জমিদারি এক মজার ব্যবসা। নায়েব আর প্রজায় কথায় কথায় বেলা বাড়ে। এদিকে সিন্দুকের হাতল ঘুরতে থাকে। ওদিকে দাওয়া ভরে ওঠে, ডাব রে, তাল রে, পেঁপে রে। মাছ আসে। আসে। কচি পাঁঠা। গোবিন্দভোগ। দলিল বন্ধক পড়ে। ভিটে লাটে ওঠে। আর যিনি জমিদারমশাই, তিনি তখনও মখমলের বিছানায়। সিল্কের লুঙ্গি। নাসিকাগর্জন। রাতে সাধনভজন করেন, তাই নিদ্রাভঙ্গে বিলম্ব। তাই কথায় আছে, নায়েব জাগেন দিনে, জমিদার জাগেন রাতে।
আমার বড়মামা এইসব এত সুন্দর করে বলেন! বড়মামাদেরও সিন্দুক ছিল। সেই সিন্দুকের হাতলে ছিল মকরের মাথা। সে এত সুন্দর কাজ, বিশ্বাসই হয় না যে বিলেতে তৈরি। সেই সিন্দুক গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। সাতচল্লিশ সালের ১৫ আগস্ট। সিন্দুক বিসর্জন দিয়ে। স্বাধীনতাকে স্বাগত জানানো হয়। আমার বড়মামাদের ফ্যামিলির নিয়ম হল, কোনও কিছু বিক্রি করা চলবে না। হয় দিয়ে দাও, না হয় ফেলে দাও। সিন্দুকটা দান করে দিতে চেয়েছিলেন, কেউ নেয়নি। জমিদারির বেশিরভাগটাই দখল হয়ে গেছে। কিছু সরকার নিয়েছেন, কিছু নিয়েছেন। উদ্বাস্তুরা। বড়মামার কাছে এখনও দলিলের পাঁজা আছে। সে যে কত! পার্টিশান তৈরি করা যায়।
গঙ্গার ধারের এক জমিদারের বাগানবাড়ি এক সায়েব কিনেছিলেন। সেই সায়েবের নাম ছিল টবিন। টবিনসায়েব সায়েব হলেও খুব ফ্রেন্ডলি ছিলেন। সাজ্জাতিক ভালো ফুটবল খেলতেন। টবিনসায়েবের গল্প শুনতে হলে মেজোমামাকে ধরতে হবে। বয়েসের অনেক পার্থক্য থাকলেও টবিনসায়েব মেজোমামার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন। মেজোমামার ফুটবলে খুব ঝোঁক ছিল। টবিনসায়েব বাড়ির মাঠে মেজোমামাকে ফুটবল শেখাতেন। পাস, ড্রিবলিং ডজিং। মেজোমামার দিন তো টবিনসায়েবের বাগানেই কাটত। সায়েব টেনিস খেলা শিখিয়েছিলেন। বিলিতি দাবা। ব্রিজ। আবার মেজোমামাকে সাঙ্ঘাতিক ভালো ইংরেজিও শিখিয়ে গেছেন। রান্না শিখিয়েছেন। স্ট্যু, স্যুপ, ফ্রাই। টবিনসায়েবের গল্প বলতে বলতে মেজোমামার চোখ ভিজে ভিজে হয়ে যায়। তখন বড়মামা দুঃখের সঙ্গে লড়াই করছেন। ছোলা আর ছাতু খেয়ে আর ব্যায়াম করে মেজোমামার তখন রাজপুত্রের মতো চেহারা হয়েছে। চেহারা দেখলে কে বলবে, মেজোমামার স্কুলের মাইনে আসে খুঁটে বেচা পয়সা থেকে। সেইসময় মেজোমামার সঙ্গে সায়েবের পরিচয় স্কুলের ফুটবল-গ্রাউন্ডে। সায়েবের আর কেউ ছিল না। মেমসায়েব বিলেতে চলে গেছেন। ইংরেজ মেয়ের সহ্য হয়নি ভারতের স্বাধীনতা। মেজোমামাকে সায়েব নিজের ছেলের মতোই ভালোবেসে ফেললেন। সায়েবের বাগানেই মেজোমামার দিন কাটত। একদিন মেজোমামা পেটের ব্যথায় ধনুক হয়ে গেলেন। টবিনসায়েব সঙ্গে