খাজাঞ্চিখানার চেহারা হত গুমঘরের মতো। ছোট ছোট পাতলা পাতলা ইট দিয়ে বাড়ি তৈরি হত সেকালে। এই মোটা মোটা সব দেয়াল। এত মোটা যে, দেয়ালের মধ্যে জ্যান্ত মানুষ ঢুকিয়ে। দেওয়াল আবার গেঁথে প্লাস্টার করে দিলে বোঝার ক্ষমতা থাকত না তার ভেতরে একটা মানুষ আছে। ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে কঙ্কালে। সেই দেয়ালেই হয়তো মা কালীর ছবি ঝুলছে। কি। কোনও সায়েব শিল্পীর আঁকা পুরোনো কলকাতার দৃশ্য। খাজাঞ্চিখানায় কোনও জানলা থাকত না। নোনা-ধরা দেয়াল। ঝুল তো থাকবেই। দেয়াল ঘেঁষে খুব নীচু লম্বা লম্বা চৌকি। প্রজারা সব এসে সার বেঁধে পাশাপাশি বসবে। প্রজারাই তো জমিদারের সরষে। যত রগড়াবে, তত তেল বেরোবে। পাটি পাতা উঁচু চৌকির ওপর তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছেন নায়েবমশাই। পরনে ধুতি আর বেনিয়ান। সে বেশ মজার জামা। ফতুয়ার মতোই। পাশে ফিতে বাঁধা। যেন ফাইলকভার। নায়েবমশাইয়ের সামনে একটা ডেস্ক। দোয়াত কলম। ব্লটিং খেরোর খাতা, টিপসই দেওয়ার কালি। মাথার ওপর ঝুলছে টানা পাখা। দড়িটা চলে গেছে বাইরের বারান্দায়। সেখানে দরজার পাশে জড়সড়ো হয়ে বসে একটা লোক ক্রমান্বয়ে দড়ি টেনে চলেছে। ঝালর লাগনো পাখার বাতাস একমাত্র নায়েবমশাই আর গোমস্তাদের গায়েই লাগছে। যারা পাখাটানত তাদের সায়েবরা বলত ‘পাঙ্খ পুলার’ আর খাজাঞ্চিা বলতেন, ‘পাখারবদার’। পাখবরদাররা। এক গুলি আফিং খেয়ে পাখা টানতে বসত। কাজটা এত একঘেয়ে যে তা না হলে পারা যেত না। লোকটার ঘোর লেগে যেত। মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়লে হাত বন্ধ হয়ে যেত। পাখা থেমে আসত।
নায়েবমশাই অমনি ভরাট মেঘের মতো গলায় বলে উঠতেন—’ইয়াও উল্লুক’। অমনি পাখা আবার জোরে জোরে দুলে উঠত। নায়েবমশাইদের বিচারে মানুষের জাত ছিল মাত্র দুটি— হুজুরের জাত আর উল্লুকের জাত। নায়েবমশাইয়ের পেছনে সেই সিন্দুক। দরজায় লতাপাতার নকশা। নায়েবমশাইয়ের বাঁ-পাশে একটা ছোট ঘর। সেই ঘরটাকে বলা হত রগড়ানির ঘর। কৃপণ প্রজা, যারা জমিদারমশাইয়ের সেবায় টাকা-পয়সা ছাড়ার ব্যাপারে লেজে খেলত, তাদের। ওই ঘরে নিয়ে গিয়ে স্বভাব সংশোধন করা হত। সামান্য দু-একটা দাওয়াই। মেঝেতে চিত করে ফেলে বুকে বাঁশডলা। একে বলা হত বাটনা-বাটা। আর একটা দাওয়াইয়ের নাম ছিল কীচক বধ। দুজনে দুটো পা ধরে দুপাশে ফেড়ে ফেলার চেষ্টা করত। রোগীর সঙ্গে রোগীর মতোই। ব্যবহার করা হত। দাঁড় করিয়ে রেখে বা বসিয়ে রেখে কষ্ট দেওয়া হত না। মেঝেতে সুন্দর করে শুইয়ে চিকিৎসা করা হত। জল চাইলে জল দেওয়া হত। জমিদারদের যত সব নিষ্ঠুরতার কথা। সাতকাহন করে বলা হয়, দয়ালুতার কথা বলা হয় কই! একালের পুলিশ লকআপে চরিত্র সংশোধনের সময় জল দেওয়ার কোনও রেওয়াজই নেই। সে যেন জল ছাড়াই রোগারোগ্যের ক্যাপসুল গেলানো।
বড়মামার স্পষ্ট সব মনে আছে। সকালবেলা নায়েবমশাই এসে সেরেস্তায় বসলেন। দেয়ালের চুনকালি খসে খসে কোথাও ফুটে উঠেছে রাক্ষসের মুখ। কোথাও বাঘের মুখ। নীচু চৌকিতে। সারি দিয়ে বসে আছে উল্লকেরা। প্রত্যেকেরই ট্যাঁকে কিছু না কিছু আছে। নায়েবমশাই প্রথমেই একটা টেকুর তুলবেন, যেন সৌদামিনীর গোয়ালে সন্ধ্যায় বাছুর ডেকে উঠল। তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছেন; সবাই একটু সচকিত হবেন। নায়েবমশাই হঠাৎ আসফাঁকলকে দেখতে পেয়ে বলে উঠবেন, ‘কী রে ব্যাটা দেখতে পাচ্ছিস না, পেট গরম হয়েছে। তোর কোনও কর্তব্যজ্ঞান নেই!’
