ব্রজ টাকে চুল গজায়?
কী জানি স্যার!
আমার গজাবে?
চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
ধুর, টাকে কখনও চুল গজায়? যা হয়ে যায়, তা হয়ে যায় এই হল দুনিয়ার নিয়ম।
ভোলানাথ হো হো করে হাসতে লাগলেন।
যার যেমন
আমি একটা মানুষ! আমার কোনও ইয়ে আছে? এই ‘ইয়ে’ শব্দটার কোনও তুলনা নেই। ‘ইয়ে’ টা যে ‘কিয়ে’ তা ব্যাখ্যা করা যায় না। ভেতরে অনেক না-বলা বাণী ঢুকে আছে। আমার কোনও ‘ইয়ে’ নেই। আমাতে আর মৃগাঙ্কতে অনেক তফাত। আমাতে আর অভিজিতে অনেক তফাত। মৃগাঙ্গ, অভিজিৎ, গজেন আলাদা আলাদা নাম হলেও একই ধরনের মানুষকে বোঝাচ্ছে। সফল মানুষ। জীবনে সফল। জীবিকায় সফল। ফুচকার মতো ভোগের জলে টইটুম্বুর হয়ে ভাসছে।
রোজ সন্ধেবেলা আমিও বাড়ি ফিরি। মৃগাঙ্গ কি গজেনও বাড়ি ফেরে। কত পার্থক্য। আকাশ পাতাল ব্যবধান। মৃগাঙ্কর গাড়ি বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। সিলভার গ্রে রঙের দোতলা বাড়ি। চারপাশে বাগান। বারান্দায় আইভি-লতা, উঁই। গেটের মাথায় লোহার অর্ধচন্দ্র। তার ওপর বোগেন হতে ভ্যালিয়ার আসর। যেন সানাই বাজাতে বসেছে, আলি আহমেদ খান। সামনে। বাগানে নানা রঙের গোলাপ, হাসনুহানা। যত রাত বাড়ে, রোমান্টিক ছোকরা থাকে, ততই গন্ধ বাড়তে থাকে। মৃগাঙ্কের লিপস্টিক-লাল গাড়ি বাড়ির সামনে থামামাত্রই চারজন ছুটে আসে— মৃগাঙ্কের মা, মৃগাঙ্কের বউ, মৃগাঙ্কের চাকর, মৃগাঙ্কর ধেড়ে ‘অ্যালসেশিয়ান’। ড্রাইভার দরজা। খোলামাত্রই পা বেরিয়ে আসবে, ঝকঝকে জুতো, কুচকুচে কালো মোজা, ধবধবে সাদা ডান পা কে অনুসরণ করবে বাঁ-পা। মৃগাঙ্ক নামক বিশেষ্যটি স্প্রিং-এর মতো নেমে আসবে। বেলুন। আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে গেলে যেরকম হালকা নাচে, মৃগাঙ্ক ঠিক সেইরকম অল্প একটু নেচে নেবে। পরিধানে রুলটানা সুট। বুকের ওপর টাই। চোখে বিলিতি ফ্রেমের চশমায় অভিমানী কাচ। পোলারাইজাড় গ্লাসের বাংলা অনুবাদ। কাচে রোদ লাগালে অভিমানে কালো হয়ে ওঠে।
মৃগাঙ্ক যখন প্রিং-এর মতো নাচছে তখন ড্রাইভার আর ছোকরা দুজন মিলে গাড়ির পেছন। হাতড়ে মালমশলা নামাতে ব্যস্ত। প্রচুর প্রচুর মশলানামে। রোজই নামে। প্রথমে নামবে একটা বাস্কেট। বেতের তৈরি সুদৃশ্য একটি ব্যাপার। মনে হয় ত্রিপুরা থেকে স্পেশ্যাল আমদানি। সাধারণ মানুষের হাতে অমন বস্তু সহসা দেখা যায় না। লন্ডন থেকেও আসতে পারে! কারণ। মৃগাঙ্কর সবই ফরেন। দিশি মালে অসম্ভব ঘৃণা। পারলে দিশি দেহটাকেও বিলিতি করে ফেলত। উপায় নেই। সে করতে হলে মরতে হবে। মরে টেমসের ধারে পিটার বা রবিনসের ঘরে জন্মাতে হবে। আবার নব ধারাপাত, প্রথম ভাগ দিয়ে জীবন শুরু করতে হবে। বাস্কেটে কী থাকে আমি জানি। থাকে লাঞ্চ বক্স, এক বোতল বিশুদ্ধ জল গরম করে, ঢাল-ওপর করে, হাওয়া খাইয়ে ক্লোরিন দিয়ে বোতল ভরা। এ দেশে জল নিয়ে নাকি ইয়ার্কি চলে না। জল এ দেশে জীবন নয়, মরণ। পাট করা একটা নরম তোয়ালে থাকে। থাকে সিজন্যাল ফ্রটস, দু-একটা ওষুধ। কথায়। বলে, প্রিভেনশান ইজ বেটার দ্যান কিওর। দামি শরীর। কত কিছুর আক্রমণ থেকে সামলে। রাখতে হয়! একজিকিউটিভ ব্যামো কী একটা! হার্টে জমাট রক্ত ধাক্কা মারতে পারে। লিভারে কি লাংসে ক্যানসার ঢুকতে পারে। মৃগাঙ্ক আসে যখন এতটা দামি ছিল না, তখন একের পর একটা খুব সিগারেট খেত। এখন ভীষণ টেনশানের সময় একটা কি দুটো—তাও দামি, বিলিতি।
