ক-টায় উঠবে?
বারোটার আগে নয়।
কার এজলাসে?
জাস্টিস তারাপদ বোসের এজলাসে উঠবে।
তুমি একবার সুপ্রিয়কে পাঠিয়ে দাও।
জুনিয়ার সুপ্রিয় এসে গেল। স্মার্ট ছেলে। চোখে-মুখে কথা বলে। এই লাইনের উপযুক্ত। মেয়ে থাকলে ভোলানাথ জামাই করত। যাক, সে পথ ঈশ্বর মেরে দিয়েছেন।
সুপ্রিয় নন্দদুলাল সরকারের কেসটা নাটশেলে বলো তো।
নন্দদুলাল সরকার পয়সাওলা লোক। বাড়ি-গাড়ির মালিক। ওষুধের হোলসেলার। দুটো রিটেল দোকান আছে শহরের দু-প্রান্তে।
বয়েস?
ফিফটি ফাইভ।
তারপর?
বাইশ বছর বয়েসে নন্দদুলালের বিয়ে হয় বড়লোকের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে।
কোথায়?
উত্তরবঙ্গে।
কী রকম বড়লোক?
কাঠের ব্যবসায়ী। একসময় চা-বাগান ছিল। এখন আর নেই।
জীবিত না মৃত?
দু-বছর আগে মারা গেছেন।
কীভাবে?
মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান ও শারীরিক অত্যাচারে।
বয়েস?
প্রায় পঁচাত্তর।
রাইপ ওল্ড এজ।
হ্যাঁ স্যার।
ও পক্ষে লড়ছে কে?
বড় ছেলে?
কী করে?
বাপের পয়সা ওড়ায়।
বেশ, নন্দলুলালে ফিরে এসো।
নন্দদুলালের ব্যবসা এখন জমজমাট। শহরের অন্যতম ধনী। গোটাতিনেক গাড়ি, কিন্তু নিঃসন্তান। নন্দদুলালকে সবাই মানী লোক বলেই জানে। প্রভাবপ্রতিপত্তিও যথেষ্ট।
নন্দদুলাল এখন কোথায়? বেল পেয়েছে?
না।
পুলিশ কী কী চার্জ এনেছে?
স্ট্রেট মার্ডার চার্জ।
আজকাল এই এক রেওয়াজ হয়েছে। স্ত্রী আত্মহত্যা করলেও মার্ডার চার্জ আনবে। কারুর স্ত্রী আত্মহত্যা করতে পারে না? আগে করত না!
করত স্যার। তবে দু-ধরনের আত্মহত্যা আছে। এক, মানসিক অবসাদে। আর এক মানসিক অত্যাচারে। নন্দদুলাল আর তার স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। আদর্শ দম্পতি। সমস্ত সামাজিক অনুষ্ঠানে দুজনকে দেখা যেত। হাসিখুশি। মহিলা খুব মিশুক ছিলেন। সদালাপী। মানসিক অবসাদের কোনও চিহ্ন ছিল না। সুতরাং প্রথম কারণে আত্মহত্যার থিয়োরি দাঁড় করানো মুশকিল।
তুমি তাহলে কী বলতে চাও?
এটা হত্যা স্যার। সেন্ট পারসেন্ট হত্যা।
কীরকম?
কাজটা নন্দদুলাল খুব ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা অনুসারে পথঘাট বেঁধে করেছে।
কীরকম?
নবমীর দিন সবাই যখন পুজোর আনন্দে মেতে আছে, সবাই যখন উৎসবের মেজাজে, সেই সময় নন্দদুলাল জানলাবন্ধ রান্নাঘরে বেশ কিছুক্ষণ গ্যাস খুলে রেখে, সিলিন্ডারের মুখ বন্ধ করে, দরজা বন্ধ করে শোবার ঘরে ফিরে এল।
সময়?
সকাল। প্রায় ছটা।
তারপর?
নন্দদুলাল ফিরে এসে স্ত্রী-র ঘুম ভাঙিয়ে বললে, ওঠো ওঠো, শিগগির চা চাপাও, আমাদের যেতে হবে না!
কোথায় যেতে হবে?
ঠিক ছিল বাই রোড দার্জিলিং যাবে।
অক্টোবরে দার্জিলিং।
সেপ্টেম্বরের শেষে।
হ্যাঁ। এবার ছিল আরলি পুজো। তারপর?
