ডিটেকটিভ বই আমি খুব পড়েছি। জয়ন্ত, সুন্দরবাবু, ব্যোমকেশ, কিরীটি রায়। পাকা গোয়েন্দার মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠে জানালার কাছে গেলুম। কেউ নেই। অন্ধকার আকাশ। গাছের মাথা দুলছে বাতাসে। দরজাটা টেনে দেখলুম। বন্ধই আছে। ফিরে এসে বসলুম। বড়মামা জোড়হাত হয়ে প্রণাম করলেন দেয়ালে ঝোলানো ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও সারদা মায়ের ছবিকে।
মেজোমামা বললেন, ‘উত্তেজনায় আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।’
আর ঠিক তখনই বড়মামা বললেন, ‘আমি বিশ লক্ষ টাকা পেয়েছি।’ বলেই ভেউভেউ করে কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে-কাঁদতে বললেন, ‘আমার সর্বনাশ হয়ে গেল।’
মেজোমামা বললেন, ‘যাঃ, তা কখনও হয়! বিশ লাখ টাকা কেউ লটারি পায়? তোমার কি সবই অদ্ভুত!’
বড়মামা কান্নাজড়ানো গলায় বললেন, ‘কী করব ভাই, আমার বরাতটা চিরকালই একরকম রয়ে গেল। বিপদের পর বিপদ। বিপদের পর বিপদ। টিকিটটা আমাকে একজন জোর করে গুছিয়ে গিয়েছিল। আমি নেব না কিছুতেই। বলে কিনা…এই করেই আমি সংসার চালাই।’
‘ব্যস, আর কী, তোমার অমনি দয়ার শরীর গলে গেল! নাও, এইবার ঠ্যালা সামলাও। তাও এক আধ লাখ হয়! এ একেবারে বিশ লাখ! একে কী বলে জানো, খাচ্ছিল তাঁতি তাঁত বুনে, কাল হল তাঁতির গরু কিনে।’ আঃ, মেজোমামা কোটেশনটা একেবারে ঘাটে-ঘাটে লাগিয়েছেন। শরৎবাবু থাকলে তালি বাজাতেন।
বড়মামা বললেন, ‘বিপদে পড়েছি ভাই। এখন আর তোরা আমাকে গালি দিসনি।’
‘এই সর্বনাশা লটারিটা কোথাকার?’
‘মেঘমল্লার বাম্পার।’
‘নাও, এখন ডাক্তারি-ফাক্তারি ছেড়ে ব্যবসাদারদের মতো একটা গদি আর ছ’টা টেলিফোন নিয়ে বোসো। আর সারাদিন ভাও কেতনা, ভাও কেতনা করো। থার্ড ক্লাস, ন্যাস্টি, ভার, ব্লোটিং রিকিং মানি। তোমার গা দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বেরোবে। তোমার মুখটা কোলাব্যাঙের মতো হয়ে যাবে। তোমার একটা ধামার মতো ভুঁড়ি হবে। তোমার সব চুল উঠে গিয়ে তেপান্তরের মাঠের মতো এতখানি একটা টাক বেরোবে।’
‘পাছে টাকা জমে গিয়ে কালো টাকা হয়ে যায়, সেই ভেবে আমি দু-হাতে উড়িয়ে দিই, উড়নচণ্ডের মতো। এ আমার কী সর্বনাশ হয়ে গেল!’
‘তুমি তো এক্ষুনি দুম করে হার্টফেল করতে পারো। তখন কী হবে? তুমি তো চলে গেলে। তোমার আর কী। আমরা যে অনাথ হয়ে যাব। অনেক ভাগ্য করলে মানুষ এমন বড়দা পায়। তোমার। বুকটা এখন কেমন করছে? ধড়ফড়, ব্যথা! আমি বরং একজন ডাক্তার ডাকি। আজ সারারাত তিনি এ-বাড়িতে থাকুন।’
‘আমার এখনও কিন্তু সেরকম কিছু মনে হচ্ছে না।’
‘এখন ভয় পেয়ে আছ বলে কিছু হচ্ছে না। একটু পরেই তোমার আনন্দ হবে। তখন তোমার লাফ মারতে ইচ্ছে করবে। তারপর তোমার হার্টটা চমকে উঠেই থমকে যাবে।’
মাসিমা বললেন, ‘কত টাকা বললে?’
