‘স্ট্রেঞ্জ! সেই সাইকেল আমরা চুরি করেছি, এইরকম একটা অসম্মানজনক ধারণা আপনার হল কী করে?’
‘আহা, আমি বলার আগেই তো আপনি এক-একটা সিদ্ধান্ত করে ফেলছেন। আহা, আমিও তো পুলিশ অফিসার! আমার একটা পদমর্যাদা আছে কি না! সেই থেকে আপনি আমাদের সঙ্গে কী যাচ্ছেতাই ব্যবহার করছেন বলুন তো!’
‘আপনার পায়ে কী?’
থতোমতো খেয়ে গেলেন অফিসার। পায়ের দিকে তাকালেন। মেজোমামা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা একজন এগজামিনার। এমনভাবে প্রশ্ন করেন, সবাই পড়া না করা। ছাত্রের মতো ভয় পেয়ে যায়। অফিসার দু-দণ্ড ভাবলেন। ভেবে বললেন, ‘পায়ে জুতো।’
‘জুতো পায়ে ঢুকলেন কেন? না, না, আপনি এই ঘরে জুতো পায়ে ঢুকলেন কেন? আপনি ওই নোটিসটা পড়েননি, লিভ ইওর শুজ আউট? আপনি দেখছেন না, এই ঘরটা একটা স্মৃতিমন্দিরের মতো? বাইরের জুতো পরে এই ঘরে প্রবেশ নিষেধ।’
‘আপনার পায়ে যে জুতো।’
‘এটা আমার বাড়িতে পরার চটি। বাইরের জুতো পায়ে মশমশিয়ে এসে ঢুকলেন। তার মানে আপনি শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়ে বিনীতভাবে আসেননি। এসেছেন পুলিশি মেজাজে, যেভাবে আপনারা গুন্ডা-বদমাইশ-চোরদের বাড়িতে যান। আপনি কাদের বাড়িতে এসেছেন, কোনও আইডিয়া আছে? জমিদার কাশীপ্রসাদ মিত্রর বাড়িতে, যে ভদ্রলোক দেশের স্বাধীনতা-আন্দোলনের জন্যে সমস্ত কিছু উৎসর্গ করেছিলেন। চোদ্দোটা বছর ইংরেজের জেলে কাটিয়েছিলেন। আপনার চালচলন-ব্যবহার আমাকে ভীষণ ইরিটেট করেছে।’
অফিসার একেবারে হাতজোড় করে বললেন, ‘আমি ক্ষমা চাইছি। আমাদের সমস্ত ব্যাপারটাই দানবীয়। সত্যি কথা বলতে কী, আমরা ভদ্রসমাজে মেশার অনুপযুক্ত।’ মেজোমামা বললেন, ‘হ্যাঁ, এইবার ঠিক আছে। এই স্বীকারোক্তিটাই আমি চাইছিলুম। এইবার আমি আপনাদের জন্যে ভুরভুরে গন্ধওয়ালা দার্জিলিং চায়ের ব্যবস্থা করব। নকুড়ের কড়া পাক, নরম পাক, মুচমুচে নিমকি। আর বলুন, আর কী ইচ্ছে করেন?