নন্দদুলাল স্ত্রীকে তাড়া দিয়ে চা চাপাতে পাঠাল। মহিলার পরনে ছিল ফিনফিনে নাইলনের নাইটি। ঘরে ঢুকে ঘুম চোখে দেশলাই জ্বালানোমাত্রই পুরো ঘরটা দপ করে জ্বলে উঠল। মহিলা ছুটে বেরোতে গিয়ে দেখলেন দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।
তারপর?
তারপর অভিনয়। মৃত্যু সম্পর্কে সুনিশ্চিত হয়ে নন্দদুলাল দরজা খুলে চিৎকার চেঁচামেচি করে, নিজেকে সামান্য সামান্য পুড়িয়ে এক হইহই কাণ্ড করে বসল। পাশের পুজোপ্যান্ডেলে তখন ঢাক বাজছে।
তারপর?
তারপর নন্দদুলাল পড়ে রইল হাসপাতালে। বেশ কিছুদিন।
পোস্টমর্টেম রিপোর্ট?
ভেরি সিম্পল। বার্ন ইনজুরি। সেই রাতেই ক্রিমেশান হয়ে গেল।
তা এইসব তথ্য আসছে কোথা থেকে! বানানো গল্প? রহস্য-রোমাঞ্চ?
না, নন্দদুলালের কনফেশান?
কনফেশান? কার কাছে?
হাসপাতালের নার্সের কাছে।
তবে আর কী! ঝুলিয়ে দিলেই হয়।
না। তা হয় না। আমরা তাহলে আছি কী করতে। নন্দদুলাল সুস্থ হয়ে উঠে স্বীকারোক্তি অস্বীকার করেছে। সে অত সহজে মরতে চায় না।
আমাদের তাহলে কী করতে হবে?
হত্যাকে আত্মহত্যা করতে হবে।
করে দেব। ফি পেলেই আমরা হয়কে নয় নয়কে হয় করব।
চারটের সময় ভোলানাথ বেরিয়ে এলেন আদালত থেকে। গাছতলায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। মনে একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নন্দদুলাল হয়ে যেতে কতক্ষণ? বিমলা, এই ধরনের প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটা করে বিমলা থাকবেই।
সিগারেটে দুটো টান মেরে ফেলে দিলেন। এগিয়ে গেলেন পথের দিকে।
একী ব্রজ? তুমি? গাড়ি গ্যারেজ করোনি?
না। মা বলেছেন, যত রাতই হোক আপনাকে ফেরত নিয়ে যেতে হবে। দিনকাল ভালো নয়। আপনার হার্টের অবস্থাও ভালো নয়।
ভোলানাথ গাড়িতে উঠলেন।
স্বামী কৃপানন্দ বলেছেন, সংসার হল সোনার খাঁচা। দানাপানি পাবে। নিভৃত একটা আলয় পাবে। অন্য পাখির ঠোক্করের হাত থেকে বাঁচবে। নীল আকাশের দামালপনা সংসারীর নয়। ওই খাঁচায় বসে নামগান করো। আর প্রার্থনা করো জীবন্মুক্তির। সহধর্মিনীতে সন্তুষ্ট থাকো। নারী নরকস্য। দ্বার।
ভোলানাথ বললেন, ব্রজ, ওই সামন্তর দোকানের সামনে গাড়িটা দাঁড় করাও।
ভোলানাথ নামলেন। সামন্ত হাতজোড় করে বললে, আসুন, আসুন।
হ্যাঁ হে, চুল গজাবার কী সব লোশান বেরিয়েছে আজকাল?
বেরিয়েছে। বেরিয়েছে।
সামন্ত দুরকমের দুটো ফাইল সামনে রাখল।
আপনার জন্যে নেবেন স্যার?
আমার? টাকই তো আমার বিউটি। গৃহিণীর জন্যে।
এর সঙ্গে দু-অ্যাম্পুল ভিটামিন-ই মিশিয়ে নিলে খুব কাজ হয় শুনেছি। প্ল্যাসেনট্রেক্স-ও মেশাতে পারেন।
গাড়িতে উঠলেন ভোলানাথ। বেশ সরেস লাগছে। খাঁচার পাখি খাঁচাতেই সুখে থাকে। বিশ বছরের জীবন আগামী দশ-বিশ বছরের ভবিষ্যৎ তৈরি করেই রেখেছে।
