ফুঁ দিলে খুলে যায়। ফলে ব্যবস্থা যা হয়েছে, তা অভিনব। অষ্টগন্ডা গাঁটওয়ালা, একটা দড়ি দিয়ে গেটটা বাঁধা হয়। বাঁধা সহজ। যে বাঁধে, সে বাঁধে। শ্যামল মিত্রের সেই গান, ‘ফুলের বনে মধু। নিতে অনেক কাঁটার মালা, যে জানে সে জানে, ভ্রমরা যাস নে সেখানে।’ খুলতে পিতার নাম ভুলিয়ে দেয়। গেঁটে বাতের মতো।
মৃগাঙ্ক যখন ফেরে তাকে রিসিভ করার জন্যে একটা ব্যাটেলিয়ান খাড়া থাকে গার্ড অফ অনার দেবার জন্যে। আমি তো আর মৃগাঙ্ক নই।
ছেলেবেলায় একটা ছবি দেখেছিলুম কোনও এক বইয়ে—দ্রোপদীর বস্ত্রহরণ। বুকের কাছে দু হাত দিয়ে দলা পাকানো কাপড় ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, আর রাজার পোশাক পরা গুঁপো একটা গুন্ডা, হয় দুঃশাসন না হয় দুর্যোধন আঁচল ধরে টানছে। আমাদের বাড়ির গেটের সামনে আমারও সেই অবস্থা। বুকের কাছে দু-হাতে জাপটে ধরা প্যাকেট-ম্যাকেট। কাঁধে সাইড ব্যাগ, সামনে গেঁটে বাত। গেটে দড়ি বাঁধা ম্যালেরিয়া গেট। আবার একটা গানের কলি, কেউ দেয়নি তো উলু, কেউ বাজায়নি শাঁখ। দু-হাতে যে বাঁধন খোলা যায় না, সেই বাঁধন খুলবে এক হাতে? আলিবাবা, চিচিংফাঁক মন্ত্র দাও। বলে না, ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়। কে বলে বাঙালির ফেলো ফিলিংস নেই! খুব আছে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কেউ না কেউ আমার সাহায্যে এগিয়ে আসে। আমি ভাবি কত ভাবেই না মানুষ রোজগার করতে পারে! আমার ফেরার সময় খোকন জেগে আছে। সেও এক ইতিহাস। খোকন খাঁড়ার বাবার ছিল সাবেক কালের বিশাল গোলদারী দোকান। প্রভূত পয়সার মালিক। পয়সা হল ভূত। ভূতে ধরলে মানুষের মতিভ্রম হয়। বড় খাঁড়া পর পর তিনটে বিয়ে করে ফেললেন। লোকে একটা বউয়ের হ্যাপা সামলাতেই হিমসিম খেয়ে যায়। সব হ্যাপিনেস, গাং গঙ্গায়ৈ নমঃ। বড় খাঁড়ার চুল উঠে গেল। মুখ ফুলে গেল। উঁড়ি বেড়ে গেল। আমরা ভাবতুম সুখে বড় খাঁড়া মোটা হচ্ছে। তা নয়, খাঁড়ার উদুরি হয়ে গেল। খাঁড়া মরে গেল। লোকে মরলে একটা বউ বিধবা হয়। খাঁড়া তিন-তিনটেকে বিধবা করে পগার পার। তারপর যা হয়, বিষয় বিষ। মামলা, মকদ্দমা, মারদাঙ্গা। গোলদারী ভুস। বড়পক্ষের ছেলে খোকন খাঁড়া। খাঁড়া হলে কী হবে, ধার নেই। পথে পড়ে গেল। কল্কে ধরলে। অন্যের কল্কে। ধরলে লোকের আখের ফেরে। নিজে কল্কে ধরলে সর্বনাশ হয়। খোকন এখন আধপাগলা। শুধু ধান্দা, কীভাবে গাঁজার পয়সা জোগাড় করা যায়। ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়।
সে আবার কী কথা! বলি সে কথা। ভগবান আমার জন্ম দিলেন। বয়েসকালে বাবরি চুল রেখে প্রেম করলুম। হ্যা হ্যা করে বিয়ে করলুম। ধারদেনা করে বাড়ি করলুম। পয়সার অভাবে লগবগে গেট করলুম। বিজ্ঞান হাতে তুলে দিল টিভি। প্রবাদ—যত হাসি তত কান্না, বলে গেছে রাম শর্মা। যত প্রেম তত ঘণা। আমার বউ টিভি দেখবে। আমি গরু খেটে ফিরব। দু-হাতে ফলটা মুলোটা। খোকন খাঁড়া সামনের বাড়ির রকে। সে নেমে আসবে মেসোমশাইকে সাহায্য করতে। বিনিময়ে পঁচিশ পয়সা। এক পুরিয়া গঞ্জিকার দাম।
