মুকুন্দ বললে, ‘বা রে! আপনিই তো বললেন, ‘সাইকেলটা গোয়ালের পাশে রাখ। এখন আর কুকুরের ঘরে তুলতে হবে না।’
‘আরে গাধা, সেটা তো আমার সাইকেল।
‘আমি তো সেই সাইকেলটার কথাই বলছি।’
‘জজসায়েবের সাইকেলটা কোথায় পাচার করে দিয়ে এলি? ব্যাটা চোর। ‘কী আশ্চর্য! জজসায়েবের সাইকেলের আমি কী জানি?’ বড়মামা অফিসারকে বললেন, ‘লাগান, লাগান, থার্ড ডিগ্রি লাগান। সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না।
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না। এটা আমাদের ওপর ছেড়ে দিন। হাতের কাজটা আগে ঝট করে সেরে নি। তারপর পেটে ঞ চালালেই সব বেরিয়ে আসবে।’
মেজোমামা পাইপ চিবোতে চিবোতে বললেন, ‘কত বছর চাকরি হল আপনাদের?’
মুখে ক্ষীরকদম্ব, অফিসার জবাব দিলেন, ‘তা ধরুন দশ-বারো বছর তো হবেই।’
‘কিস্যু হয়নি। একেবারেই নভিশ। কোনও অভিজ্ঞতাই হয়নি। কোনও দিন শুনেছেন, কোনও দিন দেখেছেন, চোর চুরি করে পুলিশ অফিসারকে খাবার পরিবেশন করছে?’
মুকুন্দ বলতে হবে সাহসী ছেলে। সে অমনি ফট করে বললে, ‘আমি বড়দার সাইকেলে চেপে গেলুম। সইটই করিয়ে সেই সাইকেলে চেপেই ফিরে এলুম তক্ষুনি। আমি জজসায়েবের সাইকেল চুরি করব কী করে? গরিব মানুষ বলে যা খুশি তাই বলবেন! আমি তিন বছর এই বাড়িতে চাকরি করছি, একটা জিনিস চুরি গেছে? আমি চোর?’
মেজোমামা বললেন, ‘স্টপ। আমি ওই পয়েন্টে আসছি। তার আগে আর একটা পয়েন্ট। একজন মানুষ একসঙ্গে কটা সাইকেল চালাতে পারে?
অফিসার মুচমুচ করে নিমকি খেতে খেতে বললেন, ‘একটা।’
‘তা হলে দুটো সাইকেলের প্রশ্ন আসে কী করে! নেকস্ট পয়েন্ট, ও যে সাইকেলটা নিয়েছে, কে দেখেছে! সাক্ষী কোথায়?’
অফিসার ট্রে-এর থেকে নিমকির টুকরো মুখে পুরতে পুরতে বললেন, ‘জাস্ট সন্দেহ।’
মেজোমামা বললেন, ‘আমি মুকুন্দর হয়ে জজসায়েবের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করব। ডাবল মানহানি। এক, বড়দার মানহানি হয়েছে। দুই, মুকুন্দর।’
মেজোমামা চেয়ার থেকে উঠে সোজা এগিয়ে গেলেন ফোনের দিকে।
অফিসার ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কাকে ফোন করছেন?
‘পার্থকে।’
‘আপনি নাম ধরে ডাকেন?