সঙ্গে নিজের গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন মেডিকেল কলেজে। অ্যাপেনডিক্স। সঙ্গে সঙ্গে অপারেশান করতে হবে, নয় তো ফেটে যাবে। অ্যাপেনডিক্স অপারেশান তখনও মেজর অপারেশান। সায়েব মেজোমামাকে কেবিনে রেখে, সারারাত অপারেশন থিয়েটারের বাইরে বসে প্রার্থনা করে, ভোরে বাড়ি ফিরলেন। বড়মামা টাকার কথা তুলেছিলেন। সায়েব বলেছিলেন, ‘হি ইজ মাই সান। পৃথিবীতে টাকাটাই সব নয়।’
সায়েব ভারতে আর থাকতে পারলেন না। যাবার আগে মেজোমামাকে তাঁর লাইব্রেরি, রকিং চেয়ার, বিলিতি রাইটিং ডেস্ক, কলম, ঘড়ি, মাছধরার সরঞ্জাম সব দিয়ে গেছেন। মেজোমামা সেই চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছেন। কখনও পড়ছেন। কখনও একটু একটু ঘুমিয়ে পড়ছেন। ডাক্তারখানা থেকে বড়মামার ফিরতে দেরি হচ্ছে। দেরিতে গেলে যা হয়। নিমন্ত্রিত শরৎবাবু বড়মামা না এলে বসবেন না। আমরা তো বসবই না। শরৎবাবু শুয়ে শুয়ে কাগজ পড়ছিলেন। এখন তিনি কাগজ চাপা পড়ে আছেন। মাঝারি ধরনের নাক ডাকছে। মন্দ লাগছে না। মেজোমামার দোলদোল চেয়ার দুলছে। ওই চেয়ারে বসে যত দোলা যায় ততই ঘুম আসে। মেজোমামার চোখদুটো বন্ধ। কোলের ওপর চশমা। ঠোঁটের কোণে হাসি। মেজোমামা বলেন, ‘আমি চোখ বুজলেই স্বপ্ন দেখি—শেলি, কিটস, বায়রন, শেকসপিয়ার। লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিটে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শেকসপিয়ারের বাড়ির পাশের লেকে রাজহংস দেখছি।’
আমি একটু অন্যমনস্ক হয়েছিলুম। আমার যখন ভীষণ খিদে পায়, তখন আমি টিনটিন পড়ি। হঠাৎ মনে হল, মেজোমামা পেছন দিকে উড়ে গেলেন যেন। স্বপ্ন দেখছি না তো! না, আমি কেন স্বপ্ন দেখব! আমি তো জেগেই আছি। ধমাস করে একটা শব্দ হল। মেজোমামা চেয়ারের পেছন দিকে মেঝেতে হলাসনের ভঙ্গিতে পড়ে আছেন। খালি চেয়ারটা তিরতির করে দুলছে।
মেজোমামার পা দুটো বুক-কেসে গিয়ে লেগেছিল। শরৎবাবুর ঘুম চটে গেছে। তিনি কাগজ চাপা অবস্থায় কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। তিনিও মনে হয় স্বপ্ন দেখছিলেন। কাগজের তলা থেকে। চিৎকার করছেন, ‘হেল্প, হেল্প, টাইগার, টাইগার!’
আমি কাকে হেল্প করব! মেজোমামা ৎ-এর মতো হয়ে আছেন। শরৎবাবুর শবাসন।
মেজোমামা বললেন, ‘টুক করে আগে আমাকে তুলে দে। চেয়ারটা সরা, তা হলেই আমি সোজা হয়ে যাব।’
চেয়ারটাকে সরাতেই মেজোমামা উঠে পড়লেন। উঠেই চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে শরত্ত্বাবুকে বললেন, ‘জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসুন স্যার। কাগজের জঙ্গলে কাগজের বাঘ দেখছেন আপনি?
