মুকুন্দ বললে, ‘আমার হৃদয়ে শেল বেজেছে।’
বড়মামা বললেন, ‘ধুর, ব্যাটা। যত আধুনিক বাংলা গানের লাইন ঝাড়ছিস। অরিজিনাল কিছু ছাড়।’
৩.
মেজোমামার একটা রকিং চেয়ার আছে। আমাদের বাড়ি থেকে এই মাইলখানেক দূরে গঙ্গা। সেখানে যত বাগানবাড়ি। সুন্দর সুন্দর বাড়ি। এক সময় সুন্দরই ছিল। এখন সব ভেঙে ভেঙে ভূতের মতো চেহারা হয়েছে। মানুষের হাতে আর একদম পয়সা নেই। বড়মামা বলেন, ‘পয়সা থাকবে কী করে! বড়লোকেরা তো আর রোজগার করতে জানে না। তারা শুধু খরচটাই শিখেছে।’ বড়মামা এই গঙ্গার ধারেই এমন বড়লোক দেখেছেন, রোজ দশ-বারো হাজার টাকা খরচ করতে না পারলে, যাঁর ভীষণ মনখারাপ হত। তাঁর মা অমনি মাথার কাছে বসে চুলে হাত বোলাতে বোলাতে ছেলেকে বোঝাতেন, ‘মন খারাপ করিসনি বাবা! আজ কোনও কারণে পারিসনি, কাল ঠিক পারবি।’ নায়েব পায়ের দিকে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘হুজুর দোষটা আমারই। আমি যদি একজন নাচিয়ে না এনে এক জোড়া আনতুম তা হলে দশ ছাড়িয়ে যেত। আমি কথা দিচ্ছি হুজুর, কাল হেসে-খেলে আমি পনেরো পার করিয়ে দেব। কাল আমি সব খাবার পেলেটি থেকে আনাব।’
হতাশহুজুর অমনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতেন, ‘একা আমি আর কত টানব! আমার নিজের পেটটা তো জালার মতো হয়ে গেল! কোনও দিক থেকে কোনও কো-অপারেশান নেই। এইভাবে চললে কবে শেষ হবে? আর কতদিন বড়লোক থাকা যায়! সবকিছুর তো একটা লিমিট আছে। শেষ আছে! পিতা-প্রপিতামহের আমল থেকে, এ যেন চলছে তো চলছেই। আর পারা যায়!’
নায়েব বললেন, ‘কিছু দানধ্যান করে দিন না হুজুর।’
হুজুর বললেন, ‘পাগল হয়েছেন! গরিবদের অভ্যাস খারাপ হয়ে যাবে না! মানুষের অভ্যাস খারাপ করতে আছে। নিজের পা কেটে নিয়ে নকল পা লাগালে তার হাঁটা-চলা ঠিক থাকবে? কী যে সব শাস্ত্রবিরোধী কথা বলেন আপনি? নিজের কাজ নিজেকেই করতে হবে। অন্যের সাহায্য নেবেন কেন আপনি? এ তো আমার দায়। আমার কর্মফলের বোঝা আমাকেই বইতে হবে। উঠে পড়ে লাগুন, উঠে পড়ে লাগুন।’
বড়মামা বলেন, ‘তখন কী সুন্দর কালই না ছিল। বিশাল এক আয়রনচেস্ট ঘরের একপাশে। ইয়া বড় এক হাতল লাগানো। এক-এক জমিদারের সিন্দুকের হাতলে এক-এক রকমের মুখ ঢালাই করা থাকত। বিলেতের ‘চাবস’ কোম্পানি এইসব সিন্দুক তৈরি করত। বিশাল হাতির। পিঠে চাপিয়ে এইসব সিন্দুক আনা হত। হাতির চেয়েও সিন্দুক ভারী। হাতির চারটে পা নাকি থরথর করে কাঁপত। এক মাইল যাবার পরই চারজন লোক হাতির চারটে পায়ে রসুন তেল মালিশ করত। তা না করলে হাতি আর এক পা-ও হাঁটবে না। হাতির সঙ্গে আসছে ‘চাবস’। কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার, মিস্ত্রি, কুলি আর ডাক্তার। ইঞ্জিনিয়ার আর ডাক্তার দুজনেই লালমুখো সায়েব। মুখে সব ডাংগুলির মতো চুরুট। রেলের ইঞ্জিনের মতো ভসভস ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পিড়িং পিড়িং ইংরেজি বলতে বলতে আসছে। এখন যেমন প্রধানমন্ত্রীকে দেখার জন্যে রাস্তার দু’পাশে ভিড় জমে যায়, সেকালে সেইরকম জমিদার বাড়ির সিন্দুক দেখার জন্যে ভিড় জমে। যেত। সব গাছের ডালে উঠে পড়েছে। বাড়ির চালে উঠে পড়েছে সব। এ কী রে বাবা! ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা যেন। মাইলে মাইলে হাতির পায়ে তৈলসেবা। আর সায়েব ডাক্তার স্টেথেসকোপ দিয়ে হাতির হার্ট পরীক্ষা করছেন। হাতির হৃদয় তো বিশাল বড়। গোটা বুকটাই হৃদয়। হাতির হার্ট পরীক্ষারও একটা কায়দা ছিল। সে স্টেথেসকোপও তেমনই বিশাল। কানে দেবার নল দুটো বিশ-তিরিশ ফুট লম্বা। আর বুকে লাগাবার চাকতিটা ঠিক চাটুর মতো। তেমনি তার ওজন। হাতির পেটের তলায় ঝোলায় বেঁধে একজন কুলিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হত। সে মোটর-মেকানিকের মতো পেটের তলায় চিত হয়ে ঝুলে ঝুলে চাটুর মতো চাকতিটা বুকে। ঠেকাত, আর বিশ ফুট দূরে টুলে বসে কানে নল লাগিয়ে সায়েব-ডাক্তার হৃদয়ের শব্দ শুনতেন। তিনি যেন জাহাজ চালাচ্ছেন। থেকে থেকে বলছেন, ‘থার্টি ডিগ্রি নর্থ, ফিফটি ডিগ্রি সাউথ।’ প্রায় একঘণ্টা লেগে যেত হাতির হার্ট পরীক্ষা করতে। হার্টের আবার সেইরকম শব্দ। যেন তালে তালে জয়ঢাক বাজছে। সায়েব-ডাক্তার হার্ট-পরীক্ষার পর ঝাড়া আধ ঘণ্টা আর কোনও কথা শুনতে পেতেন না। একেবারে কালা। বড়মামা গল্প করেন, ‘সাতক্ষীরের ছোট তরফের জমিদারের সিন্দুক আনার সময় হাতির হার্টের শব্দে ডাক্তারই হার্টফেল করেছিলেন। একেবারে নতুন ডাক্তার, সবে দেশ থেকে এসেছেন। দু-একটা কুকুর-টুকুরের হার্ট দেখে হাতেখড়ি। হাতির হার্ট সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। আচমকা ধাঁই করে কানের ভেতর দিয়ে ঝেড়ে দিয়েছে তোপ। নল কানে দিয়ে যতটা দূরে বসা উচিত ছিল, ততটা দূরে বসেননি। সায়েবরাও বোকা হয়। কত সায়েব আছে অঙ্কে আমার মতো কেঁদেকেকে পঞ্চাশ পায়। সংস্কৃতে শূন্য।’
আমার বড়মামার কাছে শোনা সব কাহিনি। গল্প নয়। আমি একবার গল্প বলেছিলুম বলে, বড়মামা অসম্ভব অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। গল্প আবার কী? এসব সত্য ঘটনা। কাহিনি। এক-এক জমিদার চাবস কোম্পানিকে সিন্দুক অর্ডার দেবার সময় বলে দিতেন হাতলে কীসের মুখ ঢালাই করা হবে। সিংহ, বাঘ, মকর, সাপ, কুকুর, মড়ার মাথা, ভৈরবী, মা কালী, শিব, দুর্গা। সায়েব কোম্পানি হলে কী হবে! যা বলবে, যা ছবি সাপ্লাই করবে সব ঢালাই করে দেবে সুন্দর করে। এক-একটা সিন্দুক একেবারে মাপমতো লোহা গলিয়ে ছাঁচে ফেলে ঢালাই করা। এই তার পুরু চাদর। হাতির পিঠ থেকে কপিকলে করে নামিয়ে পঞ্চাশজন লোক গলদঘর্ম হয়ে খাজাঞ্চিখানায় এনে সেট করে দিয়ে যেত। আনার সময় তিন-চারজন এমন আহত হত যে, একমাস বিছানায়। পড়ে থাকত। কেউ কেউ চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে যেত। যারা পঙ্গু হয়ে যেত বিলিতি কোম্পানি তাদের সারাজীবন পাঁচ সিক্কা হারে ভাতা দিত। ইট, সিমেন্ট আর সুরকি-বালি দিয়ে বেদি তৈরি করে সিন্দুকটাকে এমনভাবে বসানো হত, যে হাজারটা লোক শত চেষ্টা করেও সিন্দুকটাকে সরাতে পারত না। বিলিতি তালা-চাবি খুলে হাতলটাকে পড়পড় করে পনেরোবার ঘোরালে তবেই সিন্দুকের দরজা খুলত। ভেতরে একেবারে তেলা সলিড লোহার সব খুপরি। হিরে রাখো, জহরত রাখো। থরেথরে নোট সাজিয়ে রাখো। মোহর রাখো। তিন মণ, চার মণ কয়েন রাখো। দলিল সাজিয়ে রাখার আলাদা ব্যবস্থা। জমিদারি মানে সিন্দুক। সিন্দুক দেখে জমিদার বড় কি ছোট বোঝা যেত।
