মেজোমামা বললেন, ‘তার চেয়ে ঝপাং করে বড় পুকুরের জলে ফেলে দিলেই হয়।’
মুকুন্দ বললে, ‘চৈত্র মাসে জল কমে এলে, কঙ্কালটা বেরিয়ে পড়বে। এর মধ্যে কেউ যদি জাল ফেলে, উঠে চলে আসবে।’
বড়মামা বললেন,’ পুলিশ যদি কুকুরের সাহায্য নেয় তা হলে কী হবে!’
‘পুলিশ-কুকুর এ-বাড়িতে ঢুকতেই পারবে না। আমাদের আটটা কুকুরের সঙ্গে ফাইট লেগে যাবে।’
শরৎবাবু এসে হাজির। এক মুখ হেসে বললেন, ‘আমি তা হলে আসি। আজ আমার আবার বাগেরহাটে কবিতা পাঠের আসর আছে।’
বড়মামা বললেন, ‘তোমার খাওয়া হয়ে গেছে?’
‘আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম তো, তাই ঠিক মনে পড়ছে না। আচ্ছা আমি কি পান খেয়েছিলুম? তোমরা কেউ দেখেছিলে? আমি যদি পান খেয়ে থাকি, তা হলে আমি নিশ্চয় খেয়েছি। আমার ছেলেবেলা থেকেই এই এক রোগস্মৃতিরই ডিফেক্ট। ঘুম থেকে ওঠার পর আমার আর কিছু মনে থাকে না। সব ভুলে যাই, যেন এইমাত্র জন্মালুম।’
মাসিমা এলেন। মাসিমার আগমনটা সব সময়েই বেশ ভয়ের।
মাসিমা বললেন, ‘আমার একটাই প্রশ্ন, তোমরা মেয়েদের মানুষ বলে মনে করো?’ কেউ কিছু বলার আগে শরৎবাবু বললেন, ‘মানুষ’ মেয়েদের আমি দেবী বলে মনে করি। মা দুর্গা, মা সরস্বতী, মা লক্ষ্মী সব একসঙ্গে পেতলে ঢালাই করে…’
‘আপনার কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে এই দুই মহাপুরুষকে নিয়ে।’
বড়মামা বললেন, ‘কী কাণ্ড হয়েছে রে কুসি! তুই আমার গলায় যা হয় একটা মালা পরিয়ে দে, আমি চলে যাই।’
শরৎবাবু বললেন, ‘তোমাকেও সংবর্ধনা! আমাকেও ওরা আজ সংবর্ধনা দেবে। হাজার টাকা ডোনেশন নিয়েছে ভাই, এমনি নয়।’
মাসিমা বললেন, ‘কেসটা কী!’
বড়মামা বললেন, ‘এই দ্যাখ সাইকেল।
‘তুমি আমাদের বেলা তিনটে অবধি উপোস করিয়ে রেখে এখন সাইকেল দেখাচ্ছ!’
‘শুধু সাইকেল নয় ভাই, এর আগে একটা বিশেষণ আছে। চোরাই সাইকেল। এই সাইকেলের খোঁজেই একটু আগে পুলিশ চড়াও হয়েছিল।’
‘তুমি কি তা হলে ডাক্তারি ছেড়ে সাইকেল চুরির ব্যবসায় নামলে?
‘আমি কেন নামব! এ কাজ মুকুন্দর।’
‘শিবঠাকুরের বদনাম হয়েছিল, তাঁর নন্দী, ভূঙ্গি চেলার জন্যে। তোমারও তাই হবে।’
‘হবে কী! হয়ে গেছে। শিবঠাকুরকে জেলে যেতে হয়নি। আমাকে জেলে যেতে হবে।‘
‘তা, এখনই যাবে, না দয়া করে কিছু মুখে দিয়ে যাবে?’
মেজোমামা যে পাথরটার ওপর বসেছিলেন বড়মামা সেই পাথরটার ওপর ধপাস করে বসে পড়ে বললেন, ‘ছিঃ, ছিঃ, কী অপমান! কী অপমান। আমি পার্থর কাছে মুখ দেখাব কী করে!’
