মুকুন্দ বললে, ‘বড়দাকে পুলিশে ধরেছে। আমরা তাই অ্যাকশানের জন্যে তৈরি হচ্ছি।’
‘পুলিশে ধরেছে মানে!’ মেজোমামা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘তোরাও আয়। কার হুকুমে পুলিশ ঢুকেছে বাড়িতে!’ মেজোমামার টেরিফিক সাহস। বিদ্যাসাগরি চটির ফটাস-ফটাস। আওয়াজ তুলে মেজোমামা বিদ্যাসাগরের মতোই বেপরোয়া ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন। মেজোমামার পরনে ঢোলা পাজামা, পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রং গেরুয়া। পাঞ্জাবির পকেট থেকে। সোনার ঠোঁট লাগানো পাইপ বের করে দাঁতে চেপে ধরে একেবারে সায়েবদের মতো উচ্চারণে বললেন, ‘হোয়াট ইজ দিস!’ মেজোমামার সেইরকম চেহারা। বড়মামার চেয়েও অনেক সুন্দর দেখতে। পাকা পেয়ারার মতো গায়ের রং। এক মাথা হালকা বাদামি রঙের চুল। তেমনি সুন্দর স্বাস্থ্য! এতখানি বুকের ছাতি। চওড়া পিঠ। ভারী চশমার আড়ালে বড় বড় জ্বলজ্বলে দুটো চোখ।
একজন অফিসার পায়ের ওপর পা তুলে বসেছিলেন। তাঁর বুটের ডগাটা পালিশ-করা সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পাশে লেগে দাগ ধরিয়ে দিচ্ছিল। মেজোমামার সজাগ চোখ। হাতের ফরসা, লম্বা তর্জনী তুলে অফিসারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, ‘সি, হোয়াট ড্যামেজ ইউ হ্যাভ ডান টু দি টেবল, উইথ ইওর আনসিভিলাইজড বুট। ছিঃ ছিঃ! ম্যানারস জেন্টলম্যান, ম্যানারস।’
মেজোমামা আমাকে ইংরেজি শেখান। বলতে নেই, মা সরস্বতীর কৃপায়, আমি এবার ইংরেজিতে সাঙ্ঘাতিক ভালো নম্বর পেয়েছি। আমি বুঝতে পারলুম কেমন কায়দা করে মেজোমামা। অফিসারকে অসভ্য বললেন, তুমি অসভ্য নও, তোমার বুট অসভ্য। সেই অসভ্য বুট চকচকে টেবিলের কী সর্বনাশ করেছে দ্যাখো।
অফিসার দুজন মেজোমামার দিকে তাকালেন। কলকাতার সবচেয়ে নামী কলেজের নামী অধাপক। তাঁর সঙ্গে চালাকি!
মেজেমোমা আরও এক ডোজ চড়িয়ে দিলেন, ‘দিস ইজ নট ইওর পুলিশ স্টেশন। বিহেভ ইওরসেলফ।’
মেজোমামা আমাকে অনেকরকম কায়দা শেখান। এই কায়দাটা সেই কায়দারই একটা, অফেনস ইজ দি বেস্ট ডিফেন্স। পুলিশ অফিসারটা একেবারে চুপসে গেলেন। তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে নিলেন। মেজোমামা ডোজ আরও একটা চড়ালেন। একেবারে সামনে গিয়ে পাইপ নেড়ে বলেন, ‘ও নো নো, ওয়াইপ অফ দি স্ক্র্যাচ উইথ ইওর হ্যান্ডকারচিফ।’
মেজোমামা একটা চেয়ারে রাজার মতো বসে বললেন, ‘হোয়াট ব্রিঙ্গস ইউ হিয়ার?’
এক অফিসার দাগ পরিষ্কার করছেন, তিনি কিছু বললেন না। অপরজন বললেন, ‘আমরা একটা চুরির ইনভেসটিগেশানে এসেছি।’
‘চুরির ইনভেসটিগেশানে এখানে? স্ট্রেঞ্জ!’
মেজোমামার পাইপ ধরানোর সাঙ্তিক একটা কায়দা আছে। ভেরি ভেরি আর্টিস্টিক। দেশলাই কাঠিটা জ্বেলে, বাঁ-হাতে পাইপের মুখের দিকটা ধরে ডান হাতে আগুনটা ওপর থেকে নিচের দিকে নামিয়ে দেন। দেখতে ভালো লাগে। সায়েবি ব্যাপার তো। মেজোমামা সেই কায়দায়
পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, ‘আমরা কী চুরি করেছি বলে মনে হচ্ছে আপনাদের?
