কথা শেষ করেই তিনি আরও উঁচু পর্দায় ধরলেন। গলা ফেটে ফুটিফাটা হয়ে গেল। সেদিকে। গ্রাহ্য নেই। যাকে বলে সাঙ্ঘাতিক বেপরোয়া গাইয়ে। মুকুন্দ দড়াম-দড়াম করে তবলা পেটাতে লাগল। গানের লাইনে গান চলেছে, তবলার লাইনে তবলা। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। মুকুন্দ যত না বাজাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি মাথা নাড়ছে। বড়মামা উঠে চলে গেছেন। মাসিমা বেরিয়ে গেলেন। পড়ে ছিলুম আমি। আমিও চুপিচুপি বেরিয়ে এলুম এক ফাঁকে। বাইরে থেকে মনে হচ্ছে ঘরের ভেতর গজ-কচ্ছপের লড়াই হচ্ছে যেন। সেই গান শুনে বড়মামার বাঘা-বাঘা। আটটা কুকুর লেজ গুটিয়ে বসে আছে জুজুবুড়ি হয়ে। পরস্পর পরস্পরের মুখের দিকে তাকাচ্ছে।
রাতের পাট চুকে গেল। নীচের তলার আলোটালো সব নিভে গেছে। পুবের ঘরে শরৎবাবুর নাক ডাকছে গাঁক-গাঁক করে। মুকুন্দ রোজ শোয়ার আগে স্নান করে। কুয়োতলায় ছড়ছড় করে জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। মাসিমার একটা নিজস্ব ইজিচেয়ার আছে বারান্দায়। বিছানায় যাবার আগে সেই চেয়ারে বসে থাকেন আপনমনে। সেই সময় মাসিমা একেবারে অন্য মানুষ। এই সময় মাসিমার পাশে গিয়ে আমি বসি। মা-মরা ছেলে বলে মাসিমা আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। এই যে আমার মা নেই, আমার বাবা বিলেতে, আমি কিছু বুঝতে পারি না। মাঝে-মাঝে মায়ের কথা মনে পড়লে আমার চোখে জল এসে যায়। আসতেই পারে। সকলেরই কেমন মা আছে, আমার নেই। মা না থাকলে জমে? আমিও স্কুল থেকে ফিরি, আমার বন্ধুরাও ফেরে। তারা কেমন। দরজার বাইরে থেকে ‘মা, মা’ বলে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢোকে। আমি আসি গুটিগুটি, চোরের মতো। মামার বাড়ি যতই ভালো হোক, নিজের বাড়ি আর মামার বাড়িতে একটু তফাত হবেই। মাসিমা আমাকে সাঘাতিক ভালোবাসলেও মাসিমাকে আমি ভয় পাই। ভীষণ রাগি মানুষ। অকারণে রাগেন না। কারণ থাকলে রেগে যান। তখন মা দুর্গার মতো চোখ দুটো জ্বলতে থাকে। ফরসা মুখ লাল হয়ে ওঠে। আমাকে ভালোবাসেন বলে আমি কোনও অন্যায় করি না। জানি, অন্যায় করলেও আমার ওপর রাগ করবেন না। আমার হয়েছে মহা সমস্যা। আমার ইচ্ছে করে একটু অন্যায় করি, মায়ের হাতে একটু মার খাই। মারের পর একটু আদর খাই। শুধুই। ভালো ছেলে হয়ে থাকা। একটু দুষ্টুমি যদি এখন না করি, কবে আর করব! বড় হয়ে?
