এইবার মাসিমার অ্যাকশন শুরু হল। রক থেকে নেমে হনহন করে এগিয়ে গেলেন গোয়ালের দিকে। হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে এলেন একলট খালি বস্তা। এই বস্তায় আসে গরুর খাবার। কেউ বুঝতে পারছেনা বড়মামার এইবার কী হবে! মাসিমা বড়মামার দিকে না গিয়ে গেলেন। সাইকেলটার দিকে। সাইকেলটাকে বস্তা চাপা দিয়ে দুই মামার সামনে এসে বললেন, ‘গেট আপ। গেট আপ। দুটো হুলোর মতো পাশাপাশি বসে ঝগড়া করলে গায়ে এইবার আমি জল ঢেলে দেব। গেট আপ। গেট আপ। তোমাদের একটা আক্কেল নেই। শরৎদার মতো একজন। মানুষকে নিমন্ত্রণ করে এনে, তোমাদের ছেলেমানুষি হচ্ছে?’
মাসিমার বকুনি খাওয়ার পর বড়মামা আর মেজোমামাকে ফাইন দেখায়। দুজনেই একটু কুঁজো আর ঢিলঢ়িলে মতো হয় যান। সেইভাবেই দুজনে ভেতর বাড়ির দিকে চললেন। পেছনে মাসিমা। মাসিমা শাড়ির আঁচলটাকে কোমরে জড়িয়ে নিয়েছেন। দেখতে তো খুবই সুন্দরী। যেন ঝাঁসির। রানি। মাসিমার পেছনে আমরা। শরৎবাবু আমার পাশে। ধীরে-ধীরে কথা বলেন। ভালোমানুষের মতো। আপনমনেই বলতে লাগলেন, ‘যখন এলুম তখন কী আনন্দের সংসার, একটুখানির মধ্যে সব কেমন বদলে গেল। নিশ্চয় সাঙ্তিক কিছু হয়েছে, তা না হলে এমন কেন করবে! কার্য ছাড়া কি কারণ হয়! না, কথাটা মনে হয় ঠিক হল না।’
শরৎবাবু ঝপ করে থেমে পড়লেন। খপ করে আমার হাত চেপে ধরলেন, ‘তোমার নামটা যেন কী ভাই?’
‘আজ্ঞে, আমার ডাকনাম বুড়ো, আর ভালো নাম হল প্রদ্যুম্ন।’
‘ইশ! সর্বনাশ হয়ে গেল। দুটো নামই পালটানো দরকার। কে রেখেছিলেন জানি না। যিনিই রাখুন, তোমার কেরিয়ারটা যে ড্যামেজ করে দেবে ভাই। বুড়ো হল নেগেটিভ নাম। তোমার স্পিরিটের গানপাউডার ড্যাম্প করে দেবে। আর প্রদ্যুম্ন ভাব তো, ইংরেজিতে লিখতে গেলে তোমার কলম দুমড়ে যাবে। আবার ভাবো তুমি বড় হয়েছ। তোমার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তোমাকে ডাকছে, প্রদ্যুম্নবাবু বাড়ি আছেন? বাড়ি আছেন প্রদ্যুম্নবাবু? উঃ ভাবা যায় না। একটা নামে এতগুলো যুক্তাক্ষর। তারপর ধরো, এই নামটাকে তো শর্ট করা যাবে না। প্রদ্যুম্নকে তুমি কীভাবে ছোট করবে? প্রদু? দ্যুম্ন? আমি তোমার একটা ভালো নাম রাখব। বেশ কাব্যিক। ইচ্ছেমতো ছোট করা যাবে। বড় করা যাবে। ইংরেজি, বাংলা দুটো ভাষাতেই সহজে লেখা যাবে। সে আমি পরে বইটই দেখে তোমাকে ঠিক করে দেব। না, না, বাজে কথা নয়, আমার কথার। ভীষণ দাম। আমার জীবনই আমার বাণী। নানা, এটাও মনে হয় উলটে গেল। এই কথাটা হবে —আমার বাণীই আমার জীবন। সন্দেহ হচ্ছে, ভীষণ সন্দেহ। এই প্রসঙ্গে এই কোটেশনটা যায় কি? আমার কী জানো, কথায়-কথায় কোটেশন। তোমাকেও বলে রাখি, কথায়-কথায় কোটেশন। দেবে। কেন বলো তো? লোকে তোমাকে জ্ঞানী