মেজোমামা ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ কী অপমান। আমি আবার টেলিফোনে গরমাগরম দু-চার কথা শুনিয়ে দিলুম। এখন আমি কোন মুখে গিয়ে বলব, ‘পার্থ, এই তোমার সাইকেল!’ ইশ, আমার এতদিনের উঁচু মাথা একেবারে পাউডার হয়ে গেল।’
মেজোমামা বড়মামার পাশে সেই পাথরটার ওপর বসে পড়লেন।
বড়মামা মেজোমামার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আয় ভাই, আয়। রাজদ্বারে আর শ্মশানে যে পাশে থাকে সে-ই হল বন্ধু। তুই-ই আমার একমাত্র বন্ধু। আর সেই নাক-কাটা রাজার গল্পটা। মনে পড়ছে। রাজা বানরকে প্রহরী করে তার হাতে তরোয়াল দিয়ে চিত হয়ে ঘুমোচ্ছে। বানর তলোয়াল হাতে বসে আছে পাশে। একটা মাছি এসে ভীষণ উৎপাত করছে।’
মেজোমামা বললেন, ‘পড়েছে পড়েছে, আমারও মনে পড়েছে গল্পটা। মাছি বসল রাজার নাকে, বানর মারল তলোয়ালের এক কোপ। ফিনিশা রাজার নাক খুলে পড়ে গেল।’
‘নীতিবাক্যটা মনে আছে?’
‘শিওর। দুর্জনের সঙ্গে দোস্তি করলে মানুষের বারোটা বেজে যায়। যেমন তোমার বেজেছে।’
মেজোমামার শেষের কথায় বড়মামা একটু বিরক্ত হলেন যেন। ভুরুর কাছটা কুঁচকে গেল। মেজোমামার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বারোটা আমার একা বাজেনি, তোরও বেজেছে। পার্থ তোরই বন্ধু।’
‘তা হতে পারে, তবে যদি জেলে যেতে হয়, তো তোমাকেই যেতে হবে।’
‘কেন? পার্থ তোমার বন্ধু। তুমি যাবে। আমি তোমাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনব।’
‘আজ্ঞে না! পার্থ আমার বন্ধু হলেও, তোমার নামই করেছে। পুলিশ তোমাকেই জেরা করতে। এসেছিল। তুমি জেলে যাবে। আমি তোমাকে ছাড়িয়ে আনব জামিনে। উলটোটাই হবে বড়দা। আইনের চোখে তোমার গিয়ে বড়, মেজো নেই। অপরাধীই সাজা পাবে। তা ছাড়া মুকুন্দ তোমার লোক।’
‘মুকুন্দ এখন আমার লোক হয়ে গেল! তোমাদের কেউ নয়?’
‘মুকুন্দকে তুমি এনেছিলে বড়দা।’
বড়মামা অসহায়ের মতো মাসিমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখছিস কুসি, দেখছিস, কী সাঙ্ঘাতিক স্বার্থপর।’
‘কে স্বার্থপর নয় বড়দা? তুমি বড় ভাই হয়ে মেজোভাইকে জেলে পাঠাতে চাইছ। জানো, জেলখানায় কী কষ্ট। ছারপোকা-ভরা কম্বলে শুতে দেবে। খেতে দেবে লপসি। সেলে কোনও পাখা থাকবে না। দুপুর-রোদে পাথরের গাদায় বসে খোয়া ভাঙতে হবে। পরনে তোমার থাকবে ডোরাকাটা ইজের আর ফতুয়া। দ্যাখোনি তুমি। আমি একবার একটা হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলুম। শিক্ষার জন্যে, জ্ঞানের জন্যে সব কিছু দেখতে হয়।’
বড়মামা আবার মাসিমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘কী যুগ পড়েছে দ্যাখো, পিতৃসম বড়ভাই জেল খাটবে আর মেজোভাই বসে বসে পাইপ টানবেন।’
মাসিমা গালে আঙুল দিয়ে তাঁর পরিচিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভেতরে ভেতরে রাগে ফুটছেন; এইবার ফেটে পড়বেন।
শরৎবাবু বললেন, ‘আমি তা হলে যাই, ভাই। তোমরা তা হলে ক’টা নাগাদ জেলে যাচ্ছ? গাড়িতে যাবে না রিকশায়?