লাজুক লাজুক মুখে এক অফিসার বললেন, ‘এই যে এক রকমের মিষ্টি আছে না! গোল-গোল। রসগোল্লা, তবে ঠিক রসগোল্লা নয়। ওপরটা কড়াপাক, ভিতরটানরম। সারা গায়ে গুঁড়ো গুঁড়ো যেন পাকা দাড়ি বেরিয়েছে।’
মেজোমামা হাহা করে হেসে বললেন, ‘আরে মশাই ক্ষীরকদম্ব। কদম ফুলের মতো দেখতে, তাই তো?’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ ক্ষীরকদম্ব। ওই নামটা আমার কিছুতেই ছাই মনে থাকে না।’
অফিসার শরীরটাকে এতক্ষণ টানটান করে রেখেছিলেন, এইবার আলগা করলেন।
মেজোমামা বললেন, ‘আমাদের ফ্রিজে প্রচুর ক্ষীরকদম্ব আছে। ক’টা খাবেন? এক ডজন বলি।’
মেজোমামা মুকুন্দকে ইশারা করলেন। মুকুন্দ বুলেটের মতো ভেতর বাড়ির দিকে চলে গেল। আমি জানলার ধাপে পা ঝুলিয়ে বসে বসে মজা দেখছি। আমার ভয় কেটে গেছে। মেজোমামার হাতে পড়ে কেস একেবারে ঘুরে গেছে। এখন মনে হচ্ছে, বড়মামার বদলে পুলিশ অফিসারই না অ্যারেস্ট হয়ে যান।
মেজোমামা ব্লপ করে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘নিন, কেসটা এইবার ক্লোজ করুন। মনে রাখবেন, ডক্টর মিত্রর সময়ের দাম আছে। টুইজ হিম, টাইম ইজ মানি।’ অফিসার ভদ্রভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, আপনারা আজ সকালে জাস্টিস মুখার্জির কাছে..।’
মেজোমামা সঙ্গে সঙ্গে পাইপ উঁচিয়ে বললেন, ‘কারেকশান। কারেকশান। মুখার্জি নয় ব্যানার্জি।’
‘ইয়েস সার, ইয়েস স্যার। সরি স্যার। আমার মাথায় একবার থান ইট ছুড়ে মেরেছিল। সেই থেকে আমার স্মৃতিটা একটু এলিয়ে গেছে। জাস্টিস ব্যানার্জির বাড়িতে আপনারা কাউকে পাঠিয়েছিলেন কি?’
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘না। কই না তো!’
ইশ! বড়মামা আবার ভুল করলেন। বড়মামা সকালে মুকুন্দকে পাঠিয়েছিলেন, আমার সামনে। বড়মামা মুকুন্দকে কম্পাউন্ডার করবেন। সেইজন্যে একটা সার্টিফিকেট আনতে পাঠিয়েছিলেন। বড়মামার কিছুই মনে থাকে না কেন। বড়মামার সবেতেই না।
অফিসার বললেন, ‘আর একটু ভেবে বলুন। জজসায়েবের স্ত্রী তো মিথ্যে বলবেন না। আদালত অবমাননার দায়ে পড়ে যাবেন। তিনি বললেন, ‘ডাক্তারবাবু একজনকে পাঠিয়েছিলেন। সে চলে আসার পর থেকেই সাইকেল হাওয়া। তাই আমরা গন্ধ শুকে এঁকে চলে এলুম আসল জায়গায়।’
মেজোমামা বললেন, ‘বড়দা, তুমি পাঠিয়েছিলে কাউকে? মনে করে দ্যাখো।’ বড়মামা ভুরুর ওপরে কপালে তিনবার টুসকি মেরে লাফিয়ে উঠলেন, ‘ওই যে ব্যাটা মুকুন্দ। মুকুন্দকে পাঠিয়েছিলুম।’ আর ঠিক সেই সময় মুকুন্দ বিশাল একটা ট্রে হাতে ঘরে ঢুকল। মাসিমার সাজানো। সে এক দেখার জিনিস। চোর ডাকাত মাথায় উঠে যাবার অবস্থা। সুন্দর প্লেট। সুন্দর সোনালি বর্ডার দেওয়া গেলাস। টলটলে জল। মাসিমা আবার জলে চন্দন মেশান।
বড়মামা হঠাৎ হুঙ্কার ছাড়লেন, ‘এই ব্যাটা মুকুন্দ। ব্যাটা সাইকেল চোর।’
মুকুন্দ অবাক হয়ে বললেন, ‘যাঃ, বড়দার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!’
পুলিশ অফিসার বললেন, ‘তুমি আগে সাবধানে রাখো। এখন আর অন্য কোনও দিকে মন দিয়ে না।’
মুকুন্দ ট্রে-টা টেবিলের ওপর রাখার সঙ্গে সঙ্গেই এক অফিসার খপ করে তার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘সাইকেলটা কোথায় রেখেছ?’
মুকুন্দ বললে, ‘গোয়ালঘরের পাশে।’
বড়মামা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘অ্যারেস্ট হিম। এখনই ওকে শ্রীঘরে পাঠান। বছর পাঁচেক ঘানি ঘুরিয়ে আসুক। ব্যাটার যেমন মর্কটের মতো চেহারা। আমি তখনই বলেছিলুম, চোরচোট্টার মতো চেহারা।’