ভাববে, গুণী ভাববে, পণ্ডিত ভাববে। এই শিক্ষাটা আমাকে কে দিয়েছিলেন বলো তো। জানো না! হা হতোস্মি! মামাদের কাছে আমার জীবনী শোনোনি? আমার সম্পর্কে ঘরে-ঘরে আলোচনা হয়। তোমাদের ঘরে হয় না বুঝি? আরে, সেদিন তো আমাকে নিয়ে কোন এক ইউনিভার্সিটিতে একটা সেমিনার হয়ে গেল। কোথায় যেন। পড়লুম। কোথায় যেন পড়লুম। কোথায় পড়লুম বলো তো! কোথায় ছাপা হয় এইসব সংবাদ।। দৈনিকে? সাপ্তাহিকে? পাক্ষিকে? আচ্ছা, এটাও তোমাকে আমি পরে বলে দেব। কৌতূহলটা ধরে রাখো। বলে না, সেই বলে না, যাঃ, ভুলে গেলুম। কী বলে বলো তো। আ-আ, মনে পড়েছে। সবুরে মেওয়া ফলে। কোটেশনটা ঠিক হয়নি। কথায়-কথায় কোটেশন। কিন্তু ঠিক জায়গায় ঠিক জিনিস লাগল কি না, রামে আর রামছাগলে হয়ে গেল। এইটা ঠিক লেগে গেছে। যাকে বলে। একেবারে ঘাটে-ঘাটে। এটাকে তুমি আর কাটতে পারবে না। আর তুমি কাটার কে? আমার হাঁটুর বয়সি। বলে কি না, আমার কোটেশন কাটবে?’
আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলুম। ভয়েভয়ে বললুম, ‘কই, আমি তো কিছু বলিনি!’
‘বলিনি মানে? বলবে তো! তোমার এইটুকু ভদ্রতা নেই। তুমি জানো না, কথার পিঠে কথা বলতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। ভালো লাগলে, বাহবা দিতে হয়। তা না হলে, বক্তাকে উপেক্ষা করা হয়। তুমি আমাকে উপেক্ষা করছ। ছিঃ ছিঃ, তুমি না বিমলের ভাগনে। হবেই তো, হবেই তো। তোমরা হলে একালের ছেলে। তোমাদের কাছে মুড়ি-মিছরির এক দর। বলল, এটাও হয়নি। বলে ফেলো, বলে ফেলো।’
‘আজ্ঞে না, আপনার সব কোটেশনই ঠিক।’
‘আজ্ঞে না মানে? এটা তো হবে আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘তা কী করে হবে। হ্যাঁ বললে তো সমর্থন করা হল।‘
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও, জিনিসটা আমি তলিয়ে দেখি। অত সহজ নয়। সব কিছুর একটা মেথড আছে। কী প্রসঙ্গে, কী কথা এল!’
আচ্ছা প্যাঁচে পড়ে গেলুম তো! মুকুন্দটা মহা শয়তান। কেমন আমাকে ফেলে রেখে সুট করে পালিয়ে গেল। মামাদের তাড়া করে মাসিমা সেই যে ভেতরে চলে গেলেন, আর দেখা নেই। শরৎবাবু বলতে লাগলেন, ‘আমি বললুম, কী বললুম?’
প্রাণে বাঁচার জন্যে স্মরণ করিয়ে দিলুম। শরৎবাবু মনে-মনে বিড়বিড় করলেন। ঘাড় নাড়লেন। তারপর দু’হাতে তালি মেরে বললেন, ‘হ্যাঁ ঠিক। না-ই হবে। কারণ আমি বলেছিলুম, বলো, এটাও হয়নি। তুমি যদি হ্যাঁ বলতে তা হলে তো হ্যাঁ-ই হত। তাই না! সব কিছু বুঝে নিয়ে নিঃসন্দেহ হওয়াই উচিত, তাতে দু-দণ্ড দেরি হয়, হোক। এ তো আর আমরা ট্রেন ধরতে ছুটছি না! অত তাড়া কীসের! সবসময় জানবে, ওয়ারি, হারি অ্যান্ড কারি—এই তিনটে হল গিয়ে আলসারের কারণ। সবসময়ে ধীরে-ধীরে চিবিয়ে-চিবিয়ে, বসে-বসে খাবে।’