‘এজ্ঞে?’
‘এজ্ঞে! ব্যাটা ভোঁদড়! যা এক কাঁদি নেয়াপাতি ডাব পেড়ে আন। হ্যাঁরে, তোরা কি কোনওকালে মানুষ হবি না! চিরটাকাল উল্লুকই থেকে যাবি! আমি তোদের মা-বাপ। স্বীকার করিস তো! একথা অস্বীকার করিস, আর না স্বীকার করিস! কে, কে, কোন ব্যাটা অস্বীকার করলে?
‘এজ্ঞে, কেউ তো করেনি।’
‘তাই বল। অস্বীকার তোরা করতে পারিস। তোদের দ্বারা সবই সম্ভব। তোরা দিনকে রাত করতে পারিস। আমাদের শাস্ত্রে কী বলছেন জানিস, মানুষ অকৃতজ্ঞ। দ্যাখ, তোরা কেউ ডাবের কথা বললি না, আমাকে বলতে হল! পেট গরম হলে কী করতে হয়? যদুগোপাল? তুমি বলো?’
‘আজ্ঞে উপবাস। ক্ষণে ক্ষণে জলপান আর তলপেটে ভিজে গামছা লেপন।’
‘প্রভু শ্রীহরি। কী হাতে আমাকে সমর্পণ করলে প্রভু! এ যে দেখি শৃগালের চেয়েও ধূর্ত। তবু বললে না পাঁচ পোয়া দই আমার দোকান থেকে এনে দিচ্ছি নায়েবমশাই। শোনো গোপাল, শাস্ত্র বলেছেন, শঠে শাঠ্যং। যা পাঁচ পোয়া পয়োধিতে হত, এখন আর হবে না মানিক। সের খানেক ছানারও প্রয়োজন। যাও বসে বসে গোঁফ না চুমড়ে গাত্রোৎপাটন করো।’
নায়েবমশাই এদিক-ওদিক তাকালে, ‘এই যে শ্রীল শ্রীযুক্ত মঙ্গল হালদার, বেশ ঘাপটি মেরে বসে আছিস তো! ঊ, আবার নতুন লুঙ্গি পরা হয়েছে। দিনকাল তা হলে ভালোই যাচ্ছে! সকালে জালে গিয়েছিলে?’
‘আজ্ঞে।’
‘আজ্ঞে, তা জানোনা পেট গরম হলে কচিপাঁঠা নাস্তি! কোবরেজি বিধান হল, পেঁপে, কাঁচকলা, ডুমুর, থানকুনি পাতা সহ কুর্চিবাটার ঝোল। কাঁচালঙ্কা চলবে না। মরিচের ঝাল চলতে পারে। মরিচ পেট ঠান্ডা করে। বিকল্পে লাউ-চিংড়ি। তোমরা সব রয়েছ, এখন তোমরাই বলো দিবা দ্বিপ্রহরে আমি কী সেবন করব। আমি নিজে থেকে কিছু বলব না। যোগ্য সন্তানেরা থাকতে পিতার কিছু বলা সাজে না।’
