মুকুন্দ মেজোমামার পায়ের কাছে বসে পাশ থেকে একটা খোলামকুচি তুলে নিল, ‘মেজদা, ছবি
আঁকলে আপনি বুঝতে পারবেন না।’
মেজোমামা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। মুকুন্দ পায়ের কাছের জমিতে ছবি আঁকতে লাগল। আঁকছে আর বোঝাচ্ছে, ‘ধরুন, এই হল জজসায়েবের বারান্দা। আর এই হল একটা সাইকেল। আমি গিয়ে আমার সাইকেলটা এই সাইকেলটার পাশে রাখলুম।’
আমি আর মেজোমামা দুজনেই দেখছি। আহা, মুকুন্দর কী আঁকার ছিরি! লম্বা একটা রেখা টেনেছে; তার ওপর মেরেছে দুটো ঢেরা।
মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?
‘আমি এই ডান পাশের খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভেতর চলে গেলুম।’
মুকুন্দ ডান পাশে ফাঁক ফাঁক দুটো রেখা টানল। সেই রেখা দুটো হল দরজা।
মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?
‘আমি যখন ঘরের ভেতরে জজসায়েবের সঙ্গে কথা বলছি, তখন কেউ এসে একটা সাইকেল নিয়ে চলে গেল। তার মানে এই দুটো সাইকেলের একটা হাওয়া হয়ে গেল।’
মুকুন্দ একটা ঢেরা মুছে দিল।
মেজোমামা বললেন, ‘তারপর?
‘আমি সার্টিফিকেট নিয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে বাইরে এসে এই সাইকেলটা নিয়ে একলাফে চেপে বসে সোজা বাড়ি।’ মুকুন্দ ঢেরাটা মুছে দিল। মেজোমামা জিগ্যেস করলেন, ‘কীসের এত আনন্দ?
‘বা রে! আমি যে কম্পাউন্ডার হব।’
‘কম্পাউন্ডার হবি। কে তোকে কম্পাউন্ডার করবে?
‘বড়দা। আমার বড়দা। বড়দা ছাড়া আমার কে আছে!’
‘উঃ, দেশের কী দুর্দিন! তুই হবি কম্পাউন্ডার! তোর ওই শাবলের মতো হাত আর চিমটের মতো আঙুল নিয়ে ইঞ্জেকশান দিবি? তুই ইংরেজি পড়তে জানিস, মুকুন্দ?’
‘আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করবেন না মেজদা।’
মেজোমামা চমকে উঠে বললেন, ‘অ্যাঁ, তুই আন্ডার এস্টিমেট বলতে পারলি। সত্যিই তোকে আমি আন্ডার এস্টিমেট করেছিলুম।’
মুকুন্দ বললে, ‘ছেড়ে দিন। ওটা হল গিয়ে সাইড ইস্যু।’
মেজোমামার হাতে-ধরা পাইপটা টপ করে পায়ের কাছে পড়ে গেল। অবাক হয়ে তাকালেন মুকুন্দর দিকে। মেজোমামার মুখের চেহারা পালটে গেছে। কেউ ভালো লেখাপড়া করলে, মেজোমামা তাকে ভীষণ ভালোবাসেন। তার জন্যে সবকিছু করতে পারেন।
মুকুন্দ বললে, ‘কিছু মনে করবেন না মেজদা, আপনার মধ্যে এখনও বেশ জমিদারি অহঙ্কার আছে। সব মানুষকেই আপনি আগে থেকে বিচার করে ফেলেন।’
‘তোর মাথা! আমাকে বড়দা বাতের তেল আর খুঁটে-বেচা পয়সায় মানুষ করেছেন। আমি ভোলা আর ছাতু খেয়ে বড় হয়েছি। তুই আমার মধ্যে দেখলি জমিদারি অহঙ্কার! তোর চালচলন দেখে আমার মনে হয়েছিল, তুই গ্রেটবেঙ্গল সার্কাসে মোটর সাইকেলের খেলা দেখাতে পারিস।’
‘মেজদা ধরেছেন ঠিক। আমার বাবা সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা দেখাতেন। আমি হাফ বাঙালি, হাফ মাদ্রাজি।’
‘তুই সার্কাস থেকে বড়দার সার্কাসে এলি কীভাবে!’
