‘অ্যাই, দেখেছ তো, এইবার খাঁজে-খাঁজে মিলে গেল!’
বড়মামা অবাক হয়ে বললেন, ‘এত কথা হল কেন? আমরা কোথা থেকে শুরু করেছিলুম…’
শরৎবাবু বললেন, ‘তা তো জানি না, তবে নিশ্চয় কোনওভাবে শুরু হয়েছিল। কথারও সব রুট থাকে।’
জজসায়েব বললেন, ‘শুরু হয়েছিল প্যাড ছাপা হবে কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে।
বড়মামা বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক। উত্তরটা কিন্তু পাইনি এখনও।’
শরৎবাবু বললেন, ‘পাবে কী করে? জঙ্গলে যেমন পথ হারিয়ে যায়, কথার জঙ্গলও তো সেই রকম। ওইজন্যে কথা বলার সময় একজন গাইড রাখতে হয়। যে ঠেলে ঠেলে বেলাইন থেকে। লাইনে এনে দেবে। আমার মনে আছে, এক সভায় আমি রবীন্দ্রনাথের ওপর লেকচার দিচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের ঋতু, বর্ষার গান, বর্ষাকাল করতে-করতে, আমার ছেলেবেলা, খিচুড়ি শেষে খিচুড়ি কত রকমের আছে, খিচুড়ি কীভাবে রাঁধতে হয়, চাল কতটা, ডাল কতটা, ভুনি খিচুড়ি কাকে বলে। আশ্চর্য, এই, শ্রোতারা যদি একবারও মনে করিয়ে দিত, এটা পঁচিশে বৈশাখ, রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন, রান্নার ক্লাস নয়।’
বড়মামা হেঁকে বললেন,’প্যাড কি ছাপাতে হবে?’
‘কীসের প্যাড?’
‘আমাকে পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে।’
‘লাইফ প্রেসিডেন্ট?
‘না। এই তো এইবার প্রথম করল।’
‘তা হলে এক কাজ করো, ছাপিয়ে ফ্যালো, পরে পাশে একটা এক্স লিখে দিও। এই বছরটা প্রেসিডেন্ট থাকো, পরের বছর এক্স প্রেসিডেন্ট। ডাক্তারি তো চুটিয়ে করলে এতকাল, এইবার একটু সামাজিক হবার চেষ্টা করো। টাকাপয়সা দিয়েই হোক যেভাবেই হোক, কিছুকিছু সঙ্ঘ। সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। তোমার তো আটটা কুকুর, আঠারোটা গরু, তিন খাঁচা পাখি, তিরিশটা বেড়াল। এখন ওয়াইল্ড লাইফটা খুব পপুলার হয়েছে। তুমি ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফের সঙ্গে জড়িয়ে যাও। দেখবে, খুব ইজ্জতদার ব্যাপার।’
জজসায়েব উঠে পড়লেন, ‘আমি তা হলে চলি।’
বড়মামা বললেন, ‘চলবে? যাক সাইকেলটা তুমি তা হলে পেয়েই গেলে। ভালোই হল।’
‘আপনার কাছে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। নিজের সাইকেলটা পাঠিয়ে দিয়ে আপনি আমাকে আরও লজ্জিত করতে চাইছিলেন। এ-সবই আমার স্ত্রী-র কীর্তি। জানেন তো, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়। আমার দেখুন কোনও ডাঁট নেই। আমার স্ত্রী-র সাঙ্ঘাতিক ডাঁট। জজসায়েবের বউ বলে। মাটিতে যেন পা পড়ে না।’
‘ও তুমি ছেড়ে দাও। ও আমার মেয়ের মতো। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল।
সেই স্বদেশী আমলে এই বাড়িতে একবার ইংরেজ-পুলিশ এসেছিল আর এই একবার দিশি পুলিশ এল। আমাকে তো প্রায় হাতকড়া পরিয়েই ফেলেছিল। ভয়েই মরি। আর সত্যিই তো, সাইকেলটা তো চুরিই হয়েছিল।’
মেজোমামাকে নিয়ে জজসায়েব বেরিয়ে গেলেন।
মুকুন্দ বললে, ‘ব্যাপারটা কী হল?
