মেজোমামাকে এখন দেখলে কেউ আর বুঝতেই পারবে না যে এই মানুষই একটু আগে চেয়ার উলটে পেছনে ডিগবাজি খেয়েছিলেন। মেজোমামার শরীর এখনও বেশ ফিট। কাগজের মোড়ক খুলে শরৎবাবুর মুখটা বের করে আনলুম। ঘেমে গেছেন ভদ্রলোক। শরৎবাবুর চোখ দুটো বেশ বড়-বড়। ভারী ভালো মানুষের মতো দেখতে বড়মামার ছেলেবেলার বন্ধু। জামালপুরে থাকেন। কলকাতায় ছোট্ট একটা একতলা বাড়ি আছে। বাড়িটা সারাবছর বন্ধই থাকে। জামালপুর থেকে বছরে একবার ছুটিতে এসে যখন দরজা খোলেন, তখন সে যেন এক দেখার মতো দৃশ্য! একেবারে কবিতা। চারপাশে ঝুলের পরদা ঝুলছে। অতি সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা ভূতের কাপড়ের মতো। আর সেই ঝুলে জড়িয়ে আছে এক বছরের সঞ্চিত ধুলোর কণিকা। রোদের আলো পড়ে চিকচিক করছে হিরের গুঁড়োর মতো। শরৎবাবু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় সাহিত্যিক না হলেও, সাহিত্যে নাম করেছেন। ভূতের গল্প আর ভ্রমণের গল্প ভালোই লেখেন। একটু আগে। আমাকে দশখানা বই উপহার দিয়েছেন। আর আমি এতবড় একটা ছেলে, আমাকে উপহার দিয়েছেন কি না, ব্যাটারিচালিত একটা মোটরগাড়ি। সেটাকে আবার ইচ্ছেমতো দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। গাড়িটা নিয়ে নিজেই এতক্ষণ খেলা করছিলেন আপনমনে। বড়মামা বলেন, ‘শরৎ বড় হলেও শিশু।’ বড়মামা, খোকা বলে ডাকেন।
শরৎবাবু উঠে বসে বললেন, ‘শুধু ঘুম নয়, বেশ বিউটিফুল একটা স্বপ্নও দেখে ফেললুম। আমার নেকস্ট বইতে কাজে লাগিয়ে দেব।’
মেজোমামা বললেন, ‘কী জাতীয় স্বপ্ন?’
ডিটেলসে বলতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, তবে এইটুকু জেনে রাখুন ওয়াইল্ড লাইফের দিকেই যাবে।’
‘আপনি তো মশাই ঘুমোলেন পনেরো মিনিট। আর স্বপ্নটা তা হলে বলতে তো পনেরো মিনিটই লাগা উচিত।’
‘না, না, স্বপ্ন সম্পর্কে আপনার পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা থাকলে এ-কথা বলতেন না। পনেরো মিনিটের স্বপ্ন সারাদিন বলেও হয়তো শেষ করা যাবে না। স্বপ্ন গোটানো থাকে। স্বপ্ন অনেকটা কনডেন্সড মিল্কের মতো। পনেরো মিনিটের টিনে পনেরো দিনের গল্প থাকতে পারে। মাইক্রোফিলমের মতো। তবে শেষ দৃশ্যে দেখলুম, আপনি আর আমি দুজনে মাচা ভেঙে ধমাস করে পড়ে গেলুম, জাস্ট ইন ফ্রন্ট অব এ রয়াল বেঙ্গল টাইগার! উঃ, সে কী থ্রিল? আর আপনার কী সাহস! আমি ভয়ে চিৎকার করছি, ‘টাইগার, টাইগার, বার্নিংব্রাইট’, আর আপনি খিল খিল করে হাসছেন আর বলছেন—’পেপার টাইগার।’ ঝাঁক করে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি আমার মুখের ওপর পড়ে আছে একটা খবরের কাগজ।’
মেজোমামা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। আড়মোড়া ভেঙে বললেন, ‘আমি একবার সাইকেলটা নিয়ে বেরোই। দেখি বড়দার কী অবস্থা! আর এক প্যাকেট টোব্যাকো কিনে আনি। স্টক ফুরিয়ে এসেছে।’ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাবে নাকি?
