মেজোমামা বললেন, ‘জানা থাকলে, অনুগ্রহ করে বলে দিয়ে পরিস্থিতিটা একটু শান্ত করুন না।’
‘প্রশ্নটা আমার মগজেও আজই এল। সবসময় সব প্রশ্ন তো মাথায় আসে না। প্রশ্ন হল অর্কিডের ফুলের মতো। কোনও কোনও অর্কিডে ষাট বছরে একবারই হয়তো ফুল ফুটল। আমার মনে হয়। উচ্ছে আর করলা হল মাছের পিত্ত, কি মানুষের গলব্লাডারের মতো ফলরূপী পিত্তথলি। এর। ভেতর একটা বিটার প্রিন্সিপল আছে। যেমন আছে হপস গাছে। উত্তরটা ঠিক মনের মতো হল না; তবে একেবারে না হওয়ার চেয়ে তো ভালো।’
মাসিমা শরৎবাবুকে থামাবার জন্যে বললেন, ‘আমাদের শাস্ত্রে আছে খেতে বসে যত কম কথা বলবেন ততই ভালো।’
‘ওটা তোমার বোন, দিশি শাস্ত্র। বিদেশে অচল। বিদেশে লাঞ্চ আর ডিনার হল, খাও, গল্প করো, আলাপ-আলোচনা করো। সেদেশের নিয়ম হল, লিভ টুইট, নট ইট টু লিভ। না দাঁড়াও, গুলিয়ে গেছে। এই ধরনের কোটেশন ভীষণ ডেঞ্জারাস। মানে বাংলাটা হল, বাঁচার জন্যে খাও, খাওয়ার জন্যে বেঁচো না। এইবার ধরে-ধরে ইংরেজিটা করি—ইট টু লিভ, নট লিভ টু ইট। অ্যাাঁ, এইবার হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদ হল ইলেকট্রিক্যাল ওয়্যারিং-এর মতো। এক লাইন থেকে আর-এক। লাইনে ধরে-ধরে এগোতে হয়।’
শরৎবাবু কথা বললেও আমরা চুপচাপ খেয়ে চলেছি। মাসিমা আজ মোট ষোলো রকম রান্না করেছেন। আর-একটু সময় পেলে বিশ-তিরিশরকম তো হতই।
বড়মামা বললেন, ‘এত সব খাওয়ার আয়োজন; কিন্তু অপরাধীর মন নিয়ে কি খাওয়া যায়! এ মনে হচ্ছে ডেডবডি ট্রাঙ্কে ভরে রেখে আমরা খেতে বসেছি। এ মনে হচ্ছে, সাইকেলের কবরে বসে খুনির খানাপিনা।’
শরৎবাবু ‘ওয়া ওয়া’ করে বললেন, ‘অসসাধারণ একটা কবিতার লাইন। শুধু সাইকেল শব্দটা হাটাতে হবে। লাইনটা হবে, গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা খুন পল কাটা গেলাসে গেলাসে।/জীবন যদিও এক তিক্ত করলা /বসে আছি মুখোমুখি তড়িৎ প্রবাহ ধরে।’
শরৎবাবু মাছের মুড়ো ফেলে উঠে দাঁড়ালেন।
মাসিমা বললেন, ‘কী হল?’
শরৎবাবু বললেন, ‘আর কী হল! এসে গেল। কবিতার লাইন জগতের ওপার থেকে ভেসে আসে ইথার তরঙ্গে। ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে কী সঙ্গীত ভেসে আসে।’
‘আসুক না, আপনি খেয়ে নিন।’
‘পাগল হয়েছ! ভেসে বেরিয়ে যাবার আগে আমার রিসিভারে ধরে রাখতে হবে। আমার ডায়েরি, আমার কলম।’
‘আপনি খান, আমি লিখে রাখছি।’
শরৎবাবু শান্ত হয়ে বসলেন। মাসিমা একটা সন্দেশের কৌটোতে ফেল্টপেন দিয়ে লিখতে বসলেন। ফ্রিজের মাথাটা হয়েছে টেবিল।
মাসিমা বললেন, ‘বলুন।’
‘খুনিদের কবরে বসে। না, কীসের যেন কবর বললে?’
