কস্তুরিকাচনলেপনায়ৈ
শ্মশানভঙ্গবিলেপনায়
সকুন্তলায়ৈ ক্ষণিকুন্তলায়।
বাঁ-দিকে কস্তুরিকাচন্দনলিপ্ত গৌরী, ডান দিকের শরীর শ্মশানের ছাই মাখা, বাঁ দিকের সুন্দর খোঁপা, ডান দিকে সাপের কুন্তল। কলকাতার বাসের কী বাহাদুরি ক্ষমতা! বাড়িওলা, ভাড়াটে, সিপিএম, কংগ্রেস কিছুক্ষণের জন্যে হলেও, হলাহলি, গলাগলি। কোলাকুলি অবস্থাতেই বলছে বউকে বিধবা করে দেব। পাদানিতে যার পায়ের ওপর পা রেখে হাঁচোর-পাঁচোর ঝোলো, তার সঙ্গেই পাঁয়তাড়া। বহু আগেই বাঙালির এই স্বভাব ধরা পড়েছে প্রবাসে—যার শিল যার নোড়া তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া। আমিও তো সেই বাঙালির বাঙালি।
বাস যত টার্মিনাসের দিকে এগোচ্ছে ততই হালকা হচ্ছে। কাঠের মেঝে, টিনের ছাত, উলটোদিকের আসন, যাত্রী দেখা যাচ্ছে। আর তখনই আমার ভয় বাড়ছে। চলমান গণ-আদালত বিচারে নামলেই হল। মাথাটা যারই হোক, কাঁধটা তো তোমার! মানুষ না মরা পর্যন্ত কাঁধ দেওয়াটা অপসংস্কৃতির মধ্যে পড়ে। অতিশয় অপকর্ম।
অতএব আমি এমন সহজ ভাব করছি, যেন স্বামী-স্ত্রী, হনিমুনে আছি। দণ্ডায়মান এক সরল মানুষ বলেই ফেললেন, আপনার স্ত্রী খুব ক্লান্ত। এই সময়টায় অমন হয়। আয়রন টায়রন খাওয়ান, সঙ্গে জিঙ্ক। লোহা আর দস্তা না খেলে ধস্তাধস্তি করবে কী করে! এই সময়টা মানে! প্রায় প্রবীণ মানুষটি কী বোঝাতে চাইছেন! একটু বোঝার চেষ্টা করেই মনে মনে আধ হাত জিভ কাটলুম। আমি যত।
এগিয়েছি, ভদ্রলোক তার চেয়ে তিন, চার বছর এগিয়ে গেছেন। একবার আড়-চোখে বাঁ পাশে তাকালুম। কী গভীর, নিশ্চিন্ত নিদ্রা! হয়তো স্বপ্নও দেখছেন। রাজবাড়িতে সানাই বাজছে। বড় বড় রাজহাঁস ঘুরছে।
আমার স্টপেজ এসে গেছে। দশ মহাবিদ্যালন্ড্রি, অবলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। আমার নাম হল না। কাঁধে যে দায়িত্ব নিয়েছি, সেই দায়িত্ব না নামাতে পারলে মুক্তি নেই। কিছু নামল, কিছু উঠল। বাস চলল। নিজের জায়গাটা ঘোঁত-ঘোঁত করে পেছনে চলে যাচ্ছে দেখে মন ছটফট করল। তবু বসে রইলুম। খোঁটায় জড়িয়ে গেছে ঝুমকো লতা। খোঁটা কি আর সরতে পারে!
টার্মিনাস প্রায় এসে গেল। কেউ আর দাঁড়িয়ে নেই। যে ক-জন বসে আছেন, বসে আছেন। সকলের মুখের ওপর দিয়েই অপরাধীর মন নিয়ে চোখ ঘোরালুম। কোনও মুখেই কোনও সন্দেহ নেই। সকলেই ধরে নিয়েছেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী। স্ত্রী ছাড়া এমন নির্ভয়ে প্রকাশ্য স্থানে পুরুষের। কাঁধে মাথা ফেলে কে ঘুমোতে পারে! হিন্দু বিবাহ ব্যবস্থাই শিবের সংসার রচনার পথ করে দেয়। স্বামী-স্ত্রী হরগৌরী।
এই সব ভাবতে ভাবতেই টার্মিনাস এসে গেল। সবাই দুমদাম নেমে গেলেন। তখনও ঘুম ভাঙেনি। আস্তে আলতো হাত মাথায় রেখে নাড়া দিলুম। শুনছেন, বাস শেষ হয়ে গেছে।
মাথাটা তড়াক করে কাঁধ ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। ভাগ্য ভালো কন্ডাক্টার সায়েব সব আলো নিবিয়ে দেননি। একটা আলো নাইট লাম্পের মতো জ্বলছিল।
হতচকিত মেয়েটি জিগ্যেস করল, এটা কোথায়!
