‘আজ্ঞে।’
‘হঠাৎ খাওয়ার কথা এল কেন?’
‘তা তো জানি না। আপনি বললেন, তাই বললেন?’
এইবার আমি বেঁচে গেলুম। মাসিমা দূর থেকে ডাকলেন, ‘তোমাকে আবার কী রোগে ধরল?’
বলতে পারলুম না, শরৎবাবু ধরেছেন।
মাসিমা আবার চিৎকার করলেন, ‘শরৎদা, কী হল আপনার? শরৎবাবু মাসিমাকে উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা এখানে দাঁড়িয়ে কেন?’
‘ওই যে আপনি নানারকম কথা বলছিলেন।’
‘হ্যাঁ বলছিলুম। কথা তো বলারই জন্যে। তাতে কী এমন অপরাধ হয়েছে যে তুমি আমার নামে কমপ্লেন করছ।’
আমি এতক্ষণে ভদ্রলোককে মোটামুটি বুঝে গেছি। বেশ একটু অপ্রকৃতিস্থ। বড়মামা বলছিলেন, ‘শরৎবাবু বেশ বড় ঘরের ছেলে ছিলেন। তারপর যা হয়। নিজে একজন গ্রন্থকীট। লেখাপড়ায় সাঙ্ঘাতিক ভালো ছিলেন। স্কুলের ফার্স্ট বয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। কলেজে পড়ার সময় মাথার সামান্য গোলমাল হয়। সেই সময় আত্মীয়রা বিষয়সম্পত্তি মেরে পথে বসিয়ে দিয়েছিল। শরৎবাবুর বড় বোন সন্ন্যাসিনী। তিনিই ভাইকে সুস্থ করেন, মানুষ করেন। চাকরি করে দেন। এখন শরৎবাবুর কেউ কোথাও নেই। শরৎবাবুর পিসিমা মারা যাবার আগে ছোট একটা বাড়ি দান করে গেছেন। চাকরিও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।’
‘যাই’ বলে আমি দৌড়োতে শুরু করলুম। এ ছাড়া শরৎবাবুর হাত থেকে বাঁচার রাস্তা ছিল না।
খাবার ঘরে এলাহি আয়োজন। বড়মামা, মেজোমামা বসে পড়েছেন। উলটো দিকে শরৎবাবুর স্থান। তার পাশে আমি। শরৎবাবু মনে হয় হাসছেন। তিনি কখনও কবি। কখনও বোটানিস্ট, অ্যানথ্রোপলজিস্ট। কখন যে কী! তিনি পক্ষীতত্ববিদ হয়ে প্রবেশ করলেন। হাতে একটা বড় পালক। কোথায় খেতে বসবেন, না পালকটা তুলে সকলকে দেখাচ্ছেন আর বলছেন, ‘এই পালকটা কোন পাখির তা আমি বলতে পারব না, তবে অবশ্যই কোনও বড় পাখির। বড় পাখির মধ্যে কী কী আছে—উটপাখি, ধনেশ পাখি।’ মাসিমা ছোঁ মেরে পালকটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বললেন, ‘এটা কাকের পালক। যান, হাত ধুয়ে খেতে বসুন।’
শরৎবাবু বেসিনে হাত ধুতে ধুতে বললেন, ‘ঠিক কাক নয়, দাঁড়কাক। জ্যাক ড।’
‘আচ্ছা, দাঁড়কাক, এখন আপনি দয়া করে বসে যান।’
মুকুন্দ পনপন করে লাড়ুর মতো চারপাশে ঘুরছে। এটা ঠিক, মাসিমার হাতের মতো রান্না হয় না। মুকুন্দর মতো পরিবেশন। শরৎবাবু প্রথমে একটুকরো লেবু নুন মাখিয়ে চুষলেন। চুষেই টকটাক-টকটাক বিকট শব্দ। সকলেই চমকে উঠলেন। শরৎবাবুর সেদিকে কোনও খেয়াল নেই। চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘বাপস, টক বটে।’
মাসিমা বললেন, ‘শুধু শুধু লেবু খাচ্ছেন কেন?’