বড়মামা বললেন, ‘কী আবার হবে, নেহাত খাতির ছিল বলে চুরি করেও রেহাই পেয়ে গেলুম। পুলিশ চাকরি বাঁচাবার জন্যে কার একটা সাইকেল এনে আপনার সাইকেল বলে দিয়ে গেছে। সাইকেল তো আর মানুষ নয়। সব সাইকেলই একরকম দেখতে।’
‘বড়দা, সেই কারণেই তো আমার ভুলটা হল।’
‘যা ব্যাটা খুব বেঁচে গেলি। চোরাইমাল আর বাড়িতে রাখিসনি, রাত হয়ে গেছে, গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আয়।’
‘হ্যাঁ, ফেলে দিয়ে আসব। ওই তো আপনার জজের বাড়ি। দাওয়া থেকে মাল হাওয়া হয়ে গেল। জজসায়েবও চোরাই সাইকেল চাপবেন, আমরাও চোরাই সাইকেল চাপব। একেই বলে, চোরে চোরে মাসতুতো ভাই।’
শরৎবাবু চটাপট চটাপট হাততালি দিয়ে বললেন, ‘তোফা, তোফা, ঠিক জায়গায় ঠিক কোটেশন। কোটেশন ছাড়া জীবন অচল। আচ্ছা, এখন আমার কথাটা হল, আমি কী করব, আমার তো কোনও কাজ নেই। কেউ কিছু খেতেও দিচ্ছে না। আমি কি তা হলে আবার শুয়ে পড়ব?’
মাসিমা বললেন, ‘আপনার এখনও খাওয়ার সময় হয়নি। হলে, আপনাকে খেতে দেব। শুধু এককাপ চা খাবেন।’
‘তোমরা দেখছি আমাকে না খাইয়ে মারবে। যাক গে, হারমোনিয়াম আছে?’
‘হারমোনিয়াম কী করবেন?’
‘বাঃ, এই সন্ধেবেলা তোমাদের একটু উচ্চাঙ্গ ভজন শোনানো আমার কর্তব্য। শুধু খেলুম দেলুম মরে গেলুম—এটা কোনও জীবন হল না রে ভাই। জীবনকে ক্লাসিক্যাল সংগীতের মতো খেলাতে হয়। ক’টা বাজল এখন?
‘ওই তো আপনার সামনেই দেয়াল-ঘড়ি।’
‘সাড়ে ছয়। তার মানে এখন ইমন চলতে পারে। তারপর বেহাগ। বেহাগের পর খাওয়া। কেমন? ভদ্রলোকের চুক্তি।’
মুকুন্দর ভীষণ গানবাজনার শখ। সঙ্গে সঙ্গে হারমোনিয়াম নিয়ে চলে এল। মুকুন্দ আবার তবলা বাজায়। হারমোনিয়ামটি ডিভানে রেখে বলল, ‘তবলাটা নিয়ে আসি?’
‘তবলা? তুমি তবলা জানো? উত্তম, উত্তম। নিয়ে এসো। তবলা ছাড়া গান হয়?’
‘আমি আবার গানও জানি। দক্ষিণ ভারতীয় মার্গসংগীত।’
‘সর্বনাশ! সে তো আবার খুব গুরুপাক। আমার যখন ম্যালেরিয়া হয়, তখন উত্তর ভারতীয় সব গান দক্ষিণ ভারতীয়ের মতো হয়ে যায়। তুমি ম্যালেরিয়া ছাড়াই ওই গান গাইতে পারো?’
‘আমি শিখেছি যে!’
শরৎবাবু একপাট হারমোনিয়াম বাজিয়েই গাঁক করে গান ধরলেন। বাঘ যেভাবে মানুষ ধরে, ঠিক সেইভাবে গানটা ধরলেন। মরা মানুষও চমকে উঠবে। একলাইন গেয়ে গান থামিয়ে। বললেন, ‘সবসময় গলা ছেড়ে গান গাইবে। গলা একেবারে চাপবে না। আমার গুরু বলতেন, গলা দিয়ে গান গাইবে না, গান গাইবে পেট থেকে।’