‘সে মেজদা আর এক স্টোরি! অনেক সময় লাগবে। আপনি কি সাইকেলের কথা শুনতে চান?
‘অবশ্যই চাই।’
‘আমি একটা সাইকেল চেপে গিয়েছিলুম, আমি একটা সাইকেল চেপে ফিরে এলুম। ফিরে এসে সাইকেলটাকে বেড়ার গায়ে রেখেই, বড়দার কাজে লেগে গেলুম। এইবার বলুন তো ব্যাপারটা কী হল?
‘ব্যাপারটা এই হল, তুই জজসায়েবের সাইকেলটা চুরি করলি, আর আমাদের সাইকেলটা চুরি করল অন্য কেউ।’
‘মেজদা, আমার কিঞ্চিৎ আপত্তি আছে।’
‘কিঞ্চিৎ শব্দটা তুই কোথা থেকে শিখলি?’
‘বড়দার কাছ থেকে। রোজ রাতে বড়দা আমাকে সংস্কৃত শেখাচ্ছেন আজকাল। আমার স্লাইট অবজেকশান আছে মেজদা, আমি চুরি করিনি। আমি চেপে চলে এসেছি। না দেখে চেপে চলে এসেছি।’
ঠিক এই সময় বড়মামা হন্তদন্ত হয়ে এসে ঢুকলেন। মুখ-চোখ লালচে দেখাচ্ছে। এতটা পথ রোদে রোদে এসেছেন তো। বড়মামা এসেই বললেন, ‘কী কাণ্ড ভাই রে! ডাক্তারিটা এইবার ছাড়তে হবে। অসম্ভব, অসম্ভব ব্যাপার। এত অসুখ বাড়লে সামলাব কী করে! আটান্নটা ইনজেকশান, একের পর এক। তার মধ্যে একডজন ইন্টাভেনাস। রোগীদের আবার আদিখ্যেতা কত! প্রেশার না দেখলে অভিমান। মুখ অমনি তোনো হাঁড়ি। বুক-পিঠ তো দেখতেই হবে, আবার পাঁজরায় তবলা বাজাতে হবে। ব্লাডপ্রেশার-মাপা চাট্টিখানি কথা! ফ্যাঁস-ফোঁস, ফ্যাঁস-ফোঁস করেই যাও। ইঃ, এতখানি বেলা হল! তোরা সব অনাহারে। শরৎ দেখি বসে বসে লজেন্স খাচ্ছে।’
বড়মামার চোখ পড়ে গেল সাইকেলটার দিকে।
এক পলক দেখেই বললেন, ‘নতুন কিনলি বুঝি। কত নিল?’
মেজোমামা বললেন, ‘এইটাই পার্থর সাইকেল।‘
‘অ্যাঁ, বলিস কী রে! চোর এইখানে ডেলিভারি দিয়ে চলে গেছে?’
‘চোর ডেলিভারি দেয়নি বড়দা। তোমার মুকুন্দই চেপে চলে এসেছে।’
‘আর আমাদের সাইকেলটা?
‘সেইটাই চুরি হয়েছে বড়দা।’
‘তা হলে তো আমাদেরই ডায়েরি করা উচিত। চল, চল। থানায় চল।
‘থানায় তো যাব, এইটার কী হবে? এই সাইকেলটার!’
বড়মামা সাংঘাতিক চিন্তায় পড়ে গেলেন। আর বড়মামার মজা হল, কোনও কিছুর সমাধান খুঁজে পেলে ভীষণ রেগে যান। এখনও তাই হল। ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, ‘এই ভাল্লুকটার জন্যে আমাকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হবে। যাই, থানায় গিয়ে সারেন্ডার করি। সাইকেল চুরির দায়ে তিন বছর বেশ জম্পেস করে ঘানি ঘুরিয়ে আসি। কুসি ঠিকই বলে, বিমল মিত্রের জীবনে আক্কেল হবে না।’
মুকুন্দ বললে, ‘বড়দা সব ব্যাপারে আপনি ভীষণ ভয় পেয়ে যান। আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে। আমি বেশ বড় মতো এটা গর্ত খুঁড়ে, সাইকেলটাকে সমাধি দিয়ে, তার ওপর নয়নতারা গাছ লাগিয়ে দিই।’
