খোকন ছিল মৃগাঙ্কের বাল্যবন্ধু। এখন কোথায় আছে, কে জানে!
মৃগাঙ্ক বলবে, বড়দিদুটো টাকা দিলে দু-টাকারই লেবু লজেন্স কিনব। যত সব ছেলেবেলার পরিকল্পনার কথা বলতে থাকে একে একে। বলতে বলতে একেবারে শিশুর মতো হয়ে যাবে। ঘুরে ঘুরে বারকতক নাচবে। তারপর বাথটাবের কলদুটো খুলে দেবে। তখন সে গণিতজ্ঞ। গরম। জলের ট্যাপ দু-প্যাঁচ মেরে, ঠান্ডা জলেরটায় মারবে ছ’-প্যাঁচ। তবেই সে ‘টেপিড ওয়ার্ম’ জল পাবে। বার্থটা ভরে গেলে জলে এক খাবলা নুন ফেলে দেবে। এই নুন তাঁকে গেঁটে বাত থেকে বাঁচাবে।
নুনটা গলতে মৃগাঙ্ক জোরে জোরে দম নিতে নিতে চেস্ট এক্সপানশান করবে। তারপর দেহটাকে সমর্পণ করবে বাথটবের জলে। ডান হাতের নাগালের মধ্যে দেওয়ালদানিতে বিলিতি সাবানের দুধসাদা কেক। মৃগাঙ্ক জল নিয়ে খুঁড়িতে থ্যামাক থ্যামাক করবে। ছোট ছেলের মতো নানা রকম শব্দ করতে থাকবে মুখে। তখন সে আর শিশু নয়। একেবারে সদ্যোজাত। ওঁয়া ওঁয়া করলেই হয়।
এই সময়টাকে মৃগাঙ্ক বলে, ‘মোমেন্টস অফ পিস অ্যান্ড হ্যাপিনেস’।
এইবার আমার কথায় আসি। আমি আর মৃগাঙ্ক সমবয়সি। কপালগুণে মৃগাঙ্ক গোপাল আর আমি কপালদোষে গরু। আমার গাড়ি নেই। আমার বাহন মিনি। আমি মিনিতে ধারের আসনে। আধঝোলা হয়ে বসব। দেখতে দেখতে খুদে যানের কুঁচকি, কণ্ঠা ঠেসে যাবে যাত্রীতে। আমাকে। উঁড়ি দিয়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরবে। ব্রহ্মতালুতে কনুই মারবে। মেয়েরা মাথার ওপর ভ্যানিটি ব্যাগ রাখবে। মাঝে মাঝে আঁচলে মুখ ঢেকে যাবে। একবার এক ভদ্রলোক আমার মাথায় নস্যির ডিবে রেখে নস্যি নিয়েছিলেন।
আমি ওইরকম আড়কাত হয়ে ঘণ্টাখানেক থাকব। জ্যাম থাকলে দেড় দু-ঘণ্টা। তারপর ধুপুস করে স্টপেজে নামব। কন্ডাকটার মাথায় চাটি মেরে টিকিট দেখতে চাইবে। আমার আকৃতিটাই এইরকম যে যে-ই দেখে সে-ই ভাবে, ব্যাটা একটা ছিচকে চোর। মেরে পালোনোর পার্টি।
চেহারায় কোনও আভিজাত্য নেই। বড় দোকান থেকে জিনিস কিনে বেরোবার সময় দরজার ধারে টুলে বসে থাকা দরোয়ান বিশ্রী গলায় বলবেই বলবে, ‘ক্যাশমেমো’। এহেন প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা আমি কোনওদিন ভুলব না। একদিন গ্র্যান্ড হোটেলের তলা দিয়ে লিন্ডসের দিকে হেঁটে চলেছি। আমার সামনে হাঁটছেন লম্বা চওড়া-সুটেড-বুটেড এক ভদ্রলোক। তাঁর ঠোঁটে বাঁকা করে ধরা একটি পাইপ। পাইপ থেকে ফিকে ধোঁয়া উঠছে। তিনি চলেছেন, আমি চলেছি। তিনি গ্যাট-ম্যাট করে, আমি খুড়স-খুডুস—যেন ঘোড়ার পেছনে গাধা। লিন্ডসেতে পড়ে তিনি বাঁয়ে বেঁকলেন। আমিও। তারপর আবিষ্কার করলাম দুজনেরই গন্তব্যস্থল এক। একই দোকানে। দোকানের কাচের দরজার সামনে দাঁড়াতেই দ্বাররক্ষক টুল থেকে তড়াক করে উঠল, সেলাম বাজাল, দরজা টেনে ধরল, পাইপ ঢুকে গেলেন। আর আমি যেই ঢুকতে গেলুম, দরজাটা সে