ছানার মুড়কি আমার খুব প্রিয়। মুকুন্দর সঙ্গে আবার ভীষণ ভাব হয়ে গেল। ছেলেটা ভারী ভালো। আমাকে একবার কাঁধে করে স্কুলের মাঠ থেকে এক মাইল পথ হেঁটে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। আমাদের ম্যাচ হচ্ছিল। আমি ব্যাকে খেলছিলুম। চার্জ করতে গিয়ে পা মচকে গেল। মুকুন্দ এসেছিল আমাদের টুর্নামেন্ট দেখতে। কাঁধে পা ঝুলিয়ে বসে আছি, মুকুন্দ গান গাইতে গাইতে চলেছে। সে কত রকমের গান! গান থামিয়ে মাঝে মাঝে জিগ্যেস করছে, ‘কেমন হচ্ছে! আমার লেখা, আমার সুর।’
বড়মামা চেম্বারে যাবার জন্য তৈরি। বড়মামা এইভাবে বেশিদিন ডাক্তারি করতে পারবেন না। চেম্বারের অবস্থা আমি দেখতে পাচ্ছি। রুগিতে ভরে গেছে। কারও জ্বর, কারও কাশি, কারও পেটব্যথা। সবাই বসে আছেন তীর্থের কাকের মতো। কম্পাউন্ডারদা সামলাচ্ছেন। বড়মামার পাত্তা নেই।
মাসিমা মালপত্র নিয়ে বিপদে পড়েছেন। অত ছানা। অত দই। এত আনাজ!
মেজোমামা বললেন, ‘তোরা ভুলে গেছিস ভাই, আজ আমার জন্মদিন। তোরা ভুলেছিস, ঈশ্বর ভোলেননি। দ্যাখ কত আয়োজন করে দিলেন।’
মাসিমা বললেন, ‘তুমি আবার ভাদ্রমাসে জন্মালে কবে! তুমি তো জন্মেছিলে আশ্বিনে!’
‘তোর কিছু মনে থাকে না কুসি। আমি এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছি ভাদ্রে এবং ঠিক আজকের দিনটিতে। আশ্বিনে জন্মেছিস তুই, যে কারণে তোকে ঠিক মা দুর্গার মতো দেখতে।’
‘তা হলে আজ তোমার জন্মদিন করে ফেলা যাক।
মাসিমা বললেন আমাকে, ‘মুকুন্দকে একবার ডাক তো।’
মুকুন্দ বিশাল গালচেটা তুলছে তখন। হিমসিম অবস্থা। কম ভারী? মুকুন্দর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেছে। সাহায্য করতে করতে বললুম, ‘মাসিমা ডাকছেন। আজ মেজোমামার জন্মদিন।’
‘বুঝেছি আমাকে মাছ আনতে বলবেন। জন্মদিনে মাছের মুড়ো খেতে হয়।’
কথাটা সবে শেষ করেছে মুকুন্দ, গেটের সামনে এসে দাঁড়ালেন দুই পুলিশ অফিসার। পুরো ইউনিফর্ম। মাথায় টুপি। গেটের লোহাটাকে পুলিশি মেজাজে ঠ্যাং ঠ্যাং করে বাজালেন। ভুরু কুঁচকে তাকাতে লাগলেন।
মুকুন্দ বললে, ‘এই রে পুলিশ!’
আর বড়মামা ঠিক ওই সময় বেরিয়ে এলেন। হাতে ব্রিফকেস। সাদা ধবধবে শার্টের ওপর মহাদেবের গলার সাপের মতো স্টেথেসকোপ ঝুলছে। এই বুকদেখা যন্ত্রটা বড়মামার গর্বের বস্তু। সামনেই বিশালাকার দুজন পুলিশ অফিসার দেখে বড়মামা থতমত খেয়ে গেলেন।
একজন জিগ্যেস করলেন, ‘আপনি ডক্টর বিমল মিত্র?
বড়মামা ভীষণ নার্ভাস হয়ে গিয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে না।’
‘এইটাই তো ডক্টর বিমল মিত্র-র বাড়ি?’