লাস্ট টার্মিনাস।
সে কী, আমি তোদু-স্টপেজ আগে নামব।
আপনি দু-স্টপেজ। আর আমার যে পাঁচ স্টপেজ আগে নামার কথা। আপনার মাথা ফেলে নামতে পারিনি।
ছিঃ ছিঃ। অ্যান্টি অ্যালার্জিক খেয়ে আমার এই অবস্থা! কিছু মনে করেননি তো!
কিচ্ছু না।
দুজনে নেমে এলুম। আর একটা বাস ধর্মতলায় যাওয়ার জন্যে তৈরি। আলো, লোক, ঘণ্টা, চিকার।
চলুন ওইটায় উঠে পড়ি।
মেয়েটি বলল, আজ মঙ্গলবার, এতদূর যখন এসেই গেছি, দক্ষিণেশ্বরে মাকে একবার দর্শন করে যাই।
আমাকে আপনার সঙ্গে নেবেন!
কথাটা বোমা ছোড়ার মতো দুম করে বলে সিঁটিয়ে রইলুম। কীভাবে ফাটে, কতটা শব্দ হয়! সে বললে—মায়ের কাছে সবাই যেতে পারে। চলুন না।
হাঁটছি দুজনে পাশাপাশি। প্রথমে অ্যালার্জির কথা হল। কেন অ্যালার্জি, কী অ্যালার্জি। তারপরে নিত্য যান-যুদ্ধের কথা। তারপর চাকরির কথা। ক্রমশই সহজ হচ্ছি। মন্দিরের প্রবেশ পথে প্রায়। অন্তরঙ্গ যেন কত কালের পরিচয়। যেন ওই সুন্দর মাথাটা আমার কাঁধের জন্যেই তৈরি। ওই লম্বা লম্বা আঙুল আমার মুঠোয় ধরার জন্যেই। একজন প্রেমিকের যা যা ভাবা উচিত, আমি তাই ভাবছি। সামনে সে, একটু পেছনে আমি। তরতর করে হাঁটছে। সাহসী পদক্ষেপ। আত্মনির্ভর। ন্যাকা ন্যাকা, থ্যাসথেসে নয়। বাতাসে আঁচল উড়ছে। সার সার দোকানের আলোয় সে হাঁটছে। পৃথিবীটা বেবাক স্বপ্ন হয়ে গেল। কোথায় ডালহৌসি, কোথায় আমার নোনাধরা দেয়াল, শ্যাওলা ধরা কলতলা, কোথায় রাজপথের সংগ্রামী মিছিল, কোথায় সেই প্রবীণদের নিত্য প্যানপ্যানানি, মানুষ বাঁচবে কী করে, যা দিনকাল। ওসব চুলোয় যাক। ওমর খৈয়াম ভেতরে এসে পড়েছেন—
আজ ফাগুনের আগুন-জ্বালে
হুতাশ-বোনা শীতের বাস
পুড়িয়ে সে সবে ছাই করে দাও
দাও আহুতি দুখের শ্বাস!
আয়ু-বিহম—খোঁজ রাকো কি
মেলিয়া ডানা উড়ল হায়,
পেয়ালাটুকু শেষ করে নাও
এক চুমুকেই ফাগুন যায়।।
আরতি শুরু হয়ে গেছে। নাটমন্দিরে লাইন। আমার সামনে সে, পেছনে আমি। ভবতারিণী সামনে ঝলমলে। মানুষের কাণ্ড দেখে জিভ কেটে হাসছেন। আমি মা দেখছি, খোঁপা দেখছি। আমি মা দেখছি, ঘাড় দেখছি। মা দেখছি, কাঁধ ঢালু চওড়া পিঠ দেখছি। আমি মা দেখছি, ব্লাউজের পেছনের হুক দেখছি। মনের এমন একটা অবস্থা হল, স্থান, কাল বোধটাই চলে গেল। মনে হতে লাগল, আমরা বহুদিন বিবাহিত। কোথাও আমাদের একটা প্রাচীন সংসার আছে, কোনও বটতলায়। বেড়া আছে, গাছ আছে, তুলসীমণ্ডপ আছে, ছাগল আছে।