একেই বলে কুকুর। আমার বউ আমার এই বেড়া টপকানোর খবর কিছুই জানতে পারবে না। পারবে লোমওয়ালা কুকুর। সে ঘেউ ঘেউ করবে। তাতেও আমার বউ উঠবে না। ভাগ্যিস ছেলেবেলায় ব্যাকে ফুটবল খেলেছিলুম। ডানপায়ে সদর দরজায় দমাদম লাথি। তখন দরজা খুলে যাবে। কুকুর ছুটে আসবে। দু-হাত তুলে নাচবে। চাটার চেষ্টা করবে। আর আমার বউ। হাসিমুখে অভ্যর্থনার বদলে, কি জিনিসপত্তর ধরে আমাকে খালাস করার বদলে একটি কথাই রুক্ষ গলায় বলবে, ‘গেটে দড়ি বেঁধেছ? যাও বেঁধে এসো।
মালপত্তর কোনওরকমে নামিয়ে, আমি গান গাইব। মনে মনে। বাঁধ না তরীখানি আমার এই নদীকূলে। একা দাঁড়িয়ে আছি লহনা কোলে তুলে। তারপর ছুটব। তলতা গেটে দড়ি বাঁধতে। ওই কাজটি করার কালে আমি দার্শনিক হয়ে যাব। মাথার ওপর মরুর আকাশ। মিটিমিটি তারা। আমার বাগানের কৃষ্ণচূড়ার ঝিরিঝিরি পাতা। অসংখ্য গাঁটওয়ালা একটা দড়ি, যেন হাতে ধরা। জপের মালা। এক-একটা গাঁট এক-একটা রুদ্রাক্ষ। আমি তখন সত্যি-সত্যিই তিন গাঁটে ওংকার জপ করব। পা বাড়ালেই পথ। আমি তখন গাইব প্রশ্নের মতো করে, ‘কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়?’ আমি কোনও উত্তর খুঁজে পাব না। মাথা নীচু করে ফিরে আসব। আমার কুকুর গাল চাটবে। মৃগাঙ্কর বিলিতি আফটার-শেভ লোশান আছে। সেটা থাকে শিশিতে। আমারও রয়েছে, একটু অন্যভাবে। বিলিতি কুকুরের জিভে। ভাবামাত্রই আমার মন মসৃণ। মধ্যবিত্ত মলিন বাথরুমে ঢুকে কল ছাড়ব, আর ছাড়ব আমার গলা—হারে রে রে রে তোরা দেরে আমায় ছেড়ে।
রহস্য
বাস এসে গেছে টার্মিনাসে। সবাই নেমে যাচ্ছেন। আমি আর আমার বন্ধু একেবারে পেছনের সিটে জায়গা পেয়েছিলুম। আমি নামার জন্যে হুড়োহুড়ি করছিলুম, আমার বন্ধু বলাই বললে, ‘চুপ করে বোস, অত হুটোপাটির কী আছে। সবাই নেমে গেলে ধীরেসুস্থে নামব।’ আমরা দু প্যাকেট চিনেবাদাম কিনেছিলুম। এখনও কিছুটা আছে। তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছি। মেজাজ খুব ভালো। সবে পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পরীক্ষা ভালোই দিয়েছি। বলাই একটু বেশি ভালো দিয়েছে, আমি একটু কম ভালো।
করুণাময়ীতে বলাইয়ের পিসিমা থাকেন, আমরা সেইখানে যাছি কয়েকদিন ছুটি কাটাতে। বড় পুকুর আছে, মাছ কিলবিল। বাগান বিশাল। আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল। ফুল! সে দেখার মতো। এত বড় ছাত যে ফুটবল খেলা যায়, ধাঁই ধাঁই। তিনখানা পিসতুতো ভাই। ঘুড়ি-লাটাই আছে। একেবারে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি একটা বাড়ি। পিসেমশাইয়ের জবরদস্ত একটা লাইব্রেরি আছে ডিটেকটিভ বইয়ে ঠাসা। আমরা খাব, বেড়াব, খেলব, পড়ব, গল্প করব, ঘুড়ি ওড়াব। আমরা রাজা হয়ে যাব ক’দিনের জন্যে।