‘কুড়ি লক্ষ।’
‘কোনও মানে হয়! ছোটলোকের মতো এককাঁড়ি টাকা। তা তুমি টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে দাও না।’
‘সে উপায় নেই। এর আগে তো আমি একটা দেড়লাখ টাকা ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম।’
‘তার মানে তুমি এর আগে আর একটা লটারি পেয়েছিলে?
‘গত বছরে।‘
‘ছিঃ, ছিঃ, তোমার কী ভিখিরির বরাত!’
‘সে টিকিট তো আমি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলুম। লটারির টাকা আমার পেছন পেছন তাড়া করলে আমি কী করতে পারি! এবারে আমার এজেন্টের কাছেই টিকিটটা ছিল।’
‘সে কী বলছে?’
‘খবরটা দেখে তার ছোট একটা হার্ট অ্যাটাক মতো হয়ে গেছে। বেড রেস্টে ফেলে রেখে এসেছি। শোনো, আমি ওভাবে মরব না। তবে আমি যা শুনেছি, তা আরও ভয়ানক ও ভয়ঙ্কর। ভয়াল ভয়ঙ্কর এক অপরাধ-কাহিনি। খবরটা যখন ছড়াছড়ি হয়ে যাবে, তখন একদল ক্রিমিনাল কী করবে, আমাদের এই ছেলেটাকে তুলে নিয়ে চলে যাবে। নিয়ে গিয়ে রেখে দেবে গুম করে। সেখান থেকে চিঠি ছাড়বে, অমুক দিন অমুক জায়গায় তিরিশ লাখ টাকা নিয়ে হাজির থাকবে, হাতের কবজিতে সবুজ রঙের রুমাল জড়ানো একজন দাঁড়িয়ে থাকবে। তার সামনে দাঁড়ানো মাত্রই বলবে, জয় রাম। টাকা ভর্তি সুটকেসটা তার হাতে দেবে। তখনই কিন্তু ছেলেকে ফেরত পাচ্ছ না। ছেলেকে রাত বারোটার সময় বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যাবে, আমাদের ডেলিভারি ভ্যান। পুলিশের সাহায্য নেবার চেষ্টা কোরো না; তা হলে গোটা ছেলে আর ফিরবে না। তখন সেপারেট পার্সেলে ডাকযোগে তার পার্টর্স ফিরে আসবে। একবারে আসবে না, অনেকদিন ধরে একটু একটু করে আসবে। তার মানে আমাদের জন্যে ছেলেটার ভোগান্তি আর আমাদের বেনো জল ঢুকে ঘোরো জল বেরিয়ে যাওয়া…’
বড়মামার কথায় আমার ভয় পাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু আমাকে তো কেউ কোনওদিন কিডন্যাপ করেনি, তাই মনে হচ্ছিল রহস্য-রোমাঞ্চ কাহিনিতে যা পড়েছি, একেবারে মিলিয়ে দেখার সুযোগ পেলে বেশ হয়। গভীর জঙ্গলে ছোট্ট একটা গুমটি ঘরে পুরে রাখবে। একপাল হিংস্র ডোবারম্যান কুকুর চারপাশে থাকবে পাহারায়। অনেক উঁচুতে একটা ঘুলঘুলি। সেই পথে অচেনা রোদ। অজানা একটা মেয়ে খাবার আনবে। বাইরে মাঝে মাঝে শোনা যাবে গুলি-গোলার শব্দ। ঘরের ভেতর কাঠের পাটাতন। তার ওপর কুটকুটে কম্বল। একটা লোহার গেলাস। এক কুঁজো জল। বসেই আছি। বসেই আছি। কিছু খেতে চাইব না। দাড়িওয়ালা ভীষণ চেহারার একটা লোক আমাকে মেরেধরে খাওয়াতে চাইবে। আমি তার হাতে কামড়ে দেব। সে আমাকে বলবে, ইবলিশের চ্যালা।।
