কোঁক-কোঁকোর-কোঁ। বিশাল এক রামপাখি তিনবার ডেকে উঠল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম সৈনিকের মতো। আমাদের তিনজনের হাতে তিনটে ব্যাগ। কৃষ্ণচূড়া, কাঁঠাল, আম আর জামরুল গাছের আড়াল দিয়ে, ম্যাগনোলিয়া আর সবেদা গাছের তলা দিয়ে আমরা পেছনের। কম্পাউন্ড পেরিয়ে রাস্তায়। কালো ঝকঝকে গাড়ির গায়ে চকচকে নিকেলের পাত। এই গাড়ি আমাদের কত দূরে নিয়ে যাবে! গাড়িটা বড়মামা সবে কিনেছেন। মেজোমামা চালকের আসনে। মেজোমামা টেরিফিক চালান। মেজোমামার পাশে বড়মামা। আমরা পেছনে। বড়মামা একটা চামড়ার ব্যাগ মুকুন্দর হাতে দিয়ে বললেন, ‘টেন থাউজেন্ড।’
বড়মামার নতুন মুখে পুরোনো চোখের জল, ‘আমার আটটা কুকুর, আঠারোটা গরু, তিন খাঁচা পাখি, এই বাড়ি, মরিস মাইনার গাড়ি—সব, সব রইল তুই একটু দেখিস। আমাদের সর্বস্ব।’
মেজোমামা বললেন, ‘শক্ত হও, শক্ত হও। এটা ফাঁস ফাঁস করার সময় নয়।’ মুকুন্দকে বললেন, ‘মদন আসবে একটু পরে, মাস্তানকে খবর পাঠা। দুর্গের মতো বাড়িটাকে আগলাবি। এভরিথিং তোর হাতে। লক্ষ্মীদিকে থাকতে বলিস।’
‘জান কবুল করে দেব মেজদা। আচ্ছা, আপনারা কি ওই কারণেই চলে যাচ্ছেন?
‘কী কারণ?
‘বিশ লাখ।’
‘তুই জানলি কী করে?
‘বড়দা যে বললেন, ‘কাউকে বলিসনি মুকুন্দ। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।’ আমি কাউকে বলব না। আমার মুখে সেলোটেপ।’
মেজোমামা বললেন, ‘গুড বাই।’
গাড়ি ছেড়ে দিল। তিন বাঁক ঘুরেই বড় রাস্তা। সাত কিলো দূরে এন. এইচ. থার্টি ফোর। আর আমাদের পায় কে! যাচ্ছি আমরা কালাচিনি। একটু পরেই ভুটান। এত আনন্দ আমার কখনও হয়নি। সবাই মিলে একসঙ্গে, যেন টুরিস্ট পার্টি। মেজোমামার ঠোঁটে সোনার ডগাওলা পাইপ। চারপাশে সদ্য-ফোঁটা রোদের আমেজ।
হঠাৎ বড়মামা বললেন, ‘কালাচিনিতে হাতি পাওয়া যাবে?
‘যাবে।’
‘তা হলে, আমার অনেক দিনের ইচ্ছে, ছোট্ট একটা হাতির বাচ্চা কিনব। সারা ঘরে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে!’ মাসিমা বললেন, ‘এই তো, বিশ দিনে বিশ লাখ ওড়াবার ঠিক রাস্তাই পেয়ে গেছ।’ আমরা তো চলেছি! অজ্ঞাতবাসে। এদিকে যা হল, শরৎবাবু গেট খুলে বেরিয়ে এলেন হজমি ভ্রমণে। সাদা গাড়ির মোটা চালক, ‘আইয়ে আইয়ে’ বলে খাতির করে তুলে নিলেন গাড়িতে। কবি হিসেবে এই খাতিরটুকুই চেয়ে এসেছেন সারা জীবন। তারপর! কে পাগল হল! একজন? না। একসঙ্গে দুজন! সে আর-এক কাহিনি!
মোচার ঘণ্ট
দরজা খুলতে এগোচ্ছেন আধুনিকা গৃহিণী, সামনেই দুই ভদ্রলোক।
ভদ্রলোকদ্বয়: আসতে পারি?
মহিলা: কে আপনারা?