বড়মামা অম্লানবদনে বললেন, ‘আজ্ঞে না।’
‘এই যে বাড়ির বাইরে লেখা রয়েছে।’
বড়মামা বিপদে পড়ে গেছেন। অবাক হয়ে বললেন, ‘তাই নাকি?’
পুলিশ অফিসার ব্যঙ্গের গলায় বললেন, ‘নিজের বাড়ি নিজে চিনতে পারছেন না! নিজের নাম তো ভুলেইছেন। চলুন, ভেতরে চলুন, আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।’
বড়মামা পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছেন। পেছন পেছন বীরদর্পে আসছেন দুই পুলিশ অফিসার। একজনের হাতে গোল একটা রুলকাঠ। সেই কাঠটাকে বাঁ-হাতের তালুতে পটাশ পটাশ করে মারছেন। বিশ্রী একটা গা ছমছম করানো শব্দ হচ্ছে।
মুকুন্দ বললে আমার কানে-কানে, ‘এ ওই কীর্তনওয়ালাদের কাজ। সোজা থানায় গিয়ে মানহানির মামলা ঠুকে দিয়েছে। আমাদের দেশে ঘরে এইরকম প্রায়ই হয়। পুলিশ যদি বড়দাকে ধরে নিয়ে যেতে চায়, আমি ফাইট দেব। মিঠুন আমার গুরু। ওই পাঁচিলের ওপর থেকে উড়ে গিয়ে জোড়া পায়ে মারব থুতনিতে। তারপর বড়দাকে নিয়ে এসকেপ করব জঙ্গলে।
‘জঙ্গল পাবে কোথায়?
‘আরে ম্যান, এত বড় একটা দেশ জঙ্গল পাব না মানে!’
আমরাও পায়ে পায়ে বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলুম। এই সময়টায় আমাদের বড়মামার কাছাকাছি থাকতে হবে। বাড়িতে চোর পড়লে মানুষ ‘পুলিশ, পুলিশ’ করে চিৎকার করে। আমাদের বাড়িতে পুলিশ পড়েছে বলে আমরা ‘পুলিশ, পুলিশ’ করে চিল্লে বাড়ি মাথায় করব।
বড়মামা কিছু বলার আগেই পুলিশ অফিসার দুজন বিরাট শব্দে চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। যাঁর হাতে রুলকাঠ তিনি টেবিলের পাশে অকারণে শব্দ করলেন। কোনও মানে হয় না। আমার স্কুলের হেড-স্যার হলে মাথায় ডাস্টার মেরে বলতেন, ‘এ কী অসভ্যতা!’ ও সব পুলিশ অফিসার টফিসার মানতেন না। আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখলুম, বড়মামার বাড়ি, বড়মামার ঘর, তাঁরই চেয়ার-টেবিল—অথচ পুলিশ অফিসার প্রায় ধমক মেরেই বড়মামাকে বললেন, ‘বসুন।’
বড়মামা ভয়ে ভয়ে চেয়ারে বসতে গিয়ে হাতলে বাধা পেলেন। বড়মামার কীর্তি তো! ভাবলেন মনে হয়, চেয়ার বসতে দিচ্ছে না। মেঝেতেই বসতে গেলেন।
অফিসার বললেন, ‘কী হল! চেয়ারে বসতে কী অসুবিধে হল?
বড়মামা বললেন, ‘চেয়ারটা বসতে দিচ্ছে না।’
অফিসার দুজন হা-হা হেসে বললেন, ‘চেয়ারের প্রাণ আছে বুঝি যে বসতে দিচ্ছে না! আপনি তো হাতলে বসছিলেন। চেয়ারে বসতে হলে দু-হাতলের মাঝখানে বসতে হয়। সব কিছুরই একটা। হিসেব আছে, ডক্টর মিত্র। আবার চেষ্টা করুন। ট্রাই এগেন।’
আমার খুব রাগ হল। বড়মামার মতো একজন মানুষকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা! আমি মুকুন্দকে ইংরেজিতেই বললুম, ‘হোয়াট ইজ দিস?’ আমাদের পেছনে মেজোমামা এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আমরা খেয়াল করিনি।
মেজোমামা বললেন, ‘ব্যাপারটা কী। তোরা এখানে গুপ্তচরের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছিস?
