‘আহা! বেশ হয়েছে, বেশ হয়েছে,’ বলে পার্থবাবু বেশ গপাগপ খেতে লাগলেন। চোখে-মুখে। একটা রেশমকোমল ভাব ফুটে উঠল। আর ঠিক সেই সময় শরৎবাবু এলেন। ঘরের মাঝখানে এসে বিশাল একটা হাই তুলে বললেন, ‘আঃ, যাকে বলে গভীর ঘুম, সেইরকম একটা ঘুমে রুপোর টাকার মতো তলিয়ে ছিলুম। আমার সিস্টেমের একটা মজা আছে, কত পরিশ্রম করলে তবে মানুষের হজম হয়, আর আমার দ্যাখো, এক ঘুম এক হজম। মানে সিরিজটা দ্যাখো, খেলুম, ঘুমোলুম, হজম করলুম। আবার খেলুম।’
চেয়ারে বসতে বসতে প্রশ্ন করলেন, ‘কারও কিছু বলার আছে? আমি জানি আছে। তোমরা প্রশ্ন করবে, তা হলে লেখাপড়াটা কখন হবে? হবে। এরই ফাঁকে ফাঁকে হবে। খাওয়ার পর তোমরা জানো যে, মানুষ ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। সেই ক্লান্তি কাটাবার জন্যে নিদ্রা। নিদ্রা থেকে উত্থান এবং আর-একটা আহারের মাঝে যদি সময় থাকে তা হলে একটু লেখা হল, একটু পড়া হল। আসলে আহারের জন্যেই বাঁচা।’
শরৎবাবু একটা হাই তুললেন। সকলের মুখের দিকে এক-একবার তাকালেন একটু বিব্রতভাবে। শেষে প্রশ্ন করলেন, ‘কথাটা কি ঠিক বললুম? আমার আজকাল হয়েছে কী, সব ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, জানা জিনিসও গুলিয়ে যাচ্ছে। কথাটা কী ভাই, আহারের জন্যে বাঁচা, না বাঁচার জন্যে আহার। সেই যাই হোক, দুটো কথাই এক। এখন আমার প্রশ্ন হল, এই মুহূর্তে কিছু খেতে হবে কি? তা হলে আমি মোটামুটি প্রস্তুত।’
জজসায়েবের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন শরৎবাবুর দিকে।
বড়মামা পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি আমার বিদ্যা জীবনের একান্ত সুহৃদ রায়বাহাদুর ঈশ্বর শ্রীজলধর চট্টোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান লেখক শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।’
শরৎবাবু সঙ্গে-সঙ্গে আপত্তি তুললেন, ‘দুটো কারেকশান। প্রথম নামে। আগে চন্দ্র ছিল, পাছে আর এক বিখ্যাত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের সঙ্গে কেউ গুলিয়ে ফেলেন, তাই চন্দ্রটা আমি অফ করে দিয়েছি। এখন সহজ-সরল শ্রীশরৎ চট্টোপাধ্যায়। দ্বিতীয় আমি লেখক নই। আমি কবি। কবি শ্ৰীশরৎ চট্টোপাধ্যায় হল আমার সঠিক পরিচয়। তৃতীয় আমার পরিচয়লিপিতে একটু অসম্পূর্ণতা থেকে গেছে। আমি শুধু কবি নই, আমি শিকারি, আমি পক্ষীতত্ববিদ, আমি নেচারোপ্যাথিস্ট। আরও অনেক পরিচয় আছে আমার। পরে মনে পড়লে বলব। আমি আবার আত্মপ্রচার তেমন পছন্দ করি না, তাই সব কিছু তেমন মনে রাখি না। যেমন এইমাত্র আমার মনে পড়ল দুর্গাপুজো কমিটির আমি পার্মানেন্ট প্রেসিডেন্ট।’