‘সাইকেল।’
‘আচ্ছা, সাইকেল! কার সাইকেল! আপনার?
‘তার আগে জানা দরকার, আপনি কে?’
‘আমি মেজোভাই।’
‘কী করেন আপনি?’
‘চোরাই সাইকেলের ব্যবসা করি। আপনি টেবিলের পাশের নোংরা জুতোর দাগ মুছেছেন?’
মেজোমামা এমন মেজাজ নিয়ে বললেন, যে পুলিশ অফিসারটি ভয়ে ভয়ে বললেন, ‘এই যে স্যার, মুছে দিচ্ছি স্যার, মোছার জন্যে আমাকে যা হয় একটা কিছু দিন।’
‘আপনার পকেটে রুমাল নেই?
‘না, স্যার, আমাদের সার্ভিসে আমরা তো রুমাল ব্যবহার করতে পারি না। অনেকে সঙ্গে রাখেন, আমি তাও রাখি না।’
‘আই সি। তা হঠাৎ যদি হেঁচে ফেলেন, আর সেই হাঁচির চোটে নাক দিয়ে যদি কিছু বেরিয়ে আসে, তা হলে কী করবেন? জামার হাতায়?’
‘আজ্ঞে, সেইরকম কেস কখনও হয়নি। হলে জামার হাতা। একটা রুমাল রাখা উচিত কী বলেন?’
‘যে-কোনও সভ্য মানুষেরই একটা রুমাল রাখা উচিত। সিভিলাইজেশানের সঙ্গে রুমালের একটা যোগ আছে অফিসার।’ পুরো ব্যাপারটা এখন মেজোমামার কন্ট্রোলে এসে গেছে। বড়মামা সেই কারণে একটু সাহস পেয়ে বললেন, ‘চেম্বারে আমার রুগিরা বসে আছে, আমার তো যাওয়া উচিত।’
প্রথম অফিসার বললেন, ‘আপনি পার্থ মুখার্জিকে চেনেন?’
বড়মামা বললেন, ‘না, পার্থ মুখার্জি আবার কে? জীবনে নাম শুনিনি।’
‘জজ পার্থ মুখার্জির নাম শোনেননি? চেনেন না আপনি?
মেজোমামা ঠোঁট থেকে পাইপ নামিয়ে বললেন, ‘আমরা জাস্টিস পার্থ ব্যানার্জিকে চিনি।’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, পার্থ ব্যানার্জি।’
মেজোমামা বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ! আপনি মশাই পুলিশ অফিসার হয়েছেন জজসায়েবের টাইটেল জানেন না! এদিকে সবচেয়ে নামকরা একজন ডাক্তারকে সাইকেল চোর বলে সন্দেহ করছেন। ব্যাপারটা খোদ জজসায়েবকেই তা হলে জানাতে হয়। দেখি ফোনে পাওয়া যায় কি না!’
মেজোমামা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পার্থমামাকে ফোনে ধর তো।’
অফিসার চেয়ার থেকে ক্যাঙারুর মতো লাফিয়ে এসে মেজোমামার হাত চেপে ধরে বললেন, ‘প্লিজ, প্লিজ, ডোন্ট ডু দ্যাট। আমি ধনে-প্রাণে মারা যাব। জজসায়েব ভীষণ রাগি!’
‘আপনি এই বাড়িতে এই মিত্র হাউসে ঢোকার আগে অনুমতি নিয়েছিলেন? আসতে পারি বলেছিলেন? বলেছিলেন, মে আই কাম ইন?’
‘না স্যার।’
‘এই সহজ-সরল, আত্মভোলা ডাক্তারটিকে নিয়ে পুলিশি কায়দায় খেলা করছিলেন?
‘আজ্ঞে, আপনি আসার আগে পর্যন্ত অভ্যাসের দোষে তা একটু করে ফেলেছি। উনি ভয় না পেলে করতুম না। ভীষণ ভয় পেয়েছেন দেখে একটু মজা করে ফেলেছি স্যার। আসলে আমরা ভীষণ। বিপদে পড়ে গেছি সার। আজ সকালে জজসায়েবের বারান্দা থেকে তাঁর নতুন সাইকেলটা চুরি হয়ে গেছে। মাত্র তিন দিন আগে কিনেছিলেন।’