উত্তর : আমরা আসি—ফ্রম ডোমেস্টিক এইডস ইনকরপোরেট, একটি সমাজসেবী সংস্থা।
মহিলা: আসুন, তবে বুঝতে পারছি না ব্যাপারটা কী? কাপড় কাচার পাউডার? ভ্যাকুয়াম ক্লিনার? ওয়াশিং মেশিন?
উত্তর : ওসব বাজারচলতি ব্যাপার নয়, ম্যাডাম, আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। সেঞ্চুরি টপকে গেছি। একেবারে নিউ আইডিয়া।
দ্বিতীয় ভদ্রলোক:দাঁড়ান, আমি বলছি, একেবারে জলবৎ তরলং করে দিচ্ছি, বসতে পারি ম্যাডাম?
হ্যাঁ হ্যাঁ, বসুন।
ম্যাডাম! ব্যাপারটা হল, আপনার ইচ্ছে আছে উপায় নেই। একটু Explain করি। ধরুন ইচ্ছে করছে মোচার ঘণ্ট খাবেন। ঠাকুমা-দিদিমার আমলের প্রাচীন পদ। পদাবলী কীর্তনের মতো। আপনি মোচার ড্রেসিং জানেন না। জাস্ট ডায়াল দিস নাম্বার। ভট ভট ভট ভট। লাল। মোটরবাইকে যন্ত্রপাতি নিয়ে আমাদের ট্রেন্ড কর্মী হাজির। পনেরো মিনিটের মধ্যে মোচার ড্রেসিং কমপ্লিট করে দিয়ে চলে যাবে। প্রসেস জানা না থাকলে সেটাও দিয়ে যাবে। কতটা নারকেল কোরা, ছোলা কতটা, ফোড়ন, বাকিটা আপনার পার্সোনাল টাচ। ইউ গেট ইওর মোচার ঘ্যান্ট।
এর পরে ধরুন কোনওদিন ইচ্ছে হল থোড় ঘণ্ট। হোড় হেঁচকি। কেলেঙ্কারি কাণ্ড। ভেরি ডিফিকাল্ট ম্যানিপুলেশান। ভীষণ উপকারী। যাকে বলে, লোহার কারখানা। দেখতে সাদা, কিন্তু পুরোটাই লোহা। লোহার ডান্ডা। অ্যানিমিয়ার যম। কে কাটবে! লাস্ট সেঞ্চুরির শাশুড়িকে তো খেদিয়ে দিয়েছেন! থোড় আবার সুতোকল। একটা করে চাকা কেটে আঙুলে সুতো জড়াতে হয়। আধ্যাত্মিক জিনিস। জপের মালার মতো। একশো আটবার জপ করতে হয়। ঘোরাচ্ছেন, ঘোরাচ্ছেন আর বীজমন্ত্র জপ করছেন! একফুট থোড়ে এক হাজার জপ। পারবেন আপনি? নেলপালিশ করা সোনার আঙুল কালো হয়ে যাবে। লিফট ইওর ফোন, ডায়াল আওয়ার নাম্বার। আধঘণ্টার মধ্যে শুদ্ধ সাদা কাপড় পরা এক বৃদ্ধা এসে যাবেন। দীক্ষিতা। বউমা,বলে বসে পড়বেন। এক-এক চাকা কাটবেন, আঙুলে সুতো জড়াতে জড়াতে জপ চালিয়ে যাবেন।
মহিলা বললেন, কিন্তু! আমি ওইসব রাবিশ থোড়, মোচার লাইনে যাব কেন?
কেন যাবেন? আপনার গ্ল্যামার বাড়াবে। সারপ্রাইজ ডিশ সার্ভ করবেন আপনার গেস্টদের। তাঁরা বাহবা, বাহবা করবেন। বলতে থাকবেন, আপনি ডয়েন অফ বঙ্গ সংস্কৃতি।লুপ্তপদ উদ্ধার করেছেন। এইবার ধরুন, রাতে লুচি, রুটি, পরোটা খাবেন, আমরা আপনাকে ময়দার তাল সাপ্লাই করব। ময়দা ঠাসার বিরক্তিকর জঘন্য কাজটা আপনাকে আর করতে হল না। ও। সময়টায় আপনি টিভি সিরিয়াল দেখবেন। লুচি, রুটির গোলটা আপনার হাতে আসে না। বেঁকে তেড়ে যায়। লজ্জার কিছু নেই। আমাদের কর্মী এসে স্যাটাস্যাট মাল নামিয়ে দেবে।
