আমরা দুজনে ঢকঢক করে জল খেলুম দু-গেলাস। বন্ধ দরজায় টোকা পড়ল। বড়মামা চমকে উঠে বললেন, ‘কে, কে?’
‘দরজা খোলো।’ ভারী গলা।
‘কে তুমি?’ বড়মামা মেজোমামার গলা চিনতে পারছেন না ভয়ে। ‘কে মেজোমামা?’ আমার গলারও জোর গেছে।
‘দরজাটা খোলো।’
মেজোমামা ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘আর-এক মুহূর্ত দেরি নয়। প্যারালাল লাইনে আমি সব শুনেছি। তুমি কতজনকে বলে বেড়িয়েছ শুনি। তোমার স্বভাব তো আমি জানি। একটা কথাও পেটে রাখতে পারো না। কতজনকে বলেছ?’
‘বেশি না, মাত্র তিনজন।’
‘ব্যস, ওই তিনজন এখন তিন লক্ষ জন হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে তোমাদের আমি পাচার করে দিতে চাই। আমরাও তোমাদের সঙ্গে যাব। মুকুন্দ আর মদনলাল বাড়ি সামলাবে। প্রয়োজনে ঝড় আসবে। ঝড়ু আর মদনলাল থাকলে ভয় নেই। প্রয়োজনে জান দিয়ে দেবে। গেট রেডি। গেট রেডি।’
মেজোমামা মাসিমাকে ডেকে তুললেন।
মাসিমা সমস্ত শুনে বললেন, ‘নাঃ, যেতেই হবে। থাকলে বিপদে পড়ে যাব। কাল সকাল থেকেই আক্রমণ শুরু হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা ছুটে আসবে কালো টাকা সাদা করতে। আমি শুনেছি, ওরা ওই রকমই করে। তুমি বড়দা, সর্বনাশ করে ফেলেছ। কেন তুমি তিনজনকে বলেছ। তিনজনের মধ্যে কে-কে আছে?’
‘ওই যে আমাকে মাসাজ করতে আসে, গোপাল হালুই।’
‘তুমি গোপালকে বলেছ! বাঃ, উপযুক্ত লোককেই বলেছ। গোপাল মোটামোটা ব্যবসাদার আর শিল্পপতিকে মাসাজ করে। চুল কাটার সময় আর মাসাজের সময় জানোই তো যত কথা হয়। হয়ে গেছে। নিজের সর্বনাশ তো করলেই, আমাদেরও শেষ করলে। এ-বাড়িতে আর ফিরে আসা যাবে তো! ফিরে এসে কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে তো!’
মাসিমা কথা শেষ করে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কি দাঁড়াননি, সদরে গাড়ি থামার শব্দ। অনেকটা বাগান পেরিয়ে সদর। দক্ষিণের বাতাসে হর্নের শব্দ ভেসে এল। কে গেটটাকে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। জোরে জোরে। সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। বারান্দা থেকে অনেক দূরে হলেও, আমরা গেটটা দেখতে পাচ্ছি। বেশ বড় সাদা একটা গাড়ি। পাঞ্জাবি পরা বেশ মোটা মতো এক ভদ্রলোকে দাঁড়িয়ে আছেন।
মেজোমামা বললেন, ‘এই খেয়েছে। বড়দা, বড়দা, শুয়ে পড়ে বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়ো। কুসি, তুই শিগগির যা। বোকা মুকুন্দটা সব গোলমাল করে দেবে। তুই শিগগির যা। গিয়ে বল, মুকুন্দ যেন বলে, ‘বড়বাবুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। পাবলো ক্লিনিকে ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। বাড়ির সবাই সেইখানেই আছে।’ কোনওভাবেই যেন অন্য কথা না বলে।’
