ভোলানাথ, পাড়ার সকলের ভোলাদা। পঞ্চাশ পেরিয়ে ষাটের দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে। স্ত্রী মাধুরী বয়সে বছর দশেকের ছোট। এক সময় ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন। চল্লিশে পা রেখে ক্রমশই মোটা হতে শুরু করেছেন। ছেলেপুলে নেই। দুজনের ছোট্ট সংসার। মাঝারি মাপের নতুন ঝকঝকে একটি বাড়ি। সুখের সংসার বলা চলে। দুঃখ একটাই। ছেলেপুলে হল না।
তা না হোক। ভোলানাথের তেমন দুঃখ নেই। আজকালকার ছেলে-মেয়ে আনন্দের চেয়ে। নিরানন্দেরই কারণ। বাপ-মায়ের তোয়াক্কা করে না। বদমেজাজি। অসভ্য। অবাধ্য। পাড়ার দাদার কথা মানবে বেদবাক্যের মতো। বাপ-মায়ের কথা উড়িয়ে দেবে ফুঃ করে। বলবে, তোমরা কী বোঝো। চুপ করে বসে টিভি দ্যাখো।
ভোলানাথ মাঝারি গোছের অ্যাডভোকেট। এলেম যথেষ্ট ছিল। আর একটু খাটলে এক নম্বর অ্যাডভোকেট হওয়া অসম্ভব ছিল না। তেমন লোভ নেই। চলে গেলেই হল। আর ঈশ্বরের কৃপায় ভালোই চলছে।
ভোলানাথের গুরু স্বামী কৃপানন্দ শিষ্যকে বলেছেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত যত কিছু সবই জানবে পাপ। তোমার লোভ বাড়াবে। জীবনটা নষ্ট করে দেবে। ঈশ্বর মানে আনন্দ। পরমানন্দ। ধন নয়, জন নয়। যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি নয়। চাইবি আনন্দ, আনন্দ। কেবলানন্দ।
আনন্দ কাকে বলে, সে বিষয়ে ভোলানাথের ইদানীং অনেক সংশয় দেখা দিয়েছে। যুবকরা প্রেম করে আনন্দ পায়। সিনেমায় বিবসনা সুন্দরীর নৃত্য দেখে আনন্দ পায়। মাধুরী টাকে চুল গজাবে ভেবে আনন্দ পায়। ভোলানাথের কীসে আনন্দ তিনি নিজেই জানেন না। জটিল কোনও মামলা পেলে তাঁর আনন্দ হয়। কিন্তু তেমন জটিল মামলা আজকাল আর আসে না। তিনি ক্রিমিন্যাল সাইডে আছেন। ক্রাইমও বেড়েছে। মামলা নেই। মানুষ খুন আজকাল আর ধর্তব্যেই আসে না। কেস ওঠে। সাক্ষীর অভাবে ফেঁসে যায়।
পুরোনো আমলের একটা গাড়ি ভোলানাথের বাহন। গাড়ি চালান ব্রজবাবু। গাড়ির মতোই প্রাচীন। তবে হাত ভালো। রাতে তেমন চোখ চলে না। সন্ধের মুখে গাড়ি গ্যারেজ হয়ে যায়। সেই কারণে ভোলানাথ নৈশ আনন্দ উপভোগ করতে পারেন না। বাড়িতে বসে আইন ওলটাতে হয়। তাতে জ্ঞান যেমন বাড়ছে আনন্দ সেই অনুপাতে কমছে। বউ পুরোনো হলে বিশ্বস্ত হয় ঠিকই, কিন্তু আনন্দের নয়। রসের কথা কওয়া যায় না। বলে, যত বয়েস বাড়ছে তত ভীমরতি হচ্ছে। ঠাকুর-দেবতার বই আছে। বাজে সময় নষ্ট না করে পড়োনা। পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করো। একেবারে খালি হাতে গিয়ে দাঁড়াবে! ভালো লাগে না, তা-ও ভোলানাথকে গীতার কর্মযোগ ওলটাতে হয়। সে যে কী ভীষণ শাস্তি!
গুরু কৃপানন্দকে একবার প্রশ্ন করেছিল, বাবা মনকে কী করে বশে আনা যায়?