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘এবার আমাকেও স্থানীয় পূজা কমিটির প্রেসিডেন্ট করেছে। আজই চিঠি পেয়েছি সকালে। আচ্ছা, প্রেসিডেন্ট হলে কি নিজের নামে আলাদা করে প্যাড ছাপাতে হবে? তুমি তো শরৎ এইসব ব্যাপারে আমার চেয়েও অভিজ্ঞ।’
‘অভিজ্ঞ তো বটেই। আমাকে ছাড়া কোনও সঙ্, সংগঠন অন্য কাউকে প্রেসিডেন্ট হিসাবে ভাবতেই পারে না। প্যাড তো তোমাকে ছাপাতেই হবে। আমার প্যাডের মাথাটা দেখেছ? তিন থেকে চার ইঞ্চি চওড়া পার্টির মতো পরিচয়-লিপি। চিঠি লেখার মতো সাদা জায়গা খুঁজে বের করতে হয়। উঃ, একটা মানুষের এত পরিচয়ও থাকে। এই দ্যাখোনা, এখন সব মনে পড়ছে একে-একে। জামালপুর হিন্দু সক্কার সমিতির অনারারি প্রেসিডেন্ট। জামালপুর হরিসভার সহ সভাপতি, ঘাস-সংরক্ষণ সমিতির চেয়ারম্যান। বিশ্ববিস্মরণ সংস্থার সদস্য।’
জজসায়েব বললেন, ‘বিস্মরণ সংস্থাটা কী?’
‘সেটা হল গিয়ে বেশ মজার সংস্থা। পৃথিবীতে বহু মানুষ আছে যারা ভুলে যায়। কোনও কিছু মনে রাখতে পারে না। যাকে বলে ফরগেটফুল। এই ছাতা কোথায় রাখছে, এই ব্যাগ কোথায় রাখছে, বাবার নাম ভুলে যাচ্ছে, বাড়ির ঠিকানা ভুলে যাচ্ছে। এমন কত লোক আছে এই বিশাল পৃথিবীতে হারিয়ে বসে আছে, নিজের পরিচয় ভুলে। এদের সাহায্য করাই হল বিশ্ব-বিস্মৃতি সংস্থার কাজ। আমাদের টেলিফোন নম্বর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া আছে। আমাদের ফোন করলেই আমরা সঙ্গে সঙ্গে সাহায্য করব। হয়তো ফোন এল, বলতে পারেন, আমার নোট লেখা ডায়েরিটা কোথায় রেখেছি। আমরা বলব, নাম-ঠিকানা বলুন। যে-ই নাম ঠিকানা পেলুম, সঙ্গে সঙ্গে শাঁ-শাঁ করে আমাদের ভলান্টিয়ার পার্টি চলে গেল। তিন মিনিটে বের করে দিয়ে এল। ডায়েরি। একজন বক্তৃতা করছেন। নাম ভুলে গেছেন। থিওরি অব রিলেটিভিটির প্রবক্তার। আমাদের কাছে ফোন এল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলুম, বার্ট্রান্ড রাসেল। সঙ্গে সঙ্গে বক্তৃতা চালু হয়ে গেল।’
জজসায়েব বললেন, ‘রাসেল নয়, আইনস্টাইন।’
‘অ, আইনস্টাইন। সে ব্যবস্থাও আমাদের আছে। আমাদের সাহায্যকারীরা যখন কিছু বলে, তখন তার পাশে একজন তার পাশে আর-একজন তার পাশে আরও একজন—পরপর সব লাইন দিয়ে বসে থাকে। এ ভুল করল তো ও সংশোধন করল, ও করল তো সে সংশোধন করল। টু ফরগিভ ইজ হিউম্যান, টু আর ইজ ডিভাইন। না, কথাটা কেমন হল। ঠিক যেন জয়েন্টে জয়েন্টে লাগল না। অ্যাই দেখুন। একে বলে বিস্মরণ। আমাদের সংস্থার কেউ পাশে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে দিত। কোটেশন হল ইলেকট্রিকের লাইন টানার মতো। ঠিক না হলে ধরা যায়। এই। যেমন আমি ধরতে পারছি, ঠিক করতে পারছি না।’
মেজোমামা বললেন, ‘ওটা হবে, টু আর ইজ হিউম্যান, টুফরগিভ ডিভাইন।’