আমি বললুম, ‘আমার পুরোটা মনে আছে। বলব? গতির কবরে বসে খুনিদের খানাপিনা। কলিজার করমচা-খুন পল-কাটা গেলাসে গেলাসে। জীবন যদিও এক তিক্ত করলা। বসে আছি। মুখোমুখি তড়িৎ-প্রবাহ ধরে।’
‘ওয়া ওয়া’। শরৎবাবু সব ভুলে, তাঁর ঝালঝোল মাখা ডান হাত দিয়ে আমার পিঠটা বার কয়েক চাপড়ে দিলেন।
মাসিমা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘বুড়ো, যাও, উঠে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে আগে চান করে এসো।’
৪.
শরৎবাবু এত খেলেন যে, শেষ পর্যন্ত মুকুন্দর সাহায্য নিয়ে তাঁকে খাওয়ার টেবিল থেকে উঠতে হল। তিন-চারটে বিশাল ঢেকুর তুললেন। মাসিমাকে বললেন, ‘তোমার উচিত ছিল আমাকে এক সময় থামিয়ে দেওয়া। তুমি জানো না, দুটো জিনিসে আমার জ্ঞান থাকে না। এক রেগে গেলে, আর খেতে বসলে। এত চাপ খাওয়া আমার উচিত নয়। হার্টের তো আর তেমন জোর নেই। এর মধ্যে দুবার ধাক্কা খেয়েছে। এখন গুড আর ব্যাড, কিছু একটা হয়ে গেলে আমার আর কী, তোমরাই বিপদে পড়ে যাবে।’
আমি আর মুকুন্দ শরৎবাবুকে ধরে ধরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিলুম। শুয়ে পড়ে বললেন, ‘আমার আবার অজগরের স্বভাব। পেটে চাপ পড়লেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসে। শোনো, তোমার মাসিকে বোলো, ওই যে ওই বিশকোর্মা, ওইটা এক বাটি সরিয়ে রাখতে। যদি মরে না যাই রাতে আবার মুখোমুখি হব। মরতে আমি ভয় পাই না। জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন, শত মাংস, শত মৎস্য আসিবে আসুক।’
ঘাঁড়াক করে একটা শব্দ হল। শরৎবাবুর নাক গর্জন করতে লাগল কামানের মতো।
মুকুন্দ বললে, ‘বেশ মজার মানুষ, তাই না? এইরকম দু-তিনজন বাড়িতে থাকলে ড্রামা একেবারে জমে যাবে।’
‘তোমার আর কী বলল, আমাকে যা ধরেছিলেন না! সেই বাগান থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত। বাব্বা, এ যেন ছেলে ঘুমোল, পাড়া জুড়োল।’
বসবার ঘরে বড়মামা আর মেজোমামা বসে আছেন, দুটো ডেক-চেয়ারে। মাসিমা এইমাত্র এলেন। মুকুন্দ বসে আছে এক পাশে। মুকুন্দ বললে, ‘এটাকে চুরি বলে না বড়দা, একে বলে বদলাবদলি।’
বড়মামা বললেন, ‘চুপ কর। তোর, তোর, তোর…।’
মেজোমামা শেষ করে দিলেন, ‘কথা বলার কোনও অধিকার নেই।’
বড়মামা বললেন, ‘না, না, আমি ও কথা বলতে চাইনি। আমি বলতে চেয়েছিলুম, তোর জন্যে আজ আমার এই অবস্থা। অমন কিশমিশ-টিসমিস দেওয়া ছানার কালিয়া, মনে হল ঘুটের কালিয়া খাচ্ছি।’
মেজোমামার অভিমান হল। বললেন, ‘এবার থেকে নিজের কথা নিজেই শেষ কোরো। আটকে গেলে আমি আর সাহায্য করব না। অধিকার নেই বললে এক কথায় মিটে যায়। অত কথা এই বিপদের সময় বলার দরকার কী?’
মাসিমা বেশ আয়েশ করে বসে বললেন, ‘আচ্ছা, ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলো তো। তখন থেকে চলেছে।’
