মুকুন্দ এগিয়ে এল, ‘আমি আপনাকে ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।’
মাসিমা বললেন, ‘সে আবার কী, এ তোমার বাড়ির প্ল্যান না জ্যামিতি, যে ছবি আঁকতে হবে।’
মেজোমামা বললেন, ‘ওকে আজ ছবি-ভূতে ধরেছে। আসলে কেসটা হল কীরকম জানিস, বদলাবদলি চুরি। অর্থাৎ পালটিঘরে চুরি। মানে, আমরা পার্থর সাইকেল চুরি করেছি, পার্থ আমাদের সাইকেল চুরি করেছে।’
বড়মামা বললেন, ‘যাঃ, কী যা-তা বলছিস! কোনও একটা জিনিস ভালোভাবে বুঝিয়ে বলতে পারিস না, প্রোফেসর হয়েছিস!’
পাশের টেবিলের ওপর থেকে খপ করে পাইপটা তুলে নিয়ে মেজোমামা উঠে দাঁড়ালেন।
বড়মামা বললেন, ‘কী হল? তোর আবার কী হল!’
‘কথায় কথায় তোমার অপমান আমার আর সহ্য হয় না। তোমার সমস্যা তুমি সামলাও। আমারই ভুল হয়েছে তোমার ব্যাপারে নাক গলাতে যাওয়া।’
বড়মামা বললেন, ‘আমিও লক্ষ করছি, আজকাল আমার কোনও কথাই যেন তোমাদের সহ্য হচ্ছে না। যা বলছি তাইতেই গায়ে সব বড় বড় ফোসকা পড়ে যাচ্ছে। ঠিক আছে, আমিও তা হলে চলে যাই। যা হয় হবে। আমার কী। চিরকাল শুনে এলুম, ডিভাইডেড উই ফল, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড।’
ইশ, বড়মামার গায়েও শরৎবাবুর বাতাস লেগেছে। কোটেশন উলটে যাচ্ছে।
মাসিমা বললেন, ‘তোমরা দুজনে যদি সাপে-নেউলে হও, তাহলে এইবার কিন্তু আমাকে লাঠিই ধরতে হবে। লাঠিই হল তোমাদের ঠান্ডা রাখার ওষুধ। বয়েস-টয়েস আমি আর মানব না। চুপ করে দুজনে বোসো। সমাধান যদি চাও কেসটা আমাকে খুলে বলো।
মেজোমামা বসলেন। বড়মামা বললেন, ‘পরে তোর প্রেশারটা আমি একবার চেক করব।’
মেজোমামা বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি আমার বিবৃতিতে ভুলটা কোথায় হচ্ছিল। আমার প্রেশার নয়, আমার অহঙ্কারটা মাপার দরকার হয়েছে। আমি আবার শুরু থেকে শুরু করি। আমরা পার্থর সাইকেলটা চুরি করেছি আর পার্থ আমাদের সাইকেলটা চুরি হওয়ায় সাহায্য করেছে।’
বড়মামা বললেন, ‘দ্যাটস রাইট। এইবার বিবৃতিটা ঠিক হল।’
মুকুন্দ বললে, ‘আমি একটু বলি, কারণ এটা আমার কেস।’
মাসিমা বললেন, ‘বলো।’
‘এটা চুরি নয়, ভুল। আসলে আমাদের সাইকেলটাই চুরি হয়েছে কিন্তু মনে হচ্ছে চুরি গেছে জজসায়েবের সাইকেল।’
‘সে আবার কী! গোয়ালের পাশে যে সাইকেলটি চট চাপা দিয়ে এলুম, সেটা তা হলে কার সাইকেল?’
‘ওইটাই তো জজসায়েবের সাইকেল।
‘কে এনেছে?
‘আমি এনেছি।’
‘না বলে?’
‘হ্যাঁ, না বলে।’
‘তা হলে! শোনোনি তুমি! না বলিয়া পরের দ্রব্য গ্রহণ করাকে চুরি বলে।
‘আমি তো চুরি করব বলে চুরি করিনি। চুরির মতো দেখাচ্ছে।’
‘উঃ, বাব্বা রে! কী পাল্লায় পড়েছি রে!’