‘আমার ক্লাস-ফ্রেন্ড।’
মেজোমামা ঘড়ি দেখলেন। নিজের মনেই বললেন, ‘ওকে এখন কোর্টেই পাব।’
মেজোমামা ডায়াল করতে লাগলেন। অফিসার দুজন পাথরের মূর্তির মতো বসে আছেন।
মেজোমামা দু-বারের চেষ্টায় লাইন পেয়ে গেলেন। মেজোমামা বলছেন, ‘হ্যাঁলো পার্থ, সকালে তোমার সাইকেল চুরি গেছে? আচ্ছা। তুমি আমাদের সন্দেহ করে থানায় ফোন করেছিলে? করোনি। কে করেছে? তোমার বউ। তিনি তো দুই পুলিশ অফিসারকে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন হামলা করতে। অ, তুমি কিছুই জানো না। তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখা তো বড়।
বিপজ্জনক। এরপর ধরো এক রাতে তোমার বউয়ের নেকলেস চুরি হল, আর সেই রাতে তোমার বাড়ি থেকে আমরা আড্ডা মেরে ফিরে এলুম। পরের দিন পুলিশ এসে আমাদের কোমরে দড়ি। বেঁধে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে চলে গেল। বাঃ ভাই বাঃ, জজসায়েব বলে, ক্ষমতা আছে বলে, যা খুশি তাই করবে। ছিঃ ছিঃ, কী অপমান! বেলা বারোটা, বড়দা এখনও চেম্বারে যেতে পারেনি, ধরে বসিয়ে রেখেছে। জেরা চলছে, জেরা। কী অপমান। ফোনটা দেব? কাকে? অফিসারকে?’
মেজোমামা ইশারা করলেন। বড় অফিসার চায়ের কাপ ফেলে এগিয়ে যেতে যেতে বললেন, ‘এঃ, বিশ্রীভাবে ফাঁসিয়ে দিলেন।’ জজসায়েব বোধহয় ওপাশ থেকে খুব ধাতালেন। তিনি অনর্গল হ্যাঁ স্যার, ইয়েস স্যার করে কুঁজো হয়ে ফিরে এলেন। এসেইটুপি আর ব্যাটনটা সোফা থেকে তুলে নিয়ে, অ্যাটেনশানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘বলুন, কীভাবে ক্ষমা চাইতে হবে!’
মেজোমামা নতুন করে পাইপ ধরাতে-ধরাতে বললেন, ‘কেন জজসায়েব বললেন বুঝি?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এমন ধানি জীবনে খাইনি। আপনি যা করলেন না।’
‘ক্ষমা চাইবার আগে চা-টা শেষ করে নিন। মুখের চা।’
অফিসার দুজন একচুমুকে সব চা শেষ করে, গ্যাটম্যাট করে বেরিয়ে গেলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে খেল শুরু হল মুকুন্দর। সে গম্ভীর গলায় বললে, ‘বড়দা, মেজদা, আমি এখনই চলে যাব। আমি চোর, আমি মর্কট। আমি কালো, আমি বেঁটে। আমার মাথায় মোটামোটা চুল।’
মেজোমামা বললেন, ‘এইবার ঠেলা সামলাও বড়দা। তুমি যখন বলতে শুরু করে, তখন তো সহজে থামতে চাও না।’
‘শোনো, আমি একটা সত্যি কথা বলব। সত্যি কথা বলতে আমার লজ্জা করে না। পুলিশ দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলুম। আমার হাত-পা পেটের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। সেই কারণে আমি একটা-দুটো মিথ্যে কথাও বলে ফেলেছি। তোমরা লক্ষ করেছ?
‘অবশ্যই করেছি। সবেতেই তুমি না বলছিলে।’
‘তোরা দেখলি, পুলিশ দেখলেই নিজেকে কী রকম চোর চোর মনে হয়! সব মানুষের ভেতরেই
একটা চোর থাকে, তাই না?
‘শোনো, তোমার গবেষণা এখন রাখো। গণধোলাই যদি খেতে না চাও, সোজা ডাক্তারখানায়
চলে যাও। আর মুকুন্দর কাছে তুমি ক্ষমা চেয়ে নাও। সত্যিই, তুমি ছেলেটাকে একেবারে বাঘের মুখে ঠেলে দিচ্ছিলে। কোথায় তুমি ওকে আগলাবে, বিপদ থেকে বাঁচাবে, তা না করে…।’
‘যাক ভাই, আমার অন্যায় হয়ে গেছে। এটা কিন্তু আমার ঠিক চরিত্র নয়। আমি ঘাবড়ে গিয়ে করে ফেলেছি। মুকুন্দ, তুই আমাকে ক্ষমা করে দে। পুলিশ না হয়ে বাঘ হলে দেখতিস আমার স্বরূপ। বাঘাযতীনের মতো লড়াই করতুম।’