গুরু বলেছিলেন, ব্যায়াম করে।
তার মানে ডন, বৈঠক, কুস্তি?
দেহটাকে খালি খাঁটিয়ে যা ক্রীতদাসের মতো। আরাম হারাম হ্যায়।
আর কোনও উপায় নেই প্রভু?
আর একটা উপায় আছে বাপ। সেটি হল মনটাকে শক্ত করা।
কীভাবে?
যেমন ধর, কাউকে নিমন্ত্রণ করে সামনে বসে, তুই যা ভালোবাসিস খাওয়াবি গান্ডেপিন্ডে। নিজে কিছু স্পর্শ করবি না। সুন্দরী রমণীর সঙ্গ করবি, দেহ স্পর্শ করবি না। সুযোগ পেলেই যাকে-তাকে এটা-ওটা দান করবি। তোর মনটাকে উপবাসে রাখবি। তিন বছর এইভাবে চালাতে পারলে মন হয়ে যাবে চেন-বাঁধা-কুকুর। মন তোর প্রভু নয়। তুই মনের প্রভু।
ভোলানাথ মাঝে মাঝে কসরত করে। করলেও মন এখনও তার প্রভু। যা বলে তা না শুনে উপায় থাকে না। যেমন আজ সকাল থেকেই মন বলছে, বিমলার কাছে যা। খুব আনন্দ পাবি।
অনেকক্ষণ ধরেই বলছে। ভোলানাথ শুনেও শুনছেন না। তবু মন বলছে, সন্ধের দিকে ঘণ্টা দুয়েক ভালোই কাটবে। কী ম্যাদামারা হয়ে আছিস! শরীরের যেমন আয়রন, ভিটামিন, মিনারেলস, মনের তেমনি ফুর্তি। আরে বাবা, আজ আছিস, কাল থাকবি না। পুরুষ আর প্রকৃতির খেলাটা দেখ।
বাঙালি মন মাঝে মাঝে আবার ইংরেজি বলে, এনজয় লাইফ।
তা ঠিক। কে বলতে পারে! কালই হয় তো ফটাস করে বেলুন ফেটে যাবে। হার্টের অসুখ। ক্যানসার। দু-পক্ষের রাজনৈতিক বোমাবাজির মাঝখানে আচমকা পড়ে যাওয়া, দুটো গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষ। জীবন-মৃত্যুর কথা কে বলতে পারে!
আদালতের দিকে গাড়ি এগোচ্ছে। সারাজীবন সেই একঘেয়ে ব্যাপার—মামলা, মক্কেল, এজলাস, জজসায়েব। মি লর্ড, মাই প্লেণ্টিফ। আইনের হাজার কচকচি।
না, আজ সন্ধেবেলা বিমলা। আজ একটু অন্যরকম ব্যাপার হবেই। এমন সুন্দর বসন্ত। ভোলানাথ মনের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেললেন।
আদালতের সামনে গাড়ি থেকে নেমে ব্রজকে বললেন, আজ আর গাড়ি এনোনা। গ্যারেজ করে দাও। আমার ফিরতে দেরি হবে।
ব্রজবাবু বললেন, সময়টা বলুন না। মা আবার রাগ করবেন আমার ওপর।
রাগ করবে কেন?
আপনার বয়েস হচ্ছে। বাড়ি না-ফেরা পর্যন্ত মা ছটফট করেন। তিনটের পর থেকেই ঘর-বার করতে থাকেন। বলেন, দিনকাল ভালো নয়। যত দেরিই হোক সময়টা আমাকে বলুন। গাড়ি নিয়ে আসব।
সময়টাই তো আমি বলতে পারছি না। একটা কঠিন মামলা আছে। একটা আপিলের ড্রাফট করতে হবে। তুমি মাকে বোলো আমি আনন্দর গাড়িতে ফিরে যাব। চিন্তার কোনও কারণ নেই। বুঝলে।
লম্বা লম্বা পা ফেলে ভোলানাথ বিশাল বিশ্রী আদালতবাড়িতে ঢুকে গেল। ব্রজ দুমিনিট অপেক্ষা করে গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে গেল। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। তার কিছু করার নেই। মুহুরি অরবিন্দ বললেন, কেসটা একবার পড়বেন না!