মাসিমার পাশে বসে আছি। মাসিমার একটা হাত আমার মাথায়। আমি দেখেছি, মাসিমা আমার মাথায় হাত রাখলে আমার সব বিপদ কেটে যায়। আমার জ্বর, পেটব্যথা, মাথা ধরা, দাঁত কনকন —সব কমে যায়। স্কুলে পড়া পারি। তাই তো আমি মাসিমার পাশে এসে বসি। আরও বসি, মাসিমা ছেলেবেলার গল্প বলেন। মায়ের গল্প বলেন। মা কেমন সুন্দর গান গাইতেন। ফ্রক পরলে মাকে মেয়েদের মতো দেখাত। মায়ের ভীষণ ভয় ছিল ভূত আর চোর-ডাকাতের। আবার সাপে ভীষণ সাহস ছিল। সবাই যখন ছুটছে, মা দাঁড়িয়ে আছেন। মাকে সবাই ভীষণ ভালোবাসত। মা লেখাপড়ায় একেবারে সেরা ছিলেন। প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম। মায়ের সঙ্গে নাকি কালীমন্দিরে ভোরবেলা -কালীর দেখা হয়েছিল। মা-কালী মায়ের মতোই একটা ছোট মেয়ের রূপ ধরে নাটমন্দিরে এক ঘণ্টা লুকোচুরি খেলেছিলেন। মা সেই লালপাড় শাড়ি-পরা, গাছকোমর বাঁধা মেয়েটিকে যতবার জিগ্যেস করেন, তোমার নাম কী ভাই, ততবারই মেয়েটা হেসে হেসে পালায়। শেষে মা যখন খুব রাগ করে বললেন, যাও, নাম না বললে তোমার সঙ্গে আর খেলব না আমি। সেই থেকে তোমাকে আমি নাম ধরে ডাকতেই পারছি না। মেয়েটা তখন। বললে, আমাকে তুমি এতক্ষণেও চিনতে পারলে না ভাই? আমার নাম জগদম্বা। বলেই মেয়েটা মা-কালীর মূর্তির মধ্যে ঢুকে গেল। সেইনা দেখে আমার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন। মন্দিরের বৃদ্ধ পুরোহিত এসে মায়ের মুখে চরণামৃত দিয়ে জ্ঞান ফেরালেন। সব শুনে বললেন, তুমি মা। ভাগ্যবতী। আমি সারাজীবন পুজো করে আজও দর্শন পেলাম না। পুরোহিত হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলেন। মায়ের গল্প সারারাত হলে সারারাত আমি জেগে জেগে শুনতে পারি। মাসিমার কাছে মায়ের অনেক অনেক গল্প আছে। এত গল্পও মা তৈরি করে রেখে গেছেন! আমার জন্যে মায়ের গল্প আছে, মা নেই।
মাসিমা সবে গল্প শুরু করতে যাচ্ছেন, এমন সময় বড়মামা বললেন, ‘তোমরা একবার আমার
ঘরে এসো, সাংঘাতিক একটা আলোচনা আছে।’
মেজোমামা, মাসিমা আর আমি ঘরে ঢুকতেই বড়মামা সাবধানে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমার কেমন যেন ভয়-ভয় করছে। বড়মামা তো কোনওদিন এমন করেন না। কী হল আজ! বড়মামা। মেঝেতে পুরু গালচেটা পাতলেন। ফিশফিশে গলায় বললেন, ‘তোমরা সব বসে পড়ো।’
মেজোমামাও যেন বেশ ভয় পেয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলো তো!’
বড়মামা আমাদের গা ঘেঁষে বসে, একেবারে ফিশফিশে গলায় বললেন, ‘আমার ভাই সমূহ বিপদ। বিপদ একা আমার নয়, আমাদের সকলের বিপদ।’
মাসিমা বললেন, ‘কী হয়েছে! কাউকে ইনজেকশান দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছ! জাল ওষুধের কেস নয় তো?’
‘ওসব নয়, ওসব নয়। অন্য ঘটনা। ভয়ংকর একটা ঘটনা ঘটে গেছে। আমরা শেষ হয়ে গেলুম।’
মেজোমামা বললেন, ‘আর আমাদের টেনশন না বাড়িয়ে দয়া করে বলে ফ্যালো তোমার বিপদটা কী?’
‘খুব কাছে সব সরে এসো। আরও কাছে।’
বড়মামা এপাশে-ওপাশে তাকালেন। জানলার দিকে তাকালেন। আমাকে বললেন, ‘ঝট করে দেখে এসো তো, জানালার বাইরে কেউ আছে কি না!’
