এদিকে-সেদিকে অল্প স্বল্প কেটে-ছড়ে গেছে। ও যাবেই। বাস তো আর ভেলভেট দিয়ে মোড়া যাবে না! আজও বসেছি এইটাই এক মহা সাফল্য। আমার বাঁদিক থেকেই মহিলামহলের শুরু। একটি মেয়ে বসে আছে। মহিলা বা রমণী নয়, ভারী সুন্দর একটি মেয়ে। আড়চোখে এক লহমার তাকানো। ওর বেশি—অভদ্রতা। ড্যাব ড্যাব করে তাকাতে নেই। মনে মনে তাকাও। অ্যায়সা। চাপ এপাশ থেকে ওপাশ থেকে, মেয়েটির কাঁধে আমার কাঁধ ঠেকে গেছে। ওপর বাহুতে ঠেকে গেছে ওপর বাহু। বাসে এমন হয়। কিছু মনে করতে নেই। কত বয়েস! কুড়ি হতে পারে, পঁচিশ হতে পারে, না, তিরিশ কখনই নয়। তিরিশে শীত আসে। এ বসন্ত।
বাসে গাদাই হচ্ছে শয়ে শয়ে লাশ। খ্যাঁও ম্যাঁও। কথার টেনিস। নুড়ি পাথর। সামনেটা হয়ে গেল দুর্ভেদ্য চাইনিজ ওয়াল। আমার বাঁ-পাশে বসন্ত, ডান পাশে একটা পিপে। নাক দিয়ে ভসভস হাওয়া ছাড়ছেন। লাংস তো নয় হারমোনিয়ামের বেলো। মাঝে মাঝে গ্রাউন্ড ফ্লোর থার্ড ফ্লোর ঢেকুর। বুঝেছি পার্টির পয়সার বিরিয়ানি হয়েছে।
সুইচ অফ করে দিলুম। বাসযাত্রী, ট্রেনযাত্রীদের তাই করতে হয়। দেহ থেকে নিজেকে তুলে নিতে হয়। কলকাতার বাস নামক মর্গে লাশটা আছে, মন চলে গেছে লাস ভেগাসে। মনকে অত দূরে পাঠাতে হল না। বাঁদিকে ঠেলে দিলুম। কাঁধ থেকে ওপর বাহু। কোমল, শীতল, অনুকম্পার মতো। চোখ বুজে ফেললুম। রোজ যা করি। সহযাত্রীদের দেখতে চাই না। ধূর্ত মুখ, বোকা মুখ, সন্দেহবাদী মুখ, নিরীহ মুখ, বড় দাঁত, ভাঙা দাঁত, মরা চোখ, উগ্র চোখ। চোখ বোজানো মাত্র সব অদৃশ্য। মাংসের পাঁচিল, ফারনেসের উত্তাপ, শব্দের ককটেল, ভ্যাপসা গন্ধ। অমৃতের পুত্ররা দলা পাকিয়ে চলেছে। ইঞ্জিনের আর্তনাদ শোনা গেল। সামনের আর পেছনের কন্ডাকটার একই সঙ্গে বাসের লোহার চাদরে গোটা দুই চাপড় আর কয়েকবার ঘণ্টা টেনে যাত্রা শুরু করলেন। দু পাশের ফুটবোর্ডে পাকা ফলের মতো মানুষ নয় ভোটার ঝুলছে। ডান বাঁ সব কদমা হয়ে গেছে। পায়ে পায়ে কাঁচি চলছে।
টার্মিনাস চক্কর মেরে বাস রাস্তায় গিয়ে পড়ল। একটু যায় একটু থামে। কখনও গাড্ডায়, কখনও সমতলে। গেল, গেল, সামাল সামাল। দণ্ডায়মান পাঁচিল কখনও হেলে ফর্টিফাইভ, কখনও নাইনটি। ম্যালেরিয়া থাকলে কুলকুল ঘামে ছেড়ে গেল। অতীতের পাপ এক পোয়া কমল। নরকের কম্পিউটারে মেয়াদ মাইনাস হল। স্বর্গে ফিক্সড ডিপোজিটে কিছু যোগ হল।
পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ, এক, দেড়, দুই লেগে যেতে পারে। দমদম থেকে দিল্লি চলে গেল, ধর্মতলা থেকে দক্ষিণেশ্বর পৌঁছোল না। গাঁটের পর গাঁট। তবে বাঁ দিকের কথা ভেবে মনে হল, এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত! এই হঠাৎ পাওয়া অনুভূতি। এ তো অসভ্যতা নয়, অবস্থিতি। অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল!