ছেড়ে দিল, খাঁই করে আমার নাকের ওপরে। আমার শরীরের একমাত্র শোভা আমার পিচবোর্ডকাট নাকটি। আমার লম্বাটে মুখের ওপর খাড়া হয়ে আছে। যেন ওটা আমার নাক নয়, প্রক্ষিপ্ত। মহাভারতে গীতা যেমন প্রক্ষিপ্ত। ও নাক এ মুখের নয়। অন্য কোনও মুখের। অনেকটা নাকুমামার মতো। আমার স্ত্রী যখন আমাকে ন্যাকা বলে, তখন মনে হয় এই নাক দেখেই বলে। আমারও কিছু কিছু শুভার্থী বন্ধু আছেন, সবাই আমার শত্রু নন। সেইরকম এক বন্ধু বলেছিলেন, তোমার গাল দুটো দেবে যাওয়ায় নাকের স্ট্রাকচারটা অত ঠেলে উঠেছে। গাল দুটো সামহাউ একটু ভরাট করার চেষ্টা করো, তাহলে তোমার ওইমুখ যা দাঁড়াবে না! জেম অফ এ পিস। ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্য গলের মতো হয়ে যাবে।
তারপরে আবিষ্কার করলাম, গাল ভরাট করা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ। অনেকটা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মতো। পুকুর ভরাট করা যায়, চোয়াড়ে গাল ভরাট করা যায় না। ধার করে, দেনা করে ফ্যাট খাও, প্রোটিন খাও, খুঁড়িটাই বেড়ে গেল, খাবলা গাল, খাবলা গাল-ই থেকে গেল।
দোকানের দরজাটা ধাঁই করে নাকে লাগতেই সর্দি হয়ে গেল। আমি তো আর মুষ্টিযোদ্ধা নই। নাকে ঘুষি হজম করার শক্তি কোথায়? দ্বারপালকের ওপর রাগ হল। তার বয়েই গেল। আমার। মতো ফেকলুকে সে পাত্তা দেবে? ঠান্ডা, সুন্দর দোকানের ভেতর সেই সবাদৃত পাইপ। ঘুরে ঘুরে শাড়ি দেখছেন, কার্পেট দেখছেন, বিছানার চাদর দেখছেন। কী আগ্রহ নিয়ে দোকান-বালিকারা। তাঁকে দেখাচ্ছেন। তিনি মাঝে মাঝে পাইপচ্যুত হয়ে অল্প-স্বল্প মন্তব্য করছেন। আমাকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। বলছি, চাদর, বলছে ওই তো চাদর, দেখুন না। বলছি শাড়ি, বলছে এখানে। শাড়ির অনেক দাম। পাইপ সারা দোকান ওলটপালট করে দিয়ে শুধু হাতে প্রস্থান করলেন। মাঝে মাঝেই তাঁকে বলতে শুনলুম, দ্যাট মাই চয়েস, দ্যাটিস নট ফাইন, বেটার সামথিং। ভেবেছিলুম বড় খদ্দের যাবার পর ছোটটার দিকে নজর পড়বে। কোথায় কী! সুন্দরীরা নিজেদের মধ্যে গল্প শুরু করলেন। আমি তাঁদের সামনে কাউন্টারের উলটোদিকে গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলুম। মোটা সুন্দরী, ছিপছিপে সুন্দরী, রোগা সুন্দরী, ভুরুওলা সুন্দরী, ভুরু আঁকা সুন্দরী, খোঁপা সুন্দরী, এলো সুন্দরী। কত কী যে তাঁদের বলার আছে। মাধুরীদি স্বপ্নাকে কী বলেছে? সান্যালদাটা ভীষণ অসভ্য! ওরই মধ্যে একজন বলে ফেললে,…লাগে, একদিন ঝাড় খাবে। আমার রুচিশীল কান বললে, পালাও। পালাব মানে! সোজা ম্যানেজার। তিনি ছুটে এলেন…’তোমরা ভদ্রলোককে শাড়ি দেখাচ্ছ না কেন?’ স্লিম সুন্দরী আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বললে, ‘আহা, বোবা না কি? না বললে দেখাব কী?’