‘আপনি পুরোটা না শুনলে তো বারেবারেই মনে হবে। আমি জজসায়েবের বাড়ির রকে জজসায়েবের সাইকেলের পাশে আমাদের সাইকেলটা রেখে ভেতরে গেলুম। তা হলে বাইরে পাশাপাশি রইল দুটো সাইকেল। কেমন? এইবার কী হল, সার্টিফিকেট নিয়ে আমি বাইরে এলুম। দেখলুম রয়েছে একটা সাইকেল। আমি সাইকেল চেপে চলে এলুম। গোয়ালের বাইরে সাইকেল রেখে লেগে গেলুম কাজে। তা হলে ব্যাপারটা কী হল? চুরি হল কি?’
মাসিমা বললেন, ‘ঘোড়ার ডিম হল। এই নিয়ে এত কান্ড। আসলে কোনও সাইকেলই চুরি হয়নি। বদলাবদলি হয়েছে। গিয়ে দেখে এসো, তোমাদের ঝরঝরে সাইকেল আবার ফিরে এসেছে যথাস্থানে।’
বড়মামা বললেন, ‘তা হলে ওরা থানায় রিপোর্ট করল কেন?
করবে না! ওদের সাইকেলটা তো নেই।’
‘তা অবশ্য ঠিক। এখন তা হলে কী হবে?
‘সোজা ব্যাপার। এই সাইকেলটা চেপে তোমরা কেউ যাও, এটা ফেরত দিয়ে ওইটা চেপে ফিরে
এসো।’
‘কে যাবে, মুকুন্দ?
‘না, তোমরা কেউ যাও।’
মেজোমামা বললেন, ‘আমিই তা হলে যাই?’
‘মেজোমামা আমাকে বললেন, ‘যাবে নাকি?’
আমরা দুজনে বেরিয়ে পড়লুম। বাগান থেকে জানলা দিয়ে দেখতে পেলুম, শরৎবাবু কুম্ভকর্ণের মতো চিত হয়ে শুয়ে আছেন। নাক ডাকছে তুমুল শব্দে।
মেজোমামা বললেন, ‘উঃ, মানুষের কী কষ্ট! কোথায় যেন যাবার কথা ছিল, কী হল?’
‘উনি তো সবই ভুলে যান, তা ছাড়া বলছিলেন খাওয়ার পর অজগর হয়ে যান। ছেড়ে দিন
আপনি।
মেজোমামা সাইকেলে উঠে একটু লগবগ করলেন। তারপর রাস্তার একপাশে কাঁচা নর্দমার ধারে কাত হয়ে গেলেন। ভাগ্য ভালো, লম্বা মানুষ, তাই মাটিতে পা ঠেকিয়ে কোনওরকমে সামলে নিলেন। সেই কাত-অবস্থাতেই বললেন, ‘ম্যাগনেট যেমন লোহাকে টানে, সেইরকম নর্দমা টানে সাইকেলকে। দাঁড়াও আবার একবার গোড়া থেকে শুধু করি।’
মেজোমামা অনেক কায়দায় সাইকেল থেকে নামলেন। নামতে গিয়ে অমন সাধের পাইপটা বুকপকেট থেকে ছিটকে পড়ে গেল নর্দমায়। রাগে মেজোমামার মুখটা লাল হয়ে গেল—উনুনের নিবে-আসা আগুনের মতো। ভড়ভড়ে নর্দমায় রুপোর ঠোঁটওয়ালা পাইপটা ভেসে রইল।।
মেজোমামা বললেন, ‘কত বড় ক্ষতিটা হয়ে গেল একবার দেখলে? এই সাইকেলটা হল অপয়া। সাইকেল। সেই সকাল থেকে জ্বালিয়ে মারছে।’
‘মেজোমামা, আপনার যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না। বাধা পড়ে গেছে।’
‘সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ তুমি। তা না হলে আমার মতো পাকা সাইক্লিস্টের এই অবস্থা হবে কেন? চলো, ফিরেই যাই।’
মেজোমামার কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, হুশ করে একটা মোটরগাড়ি এসে গেল। গাড়িটা আমাদের থেকে কিছু দূর গিয়েই ঝপ করে থেমে গেল। গাড়ির পেছনের জানলা দিয়ে একটা মুখ বেরিয়ে এল। জাস্টিস পার্থ ব্যানার্জি। পার্থ ব্যানার্জি বললেন, ‘আরে কী ব্যাপার! চলেছ কোথায়? আমি তো তোমাদের বাড়ি যাচ্ছি বড়দার কাছে ক্ষমা চাইতে। ছিঃ ছিঃ, কী জঘন্য কাণ্ডটাই না ঘটে গেল।’