যাঁরা ইনসোমনিয়ায় ভুগছেন তাঁরাও যদি বাসে বসতে পান তো ঘুমিয়ে পড়েন। ঘুমের ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন নেই। বেড়া টপকানো ভেড়া গোনারও প্রয়োজন নেই। আমার ডান পাশের বস্তাটি ঢুলতে শুরু করেছেন; কিন্তু আমার বাঁ পাশেকী হচ্ছে! শরীরের সঙ্গে সেঁটে থাকা হাতটা আরও কোমল হয়ে উঠছে। গরমে নরম হয়ে আসা আইসক্রিমের মতো। মেয়েটির দেহভার আমার শরীরের ওপর ক্রমশই বাড়ছে। মাথাটা আমার কানের কাছে চলে এসেছে। চুল সুড়সুড়ি দিচ্ছে। মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে নাকে। আড়ে তাকালুম। ঘুমিয়ে পড়েছে, যাকে বলে ঘুম কাদা। মাথা নামছে আমার বাঁ কাঁধের দিকে। ভয়ংকর কাণ্ড। পাবলিকের সামনে। ধাক্কা মারতে পারছি না। পাশের বস্তাটাকে ইতিমধ্যে দু-একবার মেরেছি। কাজ হয়নি কিছু। মেয়েটির বেলায় যে কারণে পারছিনা, তা হল ধড়মড় করে জেগে উঠে যদি বলে, অসভ্য। যদি বলে, কাঁধটা কেন এগিয়ে দিয়েছেন, বদ মতলব। তারপর গণধোলাই! দ্বিতীয় কারণ, খুব মায়া হচ্ছে। কোন অফিসে কী কাজ করে তা তো জানি না, হয়তো খুব খাটায়। কতই বা মাইনে দেয়। ভালোমন্দ কী-ই বা খেতে পায়! ক্লান্ত, শ্রান্ত হয়ে ঢুলে পড়েছে। কে-ই বা একটু স্নেহ করে, কে-ই বা ভালোবাসে! দশভুজা সংসার কেবল দেহি দেহি করছে—টাকা দাও, সেবা দাও। মেয়েটিকে আমার খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করল। এক নজরে যা দেখেছি—অনেক চুল, ঝিনুকের মতো কপাল, সুন্দর নাক, ভুরু, চোখ। শান্ত মুখ। ভালোবাসার মতোই একটি মেয়ে। একটা ছেলে একটা মেয়েকে যদি ভালোবাসতেই না পারল তা হলে মাটির পৃথিবী পনপন করে ঘুরছে কেন, ফুলই বা ফুটছে কেন, নদীই বা বইছে কেন ইত্যাদি।
মেয়েটির মাথা আমার বাঁ কাঁধে নেমে পড়েছে। শুধু পড়েইনি, বেশ জুতসই ভাবে চেপে বসেছে। চুলে ভরা সুন্দর একটি মাথা। কাঠ হয়ে চোখ বুজিয়ে আছি। নট নড়নচড়ন, নট কিছু। তিনটে কারণ। প্রথম কারণ, পাবলিক। পরস্ত্রীকাতর, পরস্ত্রীকাতর। একজন একটু সুখে আছে দেখলেই বাগড়া দেবে। নিজে খাবে না অন্যকেও খেতে দেবে না। বললেই হল, কাঁধে মাথা পড়েছে, ঠেলে তুলে দিন। বসে বসে মজা মারছেন। খুব রস, তাই না! যেন নিজেদের চোখে বালি পড়েছে! দ্বিতীয় কারণ, দোলাদুলি করলেই ঘুম ভেঙে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে মাথাটা তুলে নেবে। অবশ্য এ-ও জানি, আবার চুল আসবে, আবার মাথা হেলবে, আবার কাঁধে আসবে। মাঝের এই বিরতিটা আমি চাইছি না। বাসে নিত্য যাওয়া-আসা করতে করতে চুল সম্পর্কে আমি যথেষ্ট গবেষণা। করেছি। রাজনীতির মতে এতেও ডান বাঁ আছে। কেউ ডাইনে হেলেন, কেউ বাঁয়ে। মেয়েটি দক্ষিণপন্থী। তৃতীয় কারণ, মেয়েরা নিজেদের দোষ অন্যের ঘাড়ে চালান করে দিতে একখানি। চাং করে জেগে উঠেই বলতে পারে, আপনার কাঁধ আমার মাথায় কেন! কিছুতেই বোঝাতে পারব না, মাথায় কাঁধ থাকতে পারে না, কাঁধেই মাথা থাকে। মাথাই ঢোলে, কাঁধ ঢেলে না। দেহের কনস্ট্রাকশানটাই এমন! একমাত্র ব্যতিক্রম পায়ের জুতো। সময় সময় মাথায় ওঠে, গালেও। উঠতে পারে। আমার এক সহপাঠীর যেমন হয়েছিল। দোলের দিন রঙের আবেগে পাড়ার একটি মেয়েকে বলেছিল, দোয়েল, আই লাভ ইউ। বেরসিক দোয়েল দাঁড়কাকের মতো গলায় বলেছিল, তোমার মুখে জুতো। তারপর স্যান্ডেল খুলে পটাপট। সেই থেকে আমার সেই বন্ধুর নাম হয়ে গেল, স্যান্ডেল। সে এখন আমেরিকায়। এক মেক্সিকান সুন্দরীকে বিয়ে করে মহাসুখে আছে। আমি যেন যোগাসনে ধ্যানে বসে আছি অর্ধনারীশ্বর। ডানদিকটা পুরুষ, বাঁ দিকটা রমণী। হরগৌরীর শহর সংস্করণ। শঙ্করাচার্যের হরগৌরী অষ্টকের একটি-দুটি স্তবক মনে পড়ছে। আধখানা শিব আধখানা শিবানী।
