
জমিদার বাড়ির গঙ্গার ঘাট। তেমন তো কেউ সরে না। সাবেক কালের বাঁধন আলগা হয়ে এসেছে। পইঠের কিছু কিছু হেলে গেছে। এইবার যে-কোনও দিন জোয়ারের গাঙ্গে গা ভাসিয়ে দেবে। সরকারি বাঁধন আইন মোতাবেক দুপাশ দিয়ে চলে গেছে। সে আরও বিপজ্জনক। ঘাটের সীমানা ছাড়িয়ে জলের তলায় কোথায় কী হয়ে আছে ওপরের কল্লোলিনী স্রোতধারা দেখে বোঝার উপায় নেই।
যতটা সম্ভব সাবধানে অমল ডান পা জলে বাড়াল। পানীচের দিকে নামছে তো নামছেই। নতুন বছর আজ শুরু হল। সাল দু-হাজার একের কোল ছেড়ে দুইতে পা রাখল। উত্তর থেকে। হাড়কাঁপানো হি হি বাতাস বয়ে আসছে। সোজা এসে হৃদয়ে ধাক্কা মারছে। ঠান্ডার অনুভূতি অমল ভুলে গেছে। দেহের সঙ্গে মনের আর যোগ নেই। কী শীত, কী গ্রীষ্ম। কোথায় হাত, কোথায় পা! একবারই কেবল মনে হল পাকি মাটি স্পর্শ করবে না। বাঁ-পা ঘাটের পইঠেতে, ডান-পা নেমে চলেছে, অতলে, এর পর দেহের ভারসাম্য রাখাই মুশকিল হবে। ভাঁটার টানে। তরতর করে বয়ে চলেছে গঙ্গা। কাঠ, কুটো, ফুল, পাতা, আবর্জনা সবই ভেসে চলেছে সাগরের দিকে। সময়ের ভাঁটিতে ভেসে চলা জীবনের মতো। আজ চলেছে কালের দিকে।
হঠাৎ পা ঠেকে গেল ভাঙা ইটের স্তূপে। শহরের সভ্য মানুষ। খালি পায়ে চলার অভ্যাস নেই। বড় সুখী পা। এবড়ো-খেবড়ো ইটের খোঁচায় মনে মনে উঃ করে উঠল। এই প্রথম বুঝল, মন দেহেই আছে। দেহবোধ অত সহজে যায় না। ক্ষণিকের তরে হয়তো যায়। ফিরে আসে আবার, বাসায় ফেরা পাখির মতো।
অমল টাল খেয়ে পড়ে যাওয়ার মতো হচ্ছিল। ঘাটের একেবারে উঁচু ধাপে উবু হয়ে বসেছিল প্রবীণ কুলপুরোহিত চন্দ্রকান্ত সরস্বতী। কুশের অঙ্গুরীয় পাকাতে পাকাতে তিনি অমলের দিকে নজর রেখেছিলেন। চিৎকার করে বললেন, সাবধান, সাবধান, তাড়াহুড়ো কোরো না। ধরে ধরে নামো, ধরে ধরে নামো। এখন কেটেকুটে যাবার খুব সম্ভাবনা।