মাসিমা তরতর করে নীচে নেমে গেলেন। আমরা গেরিলা সৈন্যের মতো বুকে হেঁটে ঘরে ঢুকে পড়লুম।
মেজোমামা বললেন, ‘ড্রেস আপ। ড্রেস আপ। বড়দা, তুমি বেশ ভালো করে সাজো তো। সব চেয়ে ভালো ট্রাউজার আর স্ট্রাইপড শার্ট পরো। সমস্ত চুল সামনে টেনে এনে তোমার চওড়া কপালটা ঢেকে ফ্যালো। কোমরে চওড়া বেল্ট লাগাও। আজ গগলসটা পরো। তোমার সেই ফরেন জিনিসটা।’
নকশাল আমলে বড়মামা আত্মরক্ষার জন্যে রিভলভার রাখার লাইসেন্স পেয়েছিলেন। এই সময় খুব কাজে লেগে গেল যা হোক। আমাদের একটা ইন্টারকম আছে। মাসিমা ইন্টারকমে কথা বলছেন নীচে থেকে। মুকুন্দর কথা ভদ্রলোক বিশ্বাস করেননি। গাড়িতে বসে আছেন। মুকুন্দকে বলেছেন, ‘ব্যবসাদার। আমি বুঝি মানুষ কোন চালে চলে! প্রয়োজন হলে সারাদিন গেট আটকে বসে থাকবেন।’ মুকুন্দ সবক’টা কুকুর বাগানে ছেড়ে দিয়েছে। মাসিমা জিগ্যেস করছেন, ‘শরৎবাবুর কী হবে! তিনি তো এখনও ঘুমোচ্ছেন।’
মেজোমামা বললেন, ‘ঘুমোচ্ছেন, ঘুমোন। উঠে দেখবেন আমরা নেই।’
আমাদের সাজ-পোশাক হয়ে গেল। নীচের স্টোররুমে বসে আমরা এক রাউন্ড চা খেয়ে নিলুম। করিডরের আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক। চিনতেই পারছিনা নিজেকে। কেমন যেন বকাটে বকাটে লাগছে। অন্য সময় এমন সাজলে, মেজোমামাই আমাকে বলতেন, ‘যাও, এখানে কেন? সিনেমা হলে গিয়ে ব্ল্যাকে টিকিট বিক্রি করো।’
মুকুন্দকে একপাশে বসিয়ে পাখি-পড়ানোর মতো সব বোঝানো হল। আজই প্রথম শুনলাম, মুকুন্দ খুব ইন্টেলিজেন্ট ছেলে। মেজোমামা বললেন, ‘আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। এরপর এমন কেউ এসে পড়বে, যার সঙ্গে দেখা করতেই হবে।’
আমরা আমাদের গাড়িটা কী করে বের করব যখন ভেবেই পাচ্ছি না, তখন মুকুন্দই বুদ্ধিটা বের করল। আমাদের গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে খিড়কির গেট দিয়ে পেছনের রাস্তায় পড়া যায়। আর ওই রাস্তায় একবার পড়তে পারলে আমাদের আর পায় কে! কিন্তু গাড়ি স্টার্ট করার শব্দ সামনের গেট পর্যন্ত চলে যাবে।
মুকুন্দ বললে, ‘আপনারা যেমন আছেন, সেইরকমই থাকুন, আমি গ্যারাজ থেকে গাড়িটা বের করে ঠেলে ঠেলে পেছনের রাস্তায় নিয়ে যাচ্ছি। রাস্তায় নামিয়ে আমি পাখির ডাক ডাকব, তখনই আপনারা চলে আসবেন।’
‘কী পাখি?
‘কোকিল।’
মেজোমামা বললেন, ‘এটা বসন্ত কাল নয়। যা বলবে ভেবেচিন্তে বলবে।’
‘তা হলে মুরগি। ওই ডাকটা ছেলেবেলা থেকেই আমি খুব অভ্যাস করেছি।’
‘হ্যাঁ, মুরগি। এই তো আমার বুদ্ধিমান ছেলে!’
মুকুন্দ বেরিয়ে গেল। আমরা বসে আছি উৎকণ্ঠা নিয়ে। কখন সেই মুকুন্দ মুরগি ডাকবে! সবাই ঘড়ি দেখছেন। মাসিমা এত সুন্দর সেজেছেন; ঠিক একেবারে আমার মায়ের মতো দেখতে। হয়েছেন। এইসময় আমার বাবা যদি বিলেত থেকে একবার আসতেন!
