আমার প্রায় প্রেমে পড়ে যাবার মতো অবস্থা। ভবা পাগলার নাম শুনেছ? আমি এক প্রেম পাগলা, এই করেই আমার বউয়ের প্রেমে পড়ে জীবনটা নষ্ট করেছি। মৃগাঙ্ক হতে হতেও হওয়া হল না। সংসারের ম্যাঁও সামলাতে সামলাতেই ঘাটে যাবার সময় হয়ে গেল। প্রবীণা এক মহিলা বললেন, ‘সীমা, ভদ্রলোককে ওই ওপরের থাকের শাড়িগুলো দেখাও।’ চালাকিটা পরে বুঝলুম। আমাকে অপদস্থকরার জন্যে সবচেয়ে দামি শাড়ি একের পর এক নেমে এল। সাড়ে চারশো, সাতশো, সাড়েনশো।
আমি বললুম, ‘আর একটু কম দাম?’
‘এ দোকানে কম দামের শাড়ি রাখা হয় না।’
আমি সেই ক্ষয়া চাঁদের চোখের বাণে কাবু হলে কী হবে, তিনি আমার খাড়া নাকের আভিজাত্যকে মোটেই সমীহ করলেন না। আমি প্রায় মরিয়া হয়েই, সাড়ে চারশো দামের একটা শাড়ি কিনে ফেললুম। তখনও আর একজনের ওপর বদলা নেওয়া বাকি ছিল। ওই সেই দ্বারপাল। শাড়ির প্যাকেট বগলে নিয়ে আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। আমি আগেই দেখে রেখেছিলুম, সে পাইপকে উঠে দাঁড়িয়ে, দরজা খুলে সেলাম করেছিল।
বললুম, ‘গেট আপ।’
লোকটি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। ধমকের সুরে বললুম, ‘গেট আপ।’
তখন আমার সংহার মূর্তি। উর্দি উঠে দাঁড়াল।
‘দরওয়াজা খোলো।’
দরজা খুলে ধরল। তখনও তার আর একটা কাজ বাকি।
‘স্যালুট। সেলাম বাজাও।’
সেলাম করল। আমি সেই পাইপ দাদার মতো গ্যাটম্যাট করে বেরিয়ে এলুম। লোকটা মহা শয়তান। আমার শরীরটা পুরো বেরোবার আগে, দরজাটা ছেড়ে দিল। কড়া প্রিং। দুম করে দরজাটা আমার পায়ের গোড়ালিতে ধাক্কা মারল। মারুক। আমি আমার পাওনা আদায় করে নিয়েছি।
এত এত বড় একটা ভণিতার কারণ, আমার দুঃখ। লোকটাকে কেউ সামান্যতম পাত্তা দেয় না। না বাড়ির লোক, না বাইরের লোক। কেন? কারণটা কী? এক জ্যোতিষীকে বলেছিলুম, ‘একবার দেখুন তো মশাই, হরোস্কোপটা। কোথায় কোন গ্রহ এঁকে-বেঁকে আছে।’
অনেক অঙ্কটঙ্ক কষে তিনি বললেন, ‘আপনার রবিটা খুব ড্যামেজ হয়ে আছে, যে কারণে চামচিকিতেও আপনাকে লাথি মারবে। মটরদানার মতো একটা হিরে পরুন।’ হিরে পরব আমি! আমি কি মৃগাঙ্ক? দশ, বারো, চোদ্দো, কত হাজার পড়বে কে জানে! মারুক চামচিকিতে লাথি। যাক, যে কথা বলছিলুম, মিনি থেকে নেমে আমাকে এ-দোকান, সে-দোকান ঘুরে ঘুরে জিনিস কিনতে হবে। কেরোসিন কুকারের পলতে, চিড়ে, ছোলা, বাতাসা, বাদাম, মাথাধরার ওষুধ, সেজের চিমনি, মুরগির ডিম, পুজোর ফুল। কেনাকাটার কোনও মাথামুণ্ডু নেই। নিতান্তই। মধ্যবিত্তের জিনিস। মৃগাঙ্কর প্যাটিস-পেস্ট্রি নয়। আর সবই বিপরীতধর্মী জিনিস। ফুলের সঙ্গে ডিম ঠেকবে না। বাসায় চাপ পড়বে না। চিমনি চাপ সইবে না। এ সবই আমার প্রেমের। বউয়ের কারসাজি। রোজই এমন সব জিনিস আনতে বলবে, মানুষের দু-হাতে ম্যানেজ করা অসম্ভব। দশটা হাত, দশটা মুণ্ডু হলে যদি কিছু করা যায়। এ সংসারে রাম হলে কপালে বনবাস। রাবণ হতে হবে। রাজ্যপাট, লোভনীয় পরস্ত্রী সবই তখন সম্ভব। রাম হলে ভোগান্তি। রাবণ হলে ভোগের চূড়ান্ত। দু-হাতে বুকের কাছে সব পাকড়ে ধরে বাড়িমুখো হাঁটতে হাঁটতে বলি, ‘আই অ্যাম এ ডিগনিফায়েড ডঙ্কি।’ ফাইনাল খেলা শুরু হয় বাড়ির সামনে এসে। রবি নীচস্থ হলেও মঙ্গল আজ মনে হয় তুঙ্গী। বরাতে বাড়ি মোটামুটি ভালোই জুটেছে। সামনে একটু বাগান মতো আছে। গেট। গেট থেকে সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা সোজা সদরে। আমার বউয়ের এদিক নেই ওদিক আছে। নিজে পায় না খেতে, শঙ্করাকে ডাকে। লোমলা ফুটফুটে কুকুর কিনে এনেছে। তিনি যেন গৃহদেবতা। তাঁর সেবার শেষ নেই। তিনি সকালে চুকচুক করে আধবাটি দুধ খাবেন। নিজে খাই, না খাই ডেলি একশো গ্রাম ক্রিম ক্রাকারবাঁধা। ঝড় হোক, জল হোক, রাষ্ট্রবিপ্লব হোক, এমনকী অ্যাটম বোমা পড়লেও ডেলি দুশোগ্রাম কিমা। মাসে ডাক্তার, বদ্যি, ওষুধ-বিষুধের পেছনে অ্যাভারেজ—পঞ্চাশ টাকা। নিজে অসুস্থ হলে পড়ে থাকা যায়। কেউ গ্রাহ্যই করবে না। তুমি ব্যাটা মরে ভূত হয়ে যাও, কিছু যায়-আসে না। ঘটা করে শ্রাদ্ধ করে, পাসবই নিয়ে ব্যাংকে ছুটবে। আকাউন্ট ট্রান্সফার করবার জন্যে। তুমি তো আমার লোমওয়ালা বিলিতি কুকুর নও। হিন্দি ছায়াছবিতে যেমন গেস্ট আর্টিস্ট থাকে, আমাদের সেইরকম গেস্ট কুকুর আছে। সে আবার আর এক ইতিহাস। কে বলে ইতিহাসে ইতিহাসে কেবল রাজারাজড়া? সাধারণ মানুষের জীবনে কম ইতিহাস? বছর দশেক আগে এক বর্ষার রাতে রাস্তার লালু এসেছিল বারান্দায় আশ্রয় নিতে। সেই লালু হয়ে গেল গেস্ট। লালুর চারটে বাচ্চা হল। কান্নু আর গুগলু বড় হল। তাদের হল চারটে চারটে আটটা। তিনটে গেল, রইল পাঁচটা। সে এক জটিল হিসেব। তবে এখন যা অবস্থা, পিলপিল করছে কুকুরে। রাতে কানে তুলো খুঁজে দরজা-জানলা বন্ধ করে শুতে হয়। মিনিটে মিনিটে ডাক। প্রথমে একটা ডাক, তারপর আর ক’টা কোরাসে। শুরু হলে আর থামতে চায় না, সভাপতির ভাষণের মতো। আমার বউ বলবে, ‘কী আশ্চর্য! কুকুর ডাকবে না? ডাকবে বলেই তো দেড় কেজি চালের ভাত খাওয়াই।’
‘বাঙালির বাত, কুকুরের ডাক।’ বেশ বাবা। তাই তোক। তা কিন্তু হল না। মালকিন নিজেই এবার কুকুরের ওপর খাপ্পা। কুকুরেরা খেলা পায়। খেলার আনন্দে তারে ঝোলা শাড়ি ছিঁড়ে ফালা-ফালা করেছে। দরজার পাপোশ আঁচড়ের-মেটেরিলাল করে দিয়েছে। এই সব অপকর্ম যদিও বা সহ্য। হল, হল না সেই মারাত্মক অপরাধ। গেস্ট আর্টিস্টরা একদিন বাড়ির লোমওয়ালা হিরোকে বাগে পেয়ে খাবলে দিল। এখন নিয়ম হয়েছে, যে-ই আসুক আর যে-ই যাক গেট বন্ধ করতে হবে। সে ও আবার এক ইতিহাস। লোয়েস্ট কোটেশানের লোহার গেট। লোহা নামে সরু কতকগুলো সিক সরু পার্টির ফ্রেমে ঢালাই করা। বাতাসে ম্যালেরিয়া রুগির মতো কাঁপে।