‘চলুন যাই।’
গোয়ালের পাশে বেড়ার গায়ে সাইকেলটা ঠেসানো রয়েছে। মেজোমামা আর আমি সেইদিকে এগিয়ে চললুম। দিনটা ভারী সুন্দর হয়ে উঠেছে। মোমপালিশ করা নীল আকাশ। মাঝেমাঝে ভেসে আসছে সাদা মেঘের ভেলা। দুর্গাপুজো এসে গেল। কী ভালো লাগে এই সময়টা। সবুজের ফোয়ারা ছুটছে। বিশাল একটা ডাঁশা ভোমরা ভোঁ-ভোঁ করে উড়ছে। চকোলেটের যেন ডানা গজিয়েছে। বড়মামার বেতের ঝোপটা একেবারে ফাটাফাটি দেখতে হয়েছে।
সাইকেলটার সামনে এসে মেজমামা বললেন, ‘এ কী? এটা কার সাইকেল। এ তো আমাদের সাইকেল নয়! আমাদের সাইকেল তোতা এত নতুন ছিল না। এতো অন্য কোম্পানির, অন্য। মডেলের।’
মেজোমামা চিৎকার করে মুকুন্দকে ডাকলেন। মুকুন্দ সবে চান করে চুলের কেয়ারি করছিল। সেই অবস্থায় বেরিয়ে এল।
ডোরাকাটা একটা হাফপ্যান্ট পরে। মাথার চারপাশ দিয়ে তেলজল গড়াচ্ছে।
মেজমামা বললেন, ‘এটা কার সাইকেল মুকুন্দ?
‘কেন মেজদা, আমাদের সাইকেল?’
‘ভালো করে দ্যাখো।’
মুকুন্দ গাড়ির পাশে নীচু হয়ে ভালো করে দেখে ভয়ে ভয়ে বললে, ‘মেজদা, এ সাইকেল আমাদের নয়। অসম্ভব। এ একেবারে অন্যজাতের সাইকেল। এর গায়ের রং আলাদা। এর চেহারা আলাদা।’
‘কোথা থেকে তুমি পেলে এটাকে?’
মুকুন্দ বললে, ‘মেজদা, আমার কী মনে হচ্ছে বলব! আমি যখন জজসায়েবের বাড়িতে গেলুম, তখন মনে হচ্ছে বারান্দায় একটা সাইকেল ছিল। আমার যেন মনে হচ্ছে, আমার সাইকেলটা আমি পাশে রেখে ভেতরে গেলুম। সার্টিফিকেটটা নিলুম। বাইরে এলুম। সাইকেলটা নিলুম। রাস্তায় নামলুম। সাইকেলে চাপলুম। গড়গড় করে চলে এলুম বাড়ি। এইবার কী হল বলুন তো!’
মেজোমামা কেমন যেন হয়ে গেলেন। মাথাটাকে ঝাঁকিয়ে নিয়ে বললেন, ‘কী হল! আমার তো মনে হল ছোট সাইজের একটা বাঘ বেরিয়েছিল। এলুম, খেলুম, হালুম, হুলুম।’
‘আপনি একটু বসুন এই জায়গাটায়, আমি আপনাকে অঙ্কটা বুঝিয়ে দিই। এর মধ্যে অল্প একটু অঙ্ক আছে।’
গরুর বিচুলি কাটার জন্যে ওই জায়গায় বেশ বড় একটা পাথর রয়েছে। মেজোমামা সেই পাথরটার ওপর বসলেন। আমার তো মনে হচ্ছে বড়মামার ডান হাত মুকুন্দ এখনই একটা গোয়েন্দা কাহিনি শোনাবে। মেজোমামা বেশ গুছিয়ে বসলেন। মেজোমামার এই গুণটা আছে, যখন যেখানেই বসুন, বেশ সুন্দর করে জমিয়ে বসতে পারেন। বসেই দু-তিনবার নাক ফোঁস। ফোঁস করে বললেন, ‘গোয়ালের ধারে বেশ একটা গ্রামগ্রাম গন্ধ থাকে, তাই না! শুকলেই মনে হয় স্বাস্থ্য ভালো হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ বল, এইবার অঙ্কটা বল।’