‘আপ রুচি খানা, পর রুচি পরনা।’ বলেই আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মটকে বললেন, ‘লক্ষ করলে, কোটেশনটা কীরকম কটাস করে লাগিয়ে দিলুম। এইসব লক্ষ করবে। অ্যাপ্রিসিয়েট করবে। ভালো গান শুনতে শুনতে মানুষ যেমন ওয়া ওয়া করে সেইরকম করবে। লেবু কেন। খেলুম বলো তো! অ্যাসিড সাইট্রিক। এই অ্যাসিড দিয়ে পেটে একটা বাতাবরণ তৈরি করলুম। শব্দটা লক্ষ করো, বাতাবরণ। মানে ক্লাইমেট। বাংলা শব্দ কীভাবে ব্যবহার করতে হয় শেখো শেখো। শুধু হনুমানের মতো হাঁউ-হাঁউ করে খেলেই হবে? বাড়ি করতে গেলে সবার আগে যেমন একটা ফাউন্ডেশান করতে হয়, সেইরকম এই লেবু হল খাওয়ার ফাউন্ডেশান। এইবার যা কিছু পেটে ঢুকবে এই অ্যাসিড একেবারে ক্ষুধার্ত বাঘের মতো অ্যাটাক করবে। পেটের ভেতর চালু হয়ে যাবে একটা কেমিকেল ফ্যাকট্রি। সমস্ত খাদ্যকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে একেবারে পালপ করে ফেলবে। এর ইংরেজি নাম হল কাইল।’
শরৎবাবু বড়মামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ডাক্তার, তুমি এইসব জানো? জানো তো ছেলেটাকে শেখাও না কেন? পৃথিবীটা হল জ্ঞানের পৃথিবী। তোমাদের বাড়িটাকে কীরকম করে রেখেছ জানো, নলেজ, নলেজ, এভরি হোয়্যার নট এ ড্রপ টু ড্রিংক। মেজোবাবু কোটেশনটা কি চেনা-চেনা মনে হল? একটা শব্দ কেবল বদলে দিয়েছি। তুমি সাহিত্যের লোক হয়ে চিনতে পারছ না! আশ্চর্য!’
মেজোমামা বললেন, ‘পারব না কেন? ওয়াটার ওয়াটার এভরি হোয়্যার। ওয়াটারের জায়গায় নলেজ।
‘ওয়া ওয়া! তা কার লেখা?
‘কোলরিজ।’
‘ওয়া ওয়া। এই হল নিয়ম। খাওয়ার টেবিলটাকে জ্ঞানের টেবিল করে তুলতে হয়। দেহের আহার আর মনের আহার অ্যাট এ টাইম। দেহও খাচ্ছে আর মনও খাচ্ছে। কেমব্রিজ, অক্সফোর্ড, হ্যারো আর ইটনে এই জিনিস হয়। ডিনরা সব ডিনার টেবিলে বসে এইরকম জ্ঞানের আলোচনা করতে করতে কী যে করে ফেলেন না! বড় বড় থিসিসের আইডিয়া বেরিয়ে আসে। এই যেমন ধরো, করলা। এই যে সরষে বাটা দিয়ে করলা হয়েছে। গুড আইটেম। খেলেই খাওয়া। এর। মধ্যে জ্ঞান আর নলেজটা কী আছে? ভীষণ জ্ঞান আছে। করলা কেন তেতো! তিক্ত কেন করলা!’
শরৎবাবু একটা করলার টুকরো মুখে পুরে কৌতূহলী হয়ে সকলের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন।
মেজোমামা বললেন, ‘এটা আপনার গিয়ে কেমিস্ট্রি ঘেঁষা প্রশ্ন। এর উত্তর আমার জানা নেই।’
শরৎবাবু আর একটা করলা মুখে পুরে বললেন, ‘এইটাই হল আমার জীবনের ট্র্যাজেডি। সারাজীবন আমি প্রশ্ন করে গেলুম, একের পর এক। কদাচিৎ একটা-দুটোর উত্তর পেলুম। বাকি সব নিজের উত্তর নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়েছে। তোমরা মোটেই অনুসন্ধিৎসুনও। দিনের পর দিন করলা খাচ্ছ, অথচ একবারও তোমাদের মনে প্রশ্ন এল না! আশ্চর্য! অত্যাশ্চর্য!’
