প্রকাশ কিন্তু অনুভব করতে পেরেছিলেন সঞ্জয়ের নিঃসঙ্গতা। চলুন আমার সঙ্গে। আমার বাড়ি যাওয়ার তাড়া নেই। আপনার সঙ্গে কিছুক্ষণ ঘুরি। বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে যাব। প্রকাশের বন্ধুবাৎসল্যে সঞ্জয় মুগ্ধ হয়েছিল। দুপুর থেকে সে যেন এক প্রচণ্ড পাগলামির পরিবেশে পাগল হয়ে যেতে বসেছিল। এতক্ষণে সে বোধহয় সুস্থতায় মুক্তি পেল।
হায়দ্রাবাদের সবচেয়ে বড় কেনাকাটার জায়গা আবিদস-এ প্রকাশ এসে বললেন, চলুন একটু কফি খাই। বিশাল দোকানে দুজনে মুখোমুখি বসলেন কফি নিয়ে।
চারমিনারে যাবেন না স্ত্রী-র জন্যে চুড়ি কিনতে?
কতদূর?
বাসে পনেরো মিনিট।
গোলকুণ্ডা রোড এখান থেকে কতদূর!
শহরের ও তল্লাটে। বেশ কিছুটা দূর!
যাবেন নাকি? কে থাকে ওখানে?
ইন্দিরা। কাল সকালে আমাকে যেতে বলেছে।
গণেশ চতুর্থীর নিমন্ত্রণ?
গণেশ চতুর্থী দাক্ষিণাত্যের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বাংলার দুর্গাপূজার মতো?
না, চতুর্থীর নিমন্ত্রণ নয়। হায়দ্রাবাদ শহর ঘুরে দেখার নিমন্ত্রণ। ইন্দিরা আমার গাইড।
বাঃ, ইন্দিরাকে সঙ্গী করে নিজামের শহরে ঘুরে বেড়ানোর মতো রোমান্স আর কী আছে। আমি আপনাকে সাহায্য করব। কাল সকালে পাবলিক গার্ডেনে আরকিওলজিক্যাল মিউজিয়ামের সামনে আমি থাকব। আপনি আসুন, তারপর আপনাকে গোলকুণ্ডার হিরের খনিতে পৌঁছে দেবার ভার আমার।
প্রকাশ কিছুতেই সঞ্জয়কে কফির দাম দিতে দিলেন না।
ক্ষণিকের বন্ধুর প্রতি ক্ষণিকের বন্ধুর ভালোবাসার আপ্যায়ন। স্টপেজে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চারমিনারের বাস আর এল না। প্রকাশ যদিও অধৈর্য হলেন না, সঞ্জয়ের ধৈর্য কিন্তু হার মানল। চলুন, চারমিনার আর যাওয়া হল না আজ। এতটা পথ আবার ফিরে যেতে হবে।
যাক কালকেই যাবেন চারমিনার, সঙ্গে থাকবে মিষ্টি সঙ্গী। চুড়ি কেনার হাতের মাপও পেয়ে যাবেন। প্রকাশ উদাস গলায় হেসে উঠলেন।
* * *
শর্মা ফিরে এলেন অনেক রাতে। সঞ্জয় তখন ডিনার শেষ করে শুয়ে পড়েছে। ঘুম আসছিল না। সব ঘরই প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। সন্ধের ট্রেনে অনেকেই বাড়ির পথে। সকলেই প্রায় হোমসিক। শর্মা একদিন বলেছিলেন, সংসারী মানুষ সংসার ছেড়ে দীর্ঘদিন বাইরে থাকতে পারে না। যত দিন যায় বাড়ির আকর্ষণ বাড়তে থাকে। প্রতিদিন শোবার আগে, শুয়ে শুয়ে দুজনে অনর্গল কথা বলে যেত—পাড়ার কথা, অধ্যাপকদের কথা, সহপাঠীদের কথা এবং ইন্দিরার কথা। ইন্দিরা কেন শর্মার কথার জবাবে এই কথা বলল ওই কথা বলল। কোন মনস্তাত্বিক কারণে ইন্দিরার। বিশেষ কিছু মন্তব্য, শর্মার বিশ্লেষণ চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অবশেষে যে-কোনও একজন ঘুমিয়ে পড়লেই ঘরে স্তব্ধতা নেমে আসত। শর্মা ফিরে এসেছেন হতাশ হয়ে, রিজার্ভেশনে নাম তাঁর। ওয়েটিং লিস্টে। কাল সকালে আবার যেতে হবে। আর কোনও কথা হল না। ডিনার না খেয়েই শর্মা শুয়ে পড়লেন। ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়লেন সঙ্গে সঙ্গে।
* * *