বাস্কেটের পর নামবে ব্রিফকেস। নামবে একটা সুদৃশ্য ফ্লাস্ক। সারা দিনের মতো কয়েক গ্যালন দুধ ছাড়া, চিনি ছাড়া কালো কফি থাকে। আর নামে পার্ক স্ট্রিটের দামি দোকানের কেক আর পেস্ট্রির বাক্স। এ এক এলাহি ব্যাপার! রোজ সকালে লোডিং, রোজ বিকেলে আনলোডিং। শরীরের রক্ত সঞ্চালনকে একটা লেভেলে এনে মৃগাঙ্ক প্রথমেই যা করবে তা হল, ওই বাঘের মতো কুকুরটার সঙ্গে একটু আদিখ্যেতা। কুকুরের সায়েবি নাম রেখেছে, রাখুক, আমার কিছু। বলার নেই। অ্যালসেশিয়ান। তার নাম ভোলা কি গজা রাখলে মানাত না। মৃগাঙ্ক কুকুরের মাথা চাপড়াবে আর বলবে, ডিক, আমার ডিক, তোমার সব ঠিক?
ডিক, আধ হাত জিভ বের করে হ্যাঃ হ্যাঃ করবে।
মৃগাঙ্ক আদুরে গলায় বলবে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বন্দো গলম, গলম’। তারপর আকাশের দিকে মুখ তুলে বলবে, ‘ওঃ হোয়াট এ সালটি ওয়েদার! অফুল।’
কুকুর ছেড়ে মৃগাঙ্ক সামনে এগোতে থাকবে আর তার বুকের কাছে টাইয়ের নট খুলতে খুলতে পেছনে থাকবে মৃগাঙ্কর মেয়ে। মৃগাঙ্কর সময় খুব কম। বাড়িতে ঢুকে টাইয়ের ফাঁস খোলার। সময়টুকুও সে দিতে চায় না। বাপির যে সময়ের অভাব মৃগাঙ্কর মেয়ে তা জানে। মেয়ে কেন, বাড়ির সবাই জানে। মৃগাঙ্ক কথায় কথায় বলে ‘সিসটেম’, ‘প্ল্যান’, ‘ইউটিলাইজেশান’।
বাড়িতে ঢোকামাত্রই মৃগাঙ্কর বউ একটা হ্যাঙ্গার হাতে পাশে এসে দাঁড়াবে। মৃগাঙ্ক হাত দুটো পেছনে ছেতরে দেবে। সঙ্গে সঙ্গে তার ছোকরা চাকর কোটটা সুড়ুত করে খুলে নিয়ে মেমসায়েবের হাতে দিয়ে দেবে। মৃগাঙ্ক চেয়ারে বসবে। নিমেষে খুলে ফেলবে জুতো, মোজা।
মৃগাঙ্কর মেয়ে বিলিতি স্টিরিও সিসটেমে সেতার চড়াবে। মৃগাঙ্ক বলে, মিউজিকের একটা সুদিং এফেক্ট আছে। সেতার শুনতে শুনতে জামা আর ট্রাউজার খোলা হয়ে যাবে। হাতে এসে যাবে নরম তোয়ালে। মৃগাঙ্ক ধীর পায়ে এগিয়ে যাবে বাথরুমের দিকে। ফাইভস্টার বাথরুম। এই সময় লোডশেডিং হতে পারে। হলেও ক্ষতি নেই। নিজস্ব জেনারেটার আছে। ফ্যাট-ফ্যাট চলবে। ফটাফট আলো জ্বলে উঠবে। বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মৃগাঙ্কর মুখ আয়নায় হেসে উঠবে। ছোট্ট করে মুখ ভ্যাংচাবে নিজেকে। মৃগাঙ্ক পড়েছে, মনটাকে শিশুর মতো করে রাখতে পারলে শরীর ফিট থাকে। যৌবন আটকে থাকে। স্মৃতি ভোঁতা হয় না। মৃগাঙ্ক কোমর দুলিয়ে খানিক নেচে নেয়। নিজের সঙ্গে আবোল-তাবোল কথা বলে। শিশুর মতো বলতে থাকে, বিশ্বকর্মা। পুজোয় মাঞ্জা দিয়ে ঘুড়ি ওড়াব। ঘুড়ি কিনব, একতে, আন্দে। কাল সকালে পড়া হয়ে গেলে গুলি খেলব। খোকন আমার সঙ্গে পারবে?