পরের দিন সকাল। শর্মা রোজ দেরিতে ওঠেন। সেদিন উঠলেন খুব ভোরে। সঞ্জয় জেগেই ছিল। রাতে ঘুমোতে পারেনি। অজস্র চিন্তার জটিল আবর্তে ঘুম পথ হারিয়ে ফেলেছিল। ইন্দিরার সঙ্গে ছাদের দুপুরের কয়েকটি মুহূর্তের সঙ্গে সময়ের ব্যবধান যত বাড়ছে, জীবনের অন্য এক সত্য যেন ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সারারাত চোখের ওপর হাত রেখে সঞ্জয় সেই সত্যকে খুঁজে। পেয়েছে। জীবনে পাওয়ার চেয়ে না পাওয়ার পরিমাণটাই বেশি। একটা পুরোনো জামা সহজেই পালটে ফেলে নতুন জামা পরা যায়। পুরোনো জীবনকে হঠাৎ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে নতুন জীবন। কিন্তু শুরু করা যায় না, অনেকটা প্রাচীন বৃক্ষের মতো। যে জমিতে তার মূল, শিকড়, যে জমি। থেকে তার প্রাণরস সংগ্রহের ভবিষ্যৎ, সেই জমি থেকে তাকে উৎপাটিত করলে গাছ বাঁচে না। চারাগাছ একাধিকবার ভূমি নেড়ে বসানো চলে। ইন্দিরাকে তার মনে লেগেছে। এ কথা সত্য। ইন্দিরার মেধা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির মধ্যে সে তার জীবনকে আরও বেশি প্রস্ফুটিত করার সম্ভাবনা দেখেছে। তার জীবনের মূল শিকড় ইন্দিরার প্রাণরসে আরও পুষ্ট হতে পারে। কিন্তু ব্যাপারটা একতরফা নয়। নতুন জমিতে সে মূল ছড়াতে চাইলেও জমির উপযুক্ত বৃক্ষ কি না এ বিচারের ভার জমির মালিকের। ইন্দিরার সামনে দাঁড়িয়ে সঞ্জয় নিজের জীবনসত্যটিকে আবিষ্কার করে ফেলেছে, সে একটি অসম্পূর্ণ মানুষ। জীবনে তার ক্ষোভের আর অসঙ্গতির পরিমাণ বিশাল। তার মন, তার মেধা উপবাসী। সে যদি তৃপ্ত হত তাহলে হঠাৎ অকারণে এতটা উল্লসিত হত না। সে কোনওদিনই কমেডির নায়ক হতে পারবে না। জীবনের গতিই তাকে ট্র্যাজেডির হিরো করেছে।
প্রত্যুষের প্রতিশ্রুতিকে অস্বীকার করা যায় না। কাঁচা সোনার মতো রোদ, হালকা ঠান্ডা আঙুর পাকানো হাওয়া। দূরে কোয়ারির দিকে ফৌজি মাঠে কুচকাওয়াজ, ফায়ারিং রেঞ্জে মেশিনগানের শব্দ। শর্মার দাড়ি কামানো স্বাস্থ্যবান তাজা ফরসা মুখ। সামনের রাস্তায় গুজরাতের ছেলে ভিয়াসের প্রাণোচ্ছল হাঁটা চলা। সঞ্জয় নিজেকে প্রস্তুত করে নিয়েছে। ব্রেকফাস্ট সেরে, আর টি সির বাস ধরে সে আর শর্মা শহরে যাবে। শর্মা স্টেশনে, সঞ্জয় মিউজিয়ামের সামনে।
* * *
শর্মা ইতিমধ্যে সারা ঘরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার জিনিসপত্র সুটকেসে ভরে ফেলেছে। ওয়ার্ডরোব থেকে সমস্ত জামাকাপড় ভরে ফেলেছে। বাথরুমে তার সাবান পড়ে নেই। বিদায়ের জন্যে সে আংশিক প্রস্তুত। সঞ্জয়ের হাতে এখন পুরো একটা দিন। শর্মা তাকে ছেড়ে চলে যাবে এই বেদনা কিন্তু তাকে ভেতরে ভেতরে বিমর্ষ করে তুলেছে। রাতে তার পাশের বিছানা খালি পড়ে থাকবে। গোটা একটা ওয়ার্ডরোব ফাঁকা হুহু করবে। সারা ঘরের কোথাও শর্মার কোনও স্মৃতিচিহ্ন পড়ে থাকবে না। সে যে সময় একা ঘরে শুয়ে থাকবে, শর্মা তখন ইন্দোরের পথে অনেকটা এগিয়ে যাবে। আর কোনওদিন তার সঙ্গে দেখা হবে না। একই ঘরে পাশাপাশি শোয়া হবে না। শুয়ে শুয়ে গল্প হবে না। একই টেবিলে বসে খাওয়া হবে না। সময়ের কোনও এক জলাশয়ে দুজনে অবগাহন করে উঠে গেল। এর পর দুজন পরস্পরের থেকে বহুদূরে ধীরে ধীরে বুদ্ধ হবে, কিছু আগে-পরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে। বিষণ্ণ কোনও সন্ধ্যায় মনে হতে পারে— সঞ্জয় ছিল না? এখন কোথায়, কেমন? শর্মা ছিল না? ইন্দোরের কোনও রাস্তায় সে হয়তো বেড়াচ্ছে। চোখে ভালো দেখতে পায় না। নাতি কিংবা নাতনির হাত ধরে টুক টুক করে হাঁটছে। কিংবা কোনও এক শীতের হাড়কাঁপানো রাতে সে ঝরে গেছে।